বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শিশু ভোলানাথ’ কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম লঘু, ছন্দময় ও শিশুমনস্তত্ত্বভিত্তিক কবিতা হলো ‘সময়হারা’। ১৯২২ সালে প্রকাশিত এই কবিতায় ঘড়ি ধরে চলা নিয়মকানুনের কঠোরতা থেকে মুক্তির আনন্দ এবং খেলার অদম্য ইচ্ছার এক চমৎকার শৈল্পিক রূপ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | সময়হারা |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | শিশু ভোলানাথ |
| প্রকাশের বছর | ১৯২২ (১৩২৯ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | শিশুকেন্দ্রিক ও ছন্দময় লিরিক কবিতা (Child-centric and Rhythmic Lyrical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
১৯২২ সালে প্রকাশিত ‘শিশু ভোলানাথ’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিশুতোষ কবিতার এক অনন্য নিদর্শন। শিশুরা সাধারণত ঘড়ির কাঁটা বা নিয়মের বাঁধন মানতে চায় না; তাদের কাছে খেলা আর রূপকথার রাজত্বই আসল। ‘সময়হারা’ কবিতায় এক শিশুর অবুঝ যুক্তি ও আনন্দের প্রকাশ ঘটেছে। ঘড়ির সময় যদি চিরকালের মতো ফুরিয়ে যায়, তবে স্কুল যাওয়ার বা নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়ার বাধ্যবাধকতাও আর থাকে না। সময় না থাকলেও খেলা বা গল্প ফুরোয় না—শিশুর এই কল্পিত আনন্দলোক এখানে জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
সময়হারা – সম্পূর্ণ কবিতা
যত ঘণ্টা, যত মিনিট, সময় আছে যত
শেষ যদি হয় চিরকালের মতো,
তখন স্কুলে নেই বা গেলেম; কেউ যদি কয় মন্দ,
আমি বলব, “দশটা বাজাই বন্ধ।”
তাধিন তাধিন তাধিন।
শুই নে বলে রাগিস যদি, আমি বলব তোরে,
“রাত না হলে রাত হবে কী করে।
নটা বাজাই থামল যখন, কেমন করে শুই।
দেরি বলে নেই তো, মা, কিচ্ছুই।”
তাধিন তাধিন তাধিন।
যত জানিস রূপকথা, মা, সব যদি যাস বলে
রাত হবে না, রাত যাবে না চলে;
সময় যদি ফুরোয় তবে ফুরোয় না তো খেলা,
ফুরোয় না তো গল্প বলার বেলা।
তাধিন তাধিন তাধিন।
সময়হারা Romanized Version
Joto ghonta, joto minit, shomoy ache joto
Shesh jodi hoy chirokaler moto,
Tokhon skule nei ba gelem; keu jodi koy mondo,
Ami bolbo, “deshta bajai bondho.”
Tadhin tadhin tadhin.
Shui ne bole ragis jodi, ami bolbo tore,
“Rat na hole rat hobe ki kore.
Nota bajai thamlo jokhon, kemon kore shui.
Deri bole nei to, ma, kichchhui.”
Tadhin tadhin tadhin.
Joto janis rupkatha, ma, shob jodi jas bole
Rat hobe na, rat jabe na chole;
Shomoy jodi furoy tobe furoy na to khela,
Furoy na to golpo bolar bela.
Tadhin tadhin tadhin.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- সময় বা ঘড়ির নিয়মের বাইরে যাওয়ার আকুতি:
“যত ঘণ্টা, যত মিনিট, সময় আছে যত / শেষ যদি হয় চিরকালের মতো, / তখন স্কুলে নেই বা গেলেম; কেউ যদি কয় মন্দ, / আমি বলব, ‘দশটা বাজাই বন্ধ।'”— শিশু ঘড়ির সময় ও স্কুলের বাঁধাধরা নিয়মের গণ্ডি থেকে মুক্ত হতে চায়। ঘড়ির সময় শেষ হয়ে গেলে তার আর স্কুল যাওয়ার দায় থাকে না।
- ঘুমানোর অদ্ভুত যুক্তি:
“নটা বাজাই থামল যখন, কেমন করে শুই। / দেরি বলে নেই তো, মা, কিচ্ছুই।”— ঘড়ির সময় বন্ধ হয়ে গেলে দেরিতে ঘুমানোর কোনো প্রশ্নই আসে না, কারণ ঘড়িই তো আর চলছে না! শিশুর এই নিষ্পাপ ও চতুর যুক্তি পাঠকের মনে হাসি ফোটায়।
- সময় ফুরোলেও খেলা ও গল্পের অন্ত নেই:
“সময় যদি ফুরোয় তবে ফুরোয় না তো খেলা, / ফুরোয় না তো গল্প বলার বেলা।”— বাস্তব জীবনের সময় বা ঘড়ির কাঁটা ফুরিয়ে গেলেও শিশুদের কল্পনার জগৎ, খেলাধুলা এবং রূপকথা শোনার আনন্দ কখনো ফুরোয় না। ‘তাধিন তাধিন তাধিন’ ছন্দের মূর্ছনা এই কবিতায় এক আনন্দের দোলা জাগিয়ে তোলে।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (শিশু ভোলানাথ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।