বিদায় বরণ কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । শ্যামলী [ ১৯৩৬ ]

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষ বয়সের বিখ্যাত ‘শ্যামলী’ কাব্যগ্রন্থের একটি ভীষণ মায়াবী আর অনুভূতিপ্রবণ কবিতা হলো এই ‘বিদায় বরণ’। বৃষ্টির পর থমকে থাকা একটি অলস সকালে মানুষের মনের ভেতর যে এক অদ্ভুত একাকীত্ব, উদাসীনতা আর হালকা চেনা-অচেনা স্মৃতির দোলাচল তৈরি হয়—কবিগুরু এই কবিতায় ঠিক সেই মনস্তাত্ত্বিক রূপটিই ফুটিয়ে তুলেছেন।

সারা রাত বৃষ্টির পর ভেজা ভারী বাতাসে সকালটা যখন স্তব্ধ হয়ে থাকে, তখন মানুষের অবচেতন মনে কত শত ঝাপসা ভাবনার আবছায়া ঝাঁক বেঁধে ওড়ে। কবি বলছেন, এই অনুভূতিগুলো কোনো বড় ধরনের কান্না নয়, হাসির খোরাক নয়, কোনো জটিল চিন্তা বা গভীর তত্ত্বও নয়। এ যেন এক হারিয়ে যাওয়া গানের সুর, ফিকে হয়ে আসা কোনো চেনা গন্ধ কিংবা স্মৃতি-বিস্মৃতির এক ধূপছায়াময় খেলা। এই পুরো অনুভূতিটাকে কবির মনে হয়েছে খেয়া পার হয়ে চলে যাওয়া কোনো এক মুখ ফিরিয়ে নেওয়া অভিমানী চেনা রূপের মতো।

মন তখন ব্যাকুল হয়ে ওঠে সেই চলে যাওয়া সুন্দর মুহূর্তগুলোকে আর একটিবার ফিরে ডাকতে, জীবনের শেষ বেলার প্রদীপটি জ্বেলে তাকে শেষবারের মতো বরণ করে বিদায় জানাতে। কবি বুঝতে পেরেছেন যে, যা কিছু চলে যায় বা হারিয়ে যায়, তাও আসলে সত্য এবং মধুর; তাদের রেখে যাওয়া সেই মিষ্টি বেদনাটুকুই বসন্তের ফুল ফোটা আর ঝরে পড়ার আড়ালে লুকিয়ে থাকে।

রবীন্দ্রনাথের এই ‘বিদায় বরণ’ কবিতাটি আমাদের খুব সুন্দর একটি জীবনবোধ শেখায়। তা হলো—যেকোনো বিদায় বা হারিয়ে যাওয়া মানেই কেবল শূন্যতা নয়। মনের কোণে জমে থাকা ঝাপসা স্মৃতিগুলোকে ভালোবেসে, সুন্দরভাবে বিদায় জানানোর মাঝেই লুকিয়ে থাকে এক অদ্ভুত শান্তি। আর এই মন ভালো করা উপলব্ধির পরেই মেঘের আড়াল থেকে আচমকা এক চিলতে রোদ এসে আমাদের মনকে আবার নতুন করে রাঙিয়ে দিয়ে যায়।

 

বিদায়-বরণ biday boron [ কবিতা ] - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবী-ন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিদায় বরণ কবিতা [ Biday Boron Kobita ] – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

চার প্রহর রাতের বৃষ্টিভেজা ভারী হাওয়ায়

                থমকে আছে সকাল বেলাটা,

         রাত জাগার ভারে যেন মুদে এসেছে

           মলিন আকাশের চোখের পাতা।

      বাদলার পিছল পথে পা টিপে চলেছে প্রহরগুলো।

             যত সব ভাবনার আবছায়া

                  উড়ছে ঝাঁক বেঁধে মনের চার দিকে

                       হালকা বেদনার রঙ মেলে দিয়ে।

      তাদের ধরি-ধরি করে মনটা,

           ভাবি বেঁধে রাখি লেখায়;

                পাশ কাটিয়ে চলে যায় কথাগুলো।

এ কান্না নয়, হাসি নয়, চিন্তা নয়, তত্ত্ব নয়,

                যত-কিছু ঝাপসা-হয়ে-যাওয়া রূপ,

                       ফিকে-হয়ে-যাওয়া গন্ধ,

                         কথা-হারিয়ে-যাওয়া গান,

                     তাপহারা স্মৃতিবিস্মৃতির ধূপছায়া–

                সব নিয়ে একটি মুখ-ফিরিয়ে-চলা স্বপ্নছবি

                       যেন ঘোমটাপরা অভিমানিনী।

           মন বলছে, ডাকো ডাকো,

                ওই ভেসে-যাওয়া পারের খেয়ার আরোহিণী,

                     ওকে একবার ডাকো ফিরে;

           দিনান্তের সন্ধ্যাদীপটি তুলে ধরো

                     ওর মুখের দিকে;

                  করো ওকে বিদায়-বরণ।

                     বলো, “তুমি সত্য, তুমি মধুর,

                       তোমারই বেদনা আজ লুকিয়ে বেড়ায়

                     বসন্তের ফুল ফোটা আর ফুল ঝরার ফাঁকে।

                         তোমার ছবি-আঁকা অক্ষরের লিপিখানি

                                   সবখানেই,

                            নীলে সবুজে সোনায়

                                       রক্তের রাঙা রঙে।’

           তাই আমার আজ মন ভেসেছে

             পলাশবনের চিকন ঢেউয়ে,

                ফাটা মেঘের কিনার দিয়ে উপচে পড়া

                       আচমকা রোদ্দুরের ছটায়। 

Amar Rabindranath Logo

মন্তব্য করুন