রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর কাব্যগ্রন্থ মহুয়া (১৯২৯) তাঁর পরিণত কাব্যপর্বের এক শক্তিশালী ও প্রতিবাদী সংকলন। এই গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ মানবিক মর্যাদা, নৈতিকতা, আত্মসম্মান ও বিকৃত আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন। মহুয়া কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত “স্পর্ধা” কবিতাটি সেই প্রতিবাদী চেতনার এক তীব্র প্রকাশ—যেখানে কবি দুর্বলতা, লালসা ও ভণ্ড আবেগকে কঠোর ভাষায় প্রত্যাখ্যান করে প্রেম ও নারীর মর্যাদাকে উচ্চাসনে প্রতিষ্ঠা করেছেন।
Table of Contents
স্পর্ধা কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শ্লথপ্রাণ দুর্বলের স্পর্ধা আমি কভু সহিব না।
লোলুপ সে লালায়িত, প্রেমেরে সে করে বিড়ম্বনা
ক্লেদঘন চাটুবাক্যে, বাষ্পে বিজড়িত দৃষ্টি তার
কলুষকুণ্ঠিত অঙ্গে লিপ্ত করে গ্লানি লালসার,
আবেশে মন্থর কণ্ঠে গদ্গদ সে প্রার্থনা জানায়
আলোকবঞ্চিত তার অন্তরের কানায় কানায়
দুষ্ট ফেন উঠে বুদ্বুদিয়া– ফেটে যায়, দেয় খুলি
রুদ্ধ বিষবায়ু। গলিত মাংসের যেন ক্রিমিগুলি
কল্পনাবিকার তার শিথিল চিন্তার তলে তলে
আকুলিতে থাকে কিলিবিলি।– যেন প্রাণপণ বলে
মন তারে করে কষাঘাত! জীর্ণমজ্জা কাপুরুষে
নারী যদি গ্রাহ্য করে, লজ্জিত দেবতা তারে দুষে
অসহ্য সে অপমানে। নারী সে-যে মহেন্দ্রের দান,
এসেছে ধরিত্রীতলে পুরুষেরে সঁপিতে সম্মান।

কবিতার মূল সুর : দুর্বলতার বিরুদ্ধে প্রত্যাখ্যান
কবিতার সূচনাতেই কবির ঘোষণা দৃঢ় ও নির্ভীক—
“শ্লথপ্রাণ দুর্বলের স্পর্ধা আমি কভু সহিব না।”
এখানে ‘স্পর্ধা’ শব্দটি অহংকার নয়, বরং অনৈতিক সাহসের প্রতীক। কবি আঘাত করেন সেই পুরুষসত্তার উপর, যে নিজের দুর্বলতা ও লালসাকে প্রেমের নামে বৈধতা দিতে চায়। চাটুবাক্য, গদ্গদ প্রার্থনা, কৃত্রিম আবেশ—সবকিছু মিলিয়ে এই প্রেম আসলে বিকৃত আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ।
লালসার নগ্ন রূপ ও নৈতিক ক্ষয়
রবীন্দ্রনাথ এই কবিতায় লালসাকে রূপক ও প্রতীকী চিত্রে ভয়াবহ করে তুলেছেন—
- “বাষ্পে বিজড়িত দৃষ্টি”
- “রুদ্ধ বিষবায়ু”
- “গলিত মাংসের ক্রিমি”
এই সব চিত্রকল্পে প্রেমের মুখোশ খুলে পড়ে। এটি কোনো সৌন্দর্য বা আবেগ নয়, বরং নৈতিক পচনের প্রতিচ্ছবি। কবির মতে, এমন লালসা শুধু নারীকে অপমান করে না, বরং পুরুষের নিজের আত্মাকেও কলুষিত করে।
নারীর মর্যাদা : দেবত্বের স্তরে উত্তরণ
কবিতার শেষ অংশে রবীন্দ্রনাথ নারীর অবস্থান স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করেন। নারী কোনো ভোগ্য বস্তু নয়, কোনো করুণার পাত্র নয়—
“নারী সে-যে মহেন্দ্রের দান,
এসেছে ধরিত্রীতলে পুরুষেরে সঁপিতে সম্মান।”
এখানে নারী হয়ে ওঠেন মর্যাদার ধারক, পুরুষের সম্মানের পরীক্ষক। নারী যদি দুর্বল পুরুষের লালসাকে গ্রহণ করেন, তবে সেই অপমানে দেবতারাও লজ্জিত হন—এই বক্তব্যে কবির নৈতিক কঠোরতা স্পষ্ট।
দার্শনিক ও সামাজিক তাৎপর্য
“স্পর্ধা” কবিতাটি আমাদের শেখায়—
- প্রেম মানে আত্মসংযম ও সম্মান
- দুর্বলতা দিয়ে দাবি করা ভালোবাসা আসলে অপমান
- নারী স্বাধীন সত্তা, পুরুষের আত্মশুদ্ধির মাপকাঠি
এই কবিতায় রবীন্দ্রনাথ সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে গিয়ে নারীর মর্যাদা ও নৈতিক সম্পর্কের দর্শন ঘোষণা করেছেন।
“স্পর্ধা” মহুয়া কাব্যগ্রন্থের এক কঠোর অথচ প্রয়োজনীয় কবিতা। এটি প্রেমের নামে ভণ্ডামি ও লালসার বিরুদ্ধে এক নৈতিক ঘোষণাপত্র। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই কবিতার মাধ্যমে স্মরণ করিয়ে দেন—যেখানে সম্মান নেই, সেখানে প্রেমও নেই। এই সত্য আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও জরুরি।