রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর কাব্যগ্রন্থ নবজাতক তাঁর পরিণত কাব্যচিন্তার এক সংবেদনশীল সংকলন। এই গ্রন্থে কবি স্মৃতি, অনুপস্থিতি, নীরব সম্পর্ক ও অবহেলার বেদনা—এসব সূক্ষ্ম অনুভূতিকে গভীর মানবিকতায় প্রকাশ করেছেন। নবজাতক কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত “মৌলানা জিয়াউদ্দীন” কবিতাটি এক ব্যক্তিগত স্মরণকাব্য, যেখানে কবি কোনো উচ্চকণ্ঠ প্রশস্তি নয়—বরং দৈনন্দিন সহাবস্থানের নিঃশব্দ মূল্যকে কেন্দ্র করে শোক, অনুশোচনা ও ভালোবাসার অন্তর্মুখী ভাষ্য নির্মাণ করেছেন।
Table of Contents
মৌলানা জিয়াউদ্দীন কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কখনো কখনো কোনো অবসরে
নিকটে দাঁড়াতে এসে;
“এই যে’ বলেই তাকাতেম মুখে,
“বোসো’ বলিতাম হেসে।
দু-চারটে হত সামান্য কথা,
ঘরের প্রশ্ন কিছু,
গভীর হৃদয় নীরবে রহিত
হাসিতামাশার পিছু।
কত সে গভীর প্রেম সুনিবিড়,
অকথিত কত বাণী,
চিরকাল-তরে গিয়েছ যখন
আজিকে সে কথা জানি।
প্রতি দিবসের তুচ্ছ খেয়ালে
সামান্য যাওয়া-আসা,
সেটুকু হারালে কতখানি যায়
খুঁজে নাহি পাই ভাষা।
তব জীবনের বহু সাধনার
যে পণ্যভারে ভরি
মধ্যদিনের বাতাসে ভাসালে
তোমার নবীন তরী,
যেমনি তা হোক মনে জানি তার
এতটা মূল্য নাই
যার বিনিময়ে পাবে তব স্মৃতি
আপন নিত্য ঠাঁই–
সেই কথা স্মরি বার বার আজ
লাগে ধিক্কার প্রাণে–
অজানা জনের পরম মূল্য
নাই কি গো কোনোখানে।
এ অবহেলার বেদনা বোঝাতে
কোথা হতে খুঁজে আনি
ছুরির আঘাত যেমন সহজ
তেমন সহজ বাণী।
কারো কবিত্ব, কারো বীরত্ব,
কারো অর্থের খ্যাতি–
কেহ-বা প্রজার সুহৃদ্ সহায়,
কেহ-বা রাজার জ্ঞাতি–
তুমি আপনার বন্ধুজনেরে
মাধুর্যে দিতে সাড়া,
ফুরাতে ফুরাতে রবে তবু তাহা
সকল খ্যাতির বাড়া।
ভরা আষাঢ়ের যে মালতীগুলি
আনন্দমহিমায়
আপনার দান নিঃশেষ করি
ধুলায় মিলায়ে যায়–
আকাশে আকাশে বাতাসে তাহারা
আমাদের চারি পাশে
তোমার বিরহ ছড়ায়ে চলেছে
সৌরভনিশ্বাসে।

কবিতার প্রেক্ষাপট ও ভাবধারা
কবিতার শুরুতেই দেখা যায় এক সহজ, প্রায় তুচ্ছ বলে মনে হওয়া সামাজিক মুহূর্ত—অবসরে কাছে এসে দাঁড়ানো, হাসিমুখে “বসো” বলা, দু-চারটি ঘরের কথা। এই সামান্য কথাবার্তার আড়ালেই লুকিয়ে থাকে গভীর হৃদ্যতা ও অকথিত অনুভব। কবি উপলব্ধি করেন—এই নীরব সান্নিধ্যই ছিল প্রকৃত সম্পদ, যা হারিয়ে যাওয়ার পর তার প্রকৃত মূল্য ধরা দেয়।
মৌলানা জিয়াউদ্দীনের প্রস্থান কবিকে বুঝিয়ে দেয়, প্রতিদিনের ছোট ছোট আসা-যাওয়াগুলো হারালে জীবনে কতখানি শূন্যতা জন্ম নেয়—যার ভাষা খুঁজে পাওয়া কঠিন।
অবহেলার বেদনা ও আত্মসমালোচনা
কবিতার মধ্যভাগে কবি নিজের প্রতিই প্রশ্ন তোলেন। জীবনের ব্যস্ততায়, “প্রতি দিবসের তুচ্ছ খেয়ালে” যে সম্পর্কগুলোকে অবহেলা করা হয়, সেগুলোর মূল্য কি আমরা সময় থাকতে বুঝতে পারি? কবি স্বীকার করেন—খ্যাতি, কীর্তি বা সাফল্যের তুলনায় এই নীরব মানবিক উপস্থিতির মূল্য তিনি যথাযথভাবে দেননি। এই উপলব্ধিই কবিতাকে করে তোলে গভীর আত্মসমালোচনামূলক।
মানবিক মূল্যবোধের পুনর্নির্ধারণ
রবীন্দ্রনাথ এখানে প্রচলিত সামাজিক মানদণ্ড—কবিত্ব, বীরত্ব, অর্থ বা ক্ষমতার খ্যাতি—এসবের ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন ব্যক্তিগত সৌহার্দ্য ও মাধুর্যকে। মৌলানা জিয়াউদ্দীন কোনো জাঁকজমকপূর্ণ পরিচয়ে নয়, বরং মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের উষ্ণতায় স্মরণীয় হয়ে ওঠেন। তাঁর প্রভাব ফুলের সৌরভের মতো—নিজেকে নিঃশেষ করে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে।
রূপক ও সৌন্দর্যবোধ
শেষ অংশে কবি মালতীফুলের রূপক ব্যবহার করে দেখিয়েছেন—যেমন ফুল নিজেকে নিঃশেষ করে সৌরভ ছড়ায়, তেমনি মৌলানা জিয়াউদ্দীনের অনুপস্থিতিও চারদিকে বিরহের সুবাস হয়ে রয়ে যায়। এই সৌরভই স্মৃতি—যা দৃশ্যমান না হলেও গভীরভাবে অনুভূত।
