কল্পনা কাব্যগ্রন্থের বিবাহমঙ্গল কবিতা | Bibahomongol

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর কাব্যগ্রন্থ কল্পনা তাঁর কাব্যজীবনের এক কল্পনাময় ও প্রার্থনামুখর সংকলন। এই গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ মানবজীবনের আনন্দ, আশীর্বাদ, বিশ্বাস ও নৈতিক সৌন্দর্যকে গীতল ভাষায় প্রকাশ করেছেন। কল্পনা কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত “বিবাহমঙ্গল” কবিতাটি এক অনুপম আশীর্বাদ-কবিতা—যেখানে বিবাহকে কেবল সামাজিক অনুষ্ঠান নয়, বরং দুই প্রাণের মিলনে ঈশ্বরীয় কল্যাণের আহ্বান হিসেবে দেখা হয়েছে। কবিতাটি প্রার্থনা, প্রেম ও দাম্পত্যজীবনের দীর্ঘপথে আলোর কামনায় উজ্জ্বল।

কাব্যগ্রন্থ : কল্পনা [ ১৯৫২ ]

বিবাহমঙ্গল কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ঝিঁঝিট

দুইটি হৃদয়ে একটি আসন

         পাতিয়া বোসো হে হৃদয়নাথ!

কল্যাণকরে মঙ্গলডোরে

         বাঁধিয়া রাখো হে দোঁহার  হাত।

প্রাণেশ,  তোমারি প্রেম অনন্ত

জাগাক জীবনে নববসন্ত,

যুগল প্রাণের নবীন মিলনে

         করো হে করুণনয়নপাত।

সংসারপথ দীর্ঘ দারুণ,

বাহিরিবে দুটি পান্থ তরুণ,

আজিকে তোমারি প্রসাদ-অরুণ

         করুক উদয় নবপ্রভাত।

তব মঙ্গল তব মহত্ত্ব

তোমারি মাধুরী তোমারি সত্য

দোঁহার চিত্তে রহুক নিত্য

         নবনবরূপে দিবস-রাত।

 

কবিতার ভাবধারা ও বিন্যাস

কবিতার সূচনাতেই কবি আহ্বান জানান—দুই হৃদয়ে এক আসন পাতার। এখানে “হৃদয়নাথ” সম্বোধনে ঈশ্বরের প্রতি নিবেদন স্পষ্ট; মিলনের বন্ধন যেন কেবল মানবিক নয়, ঐশ্বরিক আশীর্বাদে দৃঢ় হয়। “মঙ্গলডোরে” হাত বাঁধার চিত্রকল্পে আছে দাম্পত্যের প্রতিশ্রুতি—যেখানে কল্যাণ, সত্য ও মাধুর্য একসূত্রে বাঁধা।

কবির ভাষা প্রার্থনাময়, ছন্দ গীতল। প্রেমকে তিনি অনন্ত বলেছেন—যে প্রেম জীবনে “নববসন্ত” জাগায়। এই বসন্ত কেবল আবেগের নয়; তা দায়িত্ব, করুণা ও সহযাত্রার শক্তি।

দাম্পত্যের পথ ও আশীর্বাদের দর্শন

রবীন্দ্রনাথ জানেন—সংসারপথ “দীর্ঘ দারুণ”। তাই তরুণ দুই পান্থের যাত্রায় প্রয়োজন প্রসাদের আলো। “নবপ্রভাত”-এর কামনায় কবি চান, প্রতিদিনের সূচনায় থাকুক আশীর্বাদের অরুণ। দাম্পত্য এখানে কোনো রোম্যান্টিক মোহ নয়; বরং সত্য, মহত্ত্ব ও মাধুর্যের নিত্যচর্চা।

শেষ স্তবকে কবি চান—দোঁহার চিত্তে থাকুক ঈশ্বরের মঙ্গল ও সত্য, “নবনবরূপে দিবস-রাত”—অর্থাৎ সম্পর্কটি যেন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও পরিণত ও গভীর হয়।

দার্শনিক তাৎপর্য

“বিবাহমঙ্গল” আমাদের শেখায়—

  • বিবাহ মানে কেবল সামাজিক বন্ধন নয়, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক প্রতিজ্ঞা
  • প্রেমের স্থায়িত্ব আসে সত্য, করুণা ও দায়িত্ব থেকে
  • আশীর্বাদ-চেতনা দাম্পত্যকে দৈনন্দিন কঠিনতায়ও আলোকিত রাখে

এখানে কবি ব্যক্তিগত প্রেমকে সামাজিক ও আধ্যাত্মিক কল্যাণের স্তরে উন্নীত করেছেন।

“বিবাহমঙ্গল” কল্পনা কাব্যগ্রন্থের এক স্মরণীয় প্রার্থনাকবিতা। দুই হৃদয়ের মিলনে রবীন্দ্রনাথ যে আশীর্বাদ-ভাষা রচনা করেছেন, তা আজও বিবাহের শুভক্ষণে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। এই কবিতা মনে করিয়ে দেয়—সত্য, মাধুর্য ও করুণার আলোয়ই দাম্পত্যের মঙ্গল সম্পূর্ণ হয়

মন্তব্য করুন