বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘উৎসর্গ’ কাব্যগ্রন্থের একটি বিষাদময় ও অনুভূতিপ্রধান কবিতা হলো ‘বিরহ বৎসর পরে মিলনের বীণা’। দীর্ঘ বিরহের অবসানে প্রতীক্ষিত মিলনের মুহূর্তে যে তীব্র আনন্দ ও উল্লাস প্রত্যাশিত ছিল, তা না পাওয়ার যে অপ্রাপ্তি ও মানসিক হাহাকার, তা কবি এখানে বীণার সুরের প্রতীকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
Table of Contents
উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থের বিরহ বৎসর পরে মিলনের বীণা কবিতা
বিরহ বৎসর পরে মিলনের বীণা কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয়বিবরণ | তথ্য |
| কবিতার নাম | বিরহ বৎসর পরে মিলনের বীণা |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | উৎসর্গ |
| প্রকাশের বছর | ১৯১৪ (১৩২০ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | রোমান্টিক লিরিক ও মানসিক দ্বন্দ্বের কবিতা |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
১৯১৪ সালে প্রকাশিত ‘উৎসর্গ’ কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথের নানা পর্বের আত্মনিবেদন, প্রেম, স্মৃতি ও দার্শনিক ভাবনার গভীর সংমিশ্রণ ঘটেছে। দীর্ঘকাল বিরহে থাকার পর পুনর্মিলনের ক্ষণে মানুষের মন যে বিপুল আনন্দের জোয়ার আশা করে, বাস্তবে অনেক সময় তা ধরা দেয় না; উল্টো সময়ের ব্যবধানে চেনা সুর অচেনা হয়ে যায় এবং দেখা দেয় সংকোচ ও সংশয়। দীর্ঘ বিরহের পর মিলনের বীণায় সুর কেন আর্তরবে ফেটে পড়ল না, সেই দ্বিধা ও আক্ষেপ থেকেই এই কবিতার সৃষ্টি।
বিরহ বৎসর পরে মিলনের বীণা সম্পূর্ণ কবিতা:
বিরহ বৎসর-পরে মিলনের বীণা
তেমন উন্মাদ-মন্দ্রে কেন বাজিলি না।
কেন তোর সপ্তস্বর সপ্তস্বর্গপানে
ছুটিয়া গেল না ঊর্ধ্বে উদ্দাম-পরানে
বসন্তে-মানস-যাত্রী বলাকার মতো।
কেন তোর সর্ব তন্ত্র সবলে প্রহত
মিলিত ঝংকার-ভরে কাঁপিয়া কাঁদিয়া
আনন্দের আর্তরবে চিত্ত উন্মাদিয়া
উঠিল না বাজি। হতাশ্বাস মৃদুস্বরে
গুঞ্জরিয়া গুঞ্জরিয়া লাজে শঙ্কাভরে
কেন মৌন হল। তবে কি আমারি প্রিয়া
সে পরশ-নিপুণতা গিয়াছে ভুলিয়া।
তবে কি আমারি বীণা ধূলিচ্ছন্ন-তার
সেদিনের মতো ক’রে বাজে নাকো আর।
বিরহ বৎসর পরে মিলনের বীণা কবিতা Romanized Version:
Biroho botsor-pore miloner bina
Temon unmad-mondre keno bajili na.
Keno tor shoptoshwor shoptoshorgopane
Chhutiya gelo na urdhwe uddam-porane
Boshonte-manosh-jatri bolakar moto.
Keno tor shorbo tontro shobole prohoto
Milito jhongkar-bhore kampiya kandiya
Anonder artorobe chitto unmadiya
Uthilo na baji. Hotashwash mridushwore
Gunjoriya gunjoriya laje shongkhabhore
Keno mouno holo. Tobe ki amari priya
She porosh-nipunota giyachhe bhuliya.
Tobe ki amari bina dhulichhonno-tar
Shediner moto ko’re baje nako ar.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- প্রত্যাশিত উল্লাসের অভাব:“বিরহ বৎসর-পরে মিলনের বীণা / তেমন উন্মাদ-মন্দ্রে কেন বাজিলি না।”— বহু বছরের বিরহের পর মিলনের ক্ষণে যে প্রবল আনন্দ-ঝংকার ওঠার কথা ছিল, তা স্তব্ধ হয়ে যাওয়ায় কবির হৃদয়ে এক বিস্ময় ও অতৃপ্তি জেগে ওঠে।
- লাজুক ও কুণ্ঠিত নীরবতা:“হতাশ্বাস মৃদুস্বরে / গুঞ্জরিয়া গুঞ্জরিয়া লাজে শঙ্কাভরে / কেন মৌন হল।”— মিলনের তীব্র বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসের বদলে সুরটি কেবল সংশয়, লজ্জা ও হতাশায় গুঞ্জরিত হয়ে শেষ পর্যন্ত নীরব হয়ে যায়, যা দীর্ঘ বিচ্ছেদের দূরত্বকেই ফুটিয়ে তোলে।
- সংশয় ও অবক্ষয়ের বেদনা:“তবে কি আমারি প্রিয়া / সে পরশ-নিপুণতা গিয়াছে ভুলিয়া। / তবে কি আমারি বীণা ধূলিচ্ছন্ন-তার / সেদিনের মতো ক’রে বাজে নাকো আর।”— কবিতার অন্তিমে কবি নিজেকেই প্রশ্ন করেন, প্রিয়তমা কি তবে তার সেই চেনা স্পর্শের নৈপুণ্য ভুলে গেছে, নাকি কবির নিজের মনের বীণাটিই দীর্ঘ বিরহে ধূলিধূসরিত হয়ে আগের মতো সুর তোলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে।
উৎস:
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি ও রচনাকাল-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।