Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয়বিবরণ | তথ্য |
| কবিতার নাম | বন্দিনী |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | মহুয়া |
| প্রকাশের বছর | ১৯২৯ (১৩৩৬ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | রোমান্টিক রূপক-লিরিক ও মুক্তিচেতনার প্রণয়গীতি (Allegorical Romantic Lyric) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
সম্পূর্ণ কবিতা:
তুমি বনের পুব পবনের সাথী,
বাদল মেঘের পথে তোমার ডানার মাতামাতি।
ওগো পাখি, বাঁধনহারা পাখি,
খাঁচার কোণে এই বিজনে আপন মনে থাকি।
হায় অজানা, জানি না সে
উধাও তুমি কোন্ আকাশে,
কোন্ তমালের কাননতলে মধ্যদিনের তাপে
বনচ্ছায়ার শিরায় শিরায় তোমারি সুর কাঁপে।
কোন্ রঙনে রঙিন তোমার পাখা?
তোমার সোনার বরনখানি ভাবনাতে মোর আঁকা
ওগো পাখি, বাঁধনহারা পাখি,
মুক্তরূপের ধ্যানের ছায়ায় মগ্ন আমার আঁখি।
বন্দী মনের বদ্ধ ডানা,
চতুর্দিকে কঠোর মানা,
তোমার সাথে উড়ে চলার মিলন মাগি মনে–
শূন্যে সদাই গান ফেরে তাই অসীম অন্বেষণে।
গান গাওয়া মোর সেই মিলনের খেলা,
তোমার গানের ছন্দে আমার স্বপন-পাখা মেলা।
ওগো পাখি,বাঁধনহারা পাখি,
মনে মনে তোমায় পরাই গানের গাঁথন রাখি।
আজি আমার সুরের মাঝে
দূরের ডানার শব্দ বাজে,
মেঘের পথিক গানে আমার এল প্রাণের কূলে,
বিরহেরি আকাশতলে নিল আমায় তুলে।
গানের হাওয়ায় নিকট মিলায় দূরে–
দূর আসে সেই হাওয়ায় প্রাণের নিকট অন্তঃপুরে।
ওগো পাখি, বাঁধনহারা পাখি,
তোমার গানের মরীচিকায় শূন্য যে দাও ঢাকি।
বাঁধনে তাই জাদু লাগে,
বীণার তারে মূর্তি জাগে,
রাগিণীতে মুক্তি সে দেয়, ওগো আমার দূর,
তোমার দেওয়া না-শোনা গান বাঁধে যে তার সুর।
সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:
Tumi boner pub poboner shathi,
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- সীমা ও অসীমের দ্বন্দ্ব:“তুমি বনের পুব পবনের সাথী, / বাদল মেঘের পথে তোমার ডানার মাতামাতি। / ওগো পাখি, বাঁধনহারা পাখি, / খাঁচার কোণে এই বিজনে আপন মনে থাকি।”— মুক্ত আকাশ ও রুদ্ধ খাঁচার বৈপরীত্যে কবিতাটির সূচনা। দূর দিগন্তের উধাও পাখিটি অসীম মুক্তির প্রতীক, আর খাঁচাবন্দি নারী পার্থিব সীমার নিগড়ে বাঁধা। এই দুই বিপরীত মেরুর মধ্যে অদৃশ্য প্রেমের এক আকুল টান অনুভূত হয়।
- কল্পনার চোখে রূপসন্ধান ও গানের বন্ধন:“কোন্ রঙনে রঙিন তোমার পাখা? / তোমার সোনার বরনখানি ভাবনাতে মোর আঁকা / … মনে মনে তোমায় পরাই গানের গাঁথন রাখি।”— যে প্রিয়তমকে চোখে দেখা যায় না, ধ্যানের আলোয় তার এক সোনারূপ গড়ে তোলে বন্দিনী। বাস্তব ডানায় ওড়ার সাধ্য নেই বলে সে সঙ্গীতের আশ্রয় নেয়। কল্পনার রাখি পরিয়ে সে দূর অচেনাকে নিজের গানের সুরে বেঁধে ফেলে।
- সঙ্গীতের মাধ্যমে দূর ও নিকটের একাত্মতা:“গানের হাওয়ায় নিকট মিলায় দূরে– / দূর আসে সেই হাওয়ায় প্রাণের নিকট অন্তঃপুরে। / … রাগিণীতে মুক্তি সে দেয়, ওগো আমার দূর, / তোমার দেওয়া না-শোনা গান বাঁধে যে তার সুর।”— কবিতার চরম পরাকাষ্ঠা সুরের ইন্দ্রজালে। সঙ্গীত সমস্ত ভৌগোলিক দূরত্ব ও বাস্তব প্রাচীরকে মুছে দেয়; দূর তখন ঘরের অন্তঃপুরে নেমে আসে, আর নিকটের খাঁচা মিলিয়ে যায় অনন্ত আকাশে। বাহ্যিক বন্ধন থাকলেও অন্তরের সুরলোকে বন্দিনী নারী পরম মুক্তি ও পূর্ণতার স্বাদ লাভ করে।