আপনার ভালো লাগতে পারে

রবীন্দ্র রচনাবলী, রবীন্দ্র সঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, নাট্যসাহিত্য, চিত্রকলা, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও শিক্ষাচিন্তা

সোনার তরী কাব্যগ্রন্থের ‘বৈষ্ণব কবিতা’ — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Table of Content

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সোনার তরী’ (১৮৯৩/১৮৯৪) কাব্যগ্রন্থের অন্যতম শ্রেষ্ঠ, দার্শনিক ও মানবতাবাদী সৃষ্টি হলো ‘বৈষ্ণব কবিতা’। এই কবিতায় বৈষ্ণব পদাবলীর রাধা-কৃষ্ণের প্রেম, বিরহ ও মিলনলীলাকে কেবল দেবতা বা বৈকুণ্ঠের সম্পত্তি হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে, তা যে মর্ত্যের সাধারণ নর-নারীর তপ্ত প্রেম-তৃষ্ণা ও দৈনন্দিন জীবনের সুখ-দুঃখের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত—সেই শাশ্বত সত্য অত্যন্ত সুনিপুণ ও সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামবৈষ্ণব কবিতা
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থসোনার তরী
প্রকাশের তারিখ১৮ আষাঢ়, ১২৯৯ বঙ্গাব্দ (১৮৯২) / সোনার তরী কাব্যগ্রন্থভুক্ত
কবিতার ধরনদার্শনিক, মানবতাবাদী ও সাহিত্য-বিশ্লেষণধর্মী গীতি-কবিতা (Philosophical, Humanistic and Lyrical Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৮৯৪ সালে প্রকাশিত ‘সোনার তরী’ কাব্যগ্রন্থে কবির মানবপ্রেম ও আধ্যাত্মিক চেতনার এক অপরূপ সমন্বয় ঘটেছে। ‘বৈষ্ণব কবিতা’য় কবি প্রশ্ন তুলেছেন যে, বৈষ্ণব পদাবলীর প্রেমলীলা—পূর্বরাগ, অনুরাগ, অভিসার ও বৃন্দাবন-গাথা—কি কেবল বৈকুণ্ঠের দেবতা বা রাধা-কৃষ্ণের জন্য নির্দিষ্ট? মর্ত্যের সাধারণ নরনারী যারা প্রতিদিনের সংসার জীবনে প্রেম ও বিরহের তাড়নায় দগ্ধ হয়, তাদের কি সেই গীত-সুধায় অধিকার নেই? কবি দেখিয়েছেন যে, বৈষ্ণব কবিরা যে প্রেমের ছবি এঁকেছেন, তা আসলে মানবহৃদয়েরই চিরন্তন রূপ। দেবতাকে যা দেওয়া যায়, তা প্রিয়জনকেও দেওয়া চলে—কারণ দেবতা ও প্রিয়জন এখানে একাকার হয়ে গেছে। সাধারণ মানুষ সেই অমর প্রেমধারা থেকে নিজেদের কুটির ও জীবনকে স্নিগ্ধ করে নেয়।

বৈষ্ণব কবিতা – পুরো কবিতা

বৈষ্ণব কবিতা।

শুধু বৈকুণ্ঠের তরে বৈষ্ণবের গান!
পূর্বরাগ, অনুরাগ, মান অভিমান,
অভিসার, প্রেমলীলা, বিরহ মিলন,
বৃন্দাবন-গাথা,—এই প্রণয়-স্বপন
শ্রাবণের শর্ব্বরীতে কালিন্দীর কূলে,
চারি চক্ষে চেয়ে দেখা কদম্বের মূলে
সরমে সম্ভ্রমে, —এ কি শুধু দেবতার!
এ সঙ্গীত-রসধারা নহে মিটাবার
দীন মর্ত্তবাসী এই নরনারীদের
প্রতি রজনীর আর প্রতি দিবসের
তপ্ত প্রেম-তৃষা!

এ গীত-উৎসব মাঝে
শুধু তিনি আর ভক্ত নির্জ্জনে বিরাজে;—
দাঁড়ায়ে বাহির দ্বারে মোরা নরনারী
উৎসুক শ্রবণ পাতি’ শুনি যদি তারি
দুয়েকটি তান,—দূর হ’তে তাই শুনে’
তরুণ বসন্তে যদি নবীন ফাল্গুনে
অন্তর পুলকি’ উঠে; শুনি’ সেই সুর
সহসা দেখিতে পাই দ্বিগুণ মধুর

ক
আমাদের ধরা;—মধুময় হ’য়ে উঠে
আমাদের বনচ্ছায়ে যে নদীটি ছুটে,
মোদের কুটীর-প্রান্তে যে কদম্ব ফুটে
বরষার দিনে;—সেই প্রেমাতুর তানে
যদি ফিরে চেয়ে দেখি মোর পার্শ্বপানে
ধরি মোর বামবাহু র’য়েছে দাঁড়ায়ে
ধরার সঙ্গিনী মোর, হৃদয় বাড়ায়ে
মোর দিকে, বহি নিজ মৌন ভালবাসা;
ওই গানে যদি বা সে পায় নিজ ভাষা,—
যদি তার মুখে ফুটে পূর্ণ প্রেমজ্যোতি,
তোমার কি তাঁর, বন্ধু, তাহে কার ক্ষতি?

সত্য করে’ কহ মোরে, হে বৈষ্ণব কবি,
কোথা তুমি পেয়েছিলে এই প্রেমছবি,
কোথা তুমি শিখেছিলে এই প্রেমগান
বিরহ-তাপিত? হেরি কাহার নয়ান,
রাধিকার অশ্রু-আঁখি পড়েছিল মনে?
বিজন বসন্তরাতে মিলন-শয়নে
কে তোমারে বেঁধেছিল দুটি বাহুডোরে,
আপনার হৃদয়ের অগাধ সাগরে
রেখেছিল মগ্ন করি! এত প্রেমকথা,
রাধিকার চিত্ত-দীর্ণ তীব্র ব্যাকুলতা,
চুরি করি’ লইয়াছ কার মুখ, কার
আঁখি হ’তে! আজ তার নাহি অধিকার

সে সঙ্গীতে! তারি নারী-হৃদয়-সঞ্চিত
তার ভাষা হ’তে তারে করিবে বঞ্চিত
চিরদিন!

আমাদেরি কুটীর-কাননে
ফুটে পুষ্প, কেহ দেয় দেবতা-চরণে,
কেহ রাখে প্রিয়জন তরে—তাহে তাঁর
নাহি অসন্তোষ! এই প্রেম-গীতি-হার
গাঁথা হয় নর-নারী-মিলন-মেলায়
কেহ দেয় তাঁরে, কেহ বঁধুর গলায়!
দেবতারে যাহা দিতে পারি, দিই তাই
প্রিয়জনে—প্রিয়জনে যাহা দিতে পাই
তাই দিই দেবতারে; আর পাব কোথা!
দেবতারে প্রিয় করি, প্রিয়েরে দেবতা!

বৈষ্ণব কবির গাঁথা প্রেম-উপহার
চলিয়াছে নিশিদিন কত ভারে ভার
বৈকুণ্ঠের পথে। মধ্যপথে নরনারী
অক্ষয় সে সুধারাশি করি কাড়াকাড়ি
লইতেছি আপনার প্রিয় গৃহতরে
যথাসাধ্য যে যাহার; যুগে যুগান্তরে
চিরদিন পৃথিবীতে যুবকযুবতী
নরনারী এমনি চঞ্চল মতিগতি।

দুই পক্ষে মিলে একেবারে আত্মহারা
অবোধ অজ্ঞান। সৌন্দর্য্যের দস্যু তারা
লুটে-পুটে নিতে চায় সব! এত গীতি,
এত ছন্দ, এত ভাবে উচ্ছ্বসিত প্রীতি,
এত মধুরতা দ্বারের সম্মুখ দিয়া
বহে’ যায়—তাই তারা পড়েছে আসিয়া
সবে মিলি কলরবে সেই সুধাস্রোতে।
সমুদ্রবাহিনী সেই প্রেমধারা হ’তে
কলস ভরিয়া তারা লয়ে যায় তীরে
বিচার না করি কিছু, আপন কুটীরে
আপনার তরে! তুমি মিছে ধর দোষ,
হে সাধু পণ্ডিত, মিছে করিতেছ রোষ!
যাঁর ধন তিনি ওই অপার সন্তোষে
অসীম স্নেহের হাসি হাসিছেন বসে’।

১৮ আষাঢ়, ১২৯৯।

বৈষ্ণব কবিতার Romanized Version:

Boshnob kobita.
Shudhu baikunther tore boshnober gan!
Purborag, anurag, man oviman,
Ovisar, premlila, biroho milon,
Brindabon-gatha,—ei pronoy-shopon
Shraboner shorborite kolindir kule,
Chari chokhe cheye deka kodomber mule
Sorome shombrome, —e ki shudhu debotar!
E shonggit-roshdhara nohe mitabar
Din morttobashi ei nor-narider
Proti rojonir ar proti diboser
Topto prem-trisha!
E git-utsob majhe
Shudhu tini ar bhokto nirojone biraje;—
Daraye bahir dware mora nor-nari
Utshuk shrobon pati’ shuni jodi tari
Duyekti tan, —dur ho’te tai shune’
Torun boshonte jodi nobin falgune
Ontor puloki’ uthe; shuni’ shei shur
Shohosha dekhte pai dwigun modhur
Amader dhora;—modhumoy ho’ye uthe
Amader bonchhaye je noditi chhute,
Moder kutir-prante je kodombo fute
Borshar dine;—shei prematur tane
Jodi fire cheye dekhi mor parshpane
Dhori mor bambahu r’yeche daraye
Dhorar shongini mor, hridoy baraye
Mor dike, bohi nij mouno bhalobasha;
Oi gane jodi ba se pay nij bhasha,—
Jodi tar mukhe fute purno premjyoti,
Tomar ki tar, bondhu, tahe kar khoti?
Sotyo kore’ koho more, he boshnob kobi,
Kotha tumi peyechhile ei premchhobi,
Kotha tumi shikhechhile ei premgan
Biroho-tapito? Heri kahar noyan,
Radhikar oshru-ankhi porechilo mone?
Bijon boshontorate milon-shoyone
Ke tomare bendhechhile duti bahudore,
Aponar hridoyer ogadh shagore
Rekhechilo mogno kori! Eto premkotha,
Radhikar chitto-dirno tibro byakulota,
Churi kori’ loiyechha kar mukh, kar
Ankhi ho’te! Aj tar nahi odhikar
Se shonggite! Tari nari-hridoy-shonchito
Tar bhasha ho’te tare koribe bonchito
Chirodin!
Amaderi kutir-kanane
Fute pushpo, keho dey debota-chorone,
Keho rakhe priyojon tore—tahe tar
Nahi oshontosh! Ei prem-giti-har
Gatha hoy nor-nari-milon-melay
Keho dey tare, keho bodhur golay!
Debotare jaha dite pari, dii tai
Priyojone—priyojone jaha dite pai
Tai dii debotare; ar pabo kotha!
Debotare priyo kori, priyere debota!
Boshnob kobir gatha prem-upohar
Choliyeche nishidin koto bhare bhare
Baikunther pothe. Modhyopothe nor-nari
Okkhoy se shudharashi kori karakari
Loitechhiponar priyo grihotore
Jothashadhyo je jahor; juge jugantore
Chirodin prithibite jubok-juboti
Nor-nari emni chonchol motigoti.
Dui pokkhe mile ekbare attihara
Obodh oggnan. Shoundorjer doshyu tara
Lute-pute nite chay shob! Eto giti,
Eto chhando, eto bhabe uchchhoshito priti,
Eto modhurota dware shammukh diya
Bohe’ jay—tai tara porechhe ashiya
Shobe mili kolrobe sei shudhashrote.
Shomudrobahini sei premdhara ho’te
Kolosh boriya tara loye jay tire
Bichar na kori apon kutire
Aponar tore! Tumi michhe dhor dosh,
He sadhu pondit, michhe koritecho rosh!
Yar dhon tini oi opar shontoshe
Oshim sneher hashi hashichhen bose’.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • প্রেমের সার্বজনীন রূপ: বৈষ্ণব পদাবলীর প্রেম ও বিরহ কেবল দেবতা বা বৈকুণ্ঠের বিষয় নয়; তা মর্ত্যের নরনারীর হৃদয়েরও বাস্তব আকুতি।
  • দেবতা ও প্রিয়জনের অভিন্নতা: মানুষ দেবতাকে যা দেয়, তা প্রিয়জনকেও দেয়; আবার প্রিয়জনকে যা দেয়, তা দেবতাই পান। দেবতা ও প্রিয়জন এখানে একাকার হয়ে গেছে।
  • সাধু-পণ্ডিতের প্রতি কবির ব্যঙ্গ: বৈষ্ণব পদাবলীর রস সাধারণ মানুষ যখন নিজেদের সংসারের সুখে-দুঃখে আপন করে নেয়, তখন সাধু-পণ্ডিতদের আপত্তি বা রোষকে কবি অর্থহীন বলে অভিহিত করেছেন। কারণ যার প্রেম, তিনি অপার সন্তোষেই তা উপভোগ করছেন।

উৎস:কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (সোনার তরী কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

Share

সাহিত্য ডেস্ক, আমার রবীন্দ্রনাথ, GOLN

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিস্তৃত সাহিত্যভুবনের একটি নিবেদিত আয়োজন—‘আমার রবীন্দ্রনাথ’-এর সাহিত্য ডেস্ক। এখানে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, পত্রসাহিত্য, ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিকথা, অনুবাদ ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম নিয়ে প্রকাশিত হবে পাঠ, বিশ্লেষণ, আলোচনা ও গবেষণাভিত্তিক লেখা।তাঁর সাহিত্যকর্মের বিষয়, ভাষা, শিল্পরীতি, ভাবনা ও সময়ের প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়ে পাঠকের সামনে তুলে ধরা হবে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির বহুমাত্রিকতা। পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যচিন্তা, চরিত্র নির্মাণ, প্রকৃতি ও মানবজীবনের উপস্থাপন এবং বাংলা সাহিত্যে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও থাকবে বিশেষ আয়োজন।রবীন্দ্রসাহিত্যের পাঠ, বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যভুবনকে আরও গভীরভাবে জানাই এই ডেস্কের উদ্দেশ্য।

মন্তব্য করুন

সম্পাদকের পছন্দ

জনপ্রিয়

© ২০২৬ আমার রবীন্দ্রনাথ। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত