মহুয়া কাব্যগ্রন্থের শুকতারা কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মহুয়া’ কাব্যগ্রন্থের একটি স্বপ্নিল, রূপকধর্মী ও সুরময় লিরিক কবিতা হলো ‘শুকতারা’। রজনীর অবসানলগ্নে ক্লান্ত, অস্তগামী চাঁদের সঙ্গে ভোরের শুকতারার ক্ষণিক সাক্ষাৎ এবং রাতের না-বলা সুরকে প্রভাতের পূর্ণ আলোয় সঁপে দেওয়ার আকুল নিবেদন এ কবিতায় এক অপার্থিব সৌন্দর্যে রূপায়িত হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামশুকতারা
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থমহুয়া
প্রকাশের বছর১৯২৯ (১৩৩৬ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনরূপকাশ্রিত রোমান্টিক লিরিক ও বিদায়-গাথা (Allegorical Romantic Lyric)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯২৯ সালে প্রকাশিত ‘মহুয়া’ কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ মহাজাগতিক রূপকল্পের মাধ্যমে মানবচেতনার গভীর ভাব প্রকাশ করেছেন। কবিতাটিতে কবি নিজেকে কল্পনা করেছেন শেষ রাতের দিগন্তে অস্তোন্মুখ, ক্লান্ত ও ‘আধো-জাগ্রত চন্দ্র’ হিসেবে। তাঁর সারারাতের যাত্রা সমাপ্তপ্রায়, সুর অবসন্ন এবং দেহ ক্লান্তিতে অবশ। এমন সময় দূর শৈলশিখরে উদিত হয় নতুন ভোরের অগ্রদূত ‘শুকতারা’। অস্তগামী চন্দ্র শুকতারার কাছে আকুল আহ্বান জানায়—রাতের তন্দ্রায় ও স্বপ্নে যে সুর অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে, শুকতারা যেন তাকে অন্ধকার থেকে তুলে প্রভাতের নবীন আলোয় পূর্ণতা দেয়। রাতের মায়াবী সুপ্তি যেখানে বিশ্বের মহামন্দ্রে মিলিয়ে যায়, সেখানেই চন্দ্র তার জীবনের শেষ বাণীরূপ অর্পণ করে।

সম্পূর্ণ কবিতা:

সুন্দরী তুমি শুক-তারা
সুদূর শৈলশিখরান্তে,
শর্বরী যবে হবে সারা
দর্শন দিয়ো দিক্‌ভ্রান্তে।
ধরা যেথা অম্বরে মেশে
আমি আধো-জাগ্রত চন্দ্র,
আঁধারের বক্ষের ‘পরে
আধেক আলোকরেখা রন্ধ্র।
আমার আসন রাখে পেতে
নিদ্রাগহন মহাশূন্য,
তন্ত্রী বাজাই স্বপনেতে
তন্দ্রা ঈষৎ করি ক্ষুণ্ন।
মন্দ চরণে চলি পারে,
যাত্রা হয়েছে মোর সাঙ্গ।
সুর থেমে আসে বারে বারে,
ক্লান্তিতে আমি অবশাঙ্গ।
সুন্দরী ওগো শুক-তারা,
রাত্রি না যেতে এসো তূর্ণ।
স্বপ্নে যে বাণী হল হারা
জাগরণে করো তারে পূর্ণ।
নিশীথের তল হতে তুলি
লহো তারে প্রভাতের জন্য।
আঁধারে নিজেরে ছিল ভুলি,
আলোকে তাহারে করো ধন্য।
যেখানে সুপ্তি হল লীনা,
যেথা বিশ্বের মহামন্দ্র,
অর্পিনু সেথা মোর বীণা
আমি আধো-জাগ্রত চন্দ্র।

সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

Shundori tumi shuk-tara
Shudur shoiloshikhorante,
Shorbori jobe hobe shara
Dorshon diyo dikbhrante.
Dhora jetha ombore meshe
Ami adho-jagroto chondro,
Andharer bokkher ‘pore
Adhek alokrekha rondhro.
Amar ashon rakhe pete
Nidragohon mohashunno,
Tontri bajai swoponete
Tondra ishot kori kkhunno.
Mondo chorone choli pare,
Jatra hoyechhe mor shanggô.
Shur theme ashe bare bare,
Klantite ami oboshanggô.
Shundori ogo shuk-tara,
Ratri na jete esho turnô.
Swopne je bani holo hara
Jagorone koro tare purno.
Nishither tol hote tuli
Loho tare probhater jonno.
Andhare nijere chhilo bhuli,
Aloke tahare koro dhonno.
Jekhane shupti holo lina,
Jetha bissher mohamondro,
Orpinu shetha mor bina
Ami adho-jagroto chondro.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • অস্তগামী চন্দ্র ও উদীয়মান শুকতারার রূপক:
    “ধরা যেথা অম্বরে মেশে / আমি আধো-জাগ্রত চন্দ্র, / … সুন্দরী তুমি শুক-তারা / সুদূর শৈলশিখরান্তে,”
    — দিগন্তরেখায় রাত্রি ও প্রভাতের সন্ধিক্ষণকে এক অপূর্ব রূপকে বাঁধা হয়েছে। একদিকে ক্লান্ত, অপসীয়মাণ চাঁদের বিদায়বেদনা, অন্যদিকে পর্বতের শিখরে ভোরের শুকতারার জ্যোতির্ময় আগমন। এই দুই সত্তার মিলনমুহূর্তটি কবিতার মূল কেন্দ্র।
  • ক্লান্তি ও অসমাপ্তির আর্তি:
    “মন্দ চরণে চলি পারে, / যাত্রা হয়েছে মোর সাঙ্গ। / সুর থেমে আসে বারে বারে, / ক্লান্তিতে আমি অবশাঙ্গ।”
    — জীবনের বা সৃষ্টির দীর্ঘ রাত্রির শেষে শিল্পী বা প্রেমিকের ভেতরে নেমে আসে ক্লান্তি। তার তন্ত্রীতে সুর থেমে আসতে চায়, যাত্রা শেষের পথে। এই অবসাদ কোনো ব্যর্থতা নয়, বরং এক শান্ত সমর্পণের প্রস্তুতি।
  • স্বপ্নের সুরকে আলোয় রূপান্তরের প্রার্থনা:
    “স্বপ্নে যে বাণী হল হারা / জাগরণে করো তারে পূর্ণ। / নিশীথের তল হতে তুলি / লহো তারে প্রভাতের জন্য। / … অর্পিনু সেথা মোর বীণা”
    — রাতের নির্জনে স্বপ্নে যে ভাব অস্ফুট বা অপূর্ণ থেকে যায়, তাকে জাগ্রত প্রভাতের বাস্তব আলোয় সার্থক করার দায়িত্ব শুকতারার ওপর ন্যস্ত হয়। বিদায়ী সত্তা তার বীণাটি তুলে দেয় নবীন আলোর হাতে, যেন মহাবিশ্বের বৃহৎ কলতানে তার অবহেলিত সুরটি চিরন্তন হয়ে বেঁচে থাকে।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ (অনলাইন অনুলিপির ত্রুটি সংশোধনপূর্বক: শেষ চরণের প্রামাণ্য ‘অর্পিনু সেথা মোর বীণা’ রূপসহ), ছন্দবিন্যাস ও সংকলন-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (মহুয়া কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন