Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয়বিবরণ | তথ্য |
| কবিতার নাম | ভুল |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | বীথিকা |
| প্রকাশের বছর | ১৯৩৫ (১৩৪২ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | রোমান্টিক মনস্তাত্ত্বিক লিরিক (Romantic Psychological Lyric) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
সম্পূর্ণ কবিতা:
সহসা তুমি করেছ ভুল গানে,
বেধেছে লয় তানে,
স্খলিত পদে হয়েছে তাল ভাঙা–
শরমে তাই মলিন মুখ নত,
দাঁড়ালে থতোমতো,
তাপিত দুটি কপোল হল রাঙা।
নয়নকোণ করিছে ছলোছলো,
শুধালে তবু কথা কিছু না বলো,
অধর থরোথরো,
আবেগভরে বুকের ‘পরে মালাটি চেপে ধরো।
অবমানিতা, জান না তুমি নিজে
মাধুরী এল কী যে
বেদনাভরা ত্রুটির মাঝখানে।
নিঁখুত শোভা নিরতিশয় তেজে
অপরাজেয় সে যে
পূর্ণ নিজে নিজেরই সম্মানে।
একটুখানি দোষের ফাঁক দিয়ে
হৃদয়ে আজি নিয়ে এসেছ, প্রিয়ে,
করুণ পরিচয়–
শরৎপ্রাতে আলোর সাথে ছায়ার পরিণয়।
তৃষিত হয়ে ওইটুকুরই লাগি
আছিল মন জাগি,
বুঝিতে তাহা পারি নি এতদিন।
গৌরবের গিরিশিখর-‘পরে
ছিলে যে সমাদরে
তুষারসম শুভ্র সুকঠিন।
নামিলে নিয়ে অশ্রুজলধারা
ধূসর ম্লান আপন-মান-হারা
আমারও ক্ষমা চাহি–
তখনই জানি আমারই তুমি, নাহি গো দ্বিধা নাহি।
এখন আমি পেয়েছি অধিকার
তোমার বেদনার
অংশ নিতে আমার বেদনার।
আজিকে সব ব্যাঘাত টুটে
জীবনে মোর উঠিল ফুটে
শরম তব পরম করুণায়।
অকুণ্ঠিত দিনের আলো
টেনেছে মুখে ঘোমটা কালো;
আমার সাধনাতে
এল তোমার প্রদোষবেলা সাঁঝের তারা হাতে।

সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- নিখুঁত সৌন্দর্যের কঠিন রূপ বনাম ত্রুটির মাধুর্য:“নিখুঁত শোভা নিরতিশয় তেজে / অপরাজেয় সে যে / পূর্ণ নিজে নিজেরই সম্মানে। / একটুখানি দোষের ফাঁক দিয়ে / হৃদয়ে আজি নিয়ে এসেছ, প্রিয়ে, / করুণ পরিচয়–“— অভ্রান্ত পূর্ণতা নিজের অহংকারে অটল ও অপরাজেয় থাকে, তাকে সহজে ছোঁয়া যায় না। কিন্তু একটি ছোট ভুলের কারণে যখন সেই সৌন্দর্যে কোমল বেদনার স্পর্শ লাগে, তখন তা দুর্ভেদ্য মহিমা ভেঙে প্রেমের এক করুণ ও পেলব রূপ নিয়ে ধরা দেয়।
- গিরিশিখরের তুষার থেকে মাটিতে অবতরণ:“গৌরবের গিরিশিখর-‘পরে / ছিলে যে সমাদরে / তুষারসম শুভ্র সুকঠিন। / নামিলে নিয়ে অশ্রুজলধারা / ধূসর ম্লান আপন-মান-হারা / আমারও ক্ষমা চাহি– / তখনই জানি আমারই তুমি,”— নিখুঁত অবস্থায় প্রিয়া ছিল পর্বতের বরফের মতো শুভ্র ও দুর্গম। কিন্তু গান ও তালের ভুলে সে যখন অশ্রুভেজা চোখে ক্ষমা চাইল, তখন তার মানবীয় দুর্বলতাই তাকে কবির একান্ত আপন করে তুলল। অপূর্ণতাই মানুষকে ভালোবাসার কাছাকাছি আনে।
- বেদনার মেলবন্ধন ও সাঁঝের তারার আলো:“এখন আমি পেয়েছি অধিকার / তোমার বেদনার / অংশ নিতে আমার বেদনায়। / … অকুণ্ঠিত দিনের আলো / টেনেছে মুখে ঘোমটা কালো; / আমার সাধনাতে / এল তোমার প্রদোষবেলা সাঁঝের তারা হাতে।”— প্রিয়ার এই ভুলের মধ্য দিয়েই কবি তার সুখের চেয়েও গভীর যে দুঃখ, সেই বেদনার ভাগীদার হওয়ার অধিকার পেলেন। অহংকারের প্রখর দ্বিপ্রহরিক আলো মিলিয়ে গিয়ে সেখানে নেমে এসেছে সন্ধ্যার স্নিগ্ধ ছায়া এবং সাঁঝের তারার মতো শান্ত ও স্থায়ী প্রেম।
