শিশু ভোলানাথ কাব্যগ্রন্থের শিশু ভোলানাথ কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শিশু-ভোলানাথ’ কাব্যগ্রন্থের নামকবিতা এবং একটি অন্যতম গভীর দার্শনিক, প্রতীকধর্মী ও তেজস্বী সৃষ্টি হলো ‘শিশু-ভোলানাথ’। ১৯২২ সালে প্রকাশিত এই কবিতায় কবি মহাদেব শিবের শিশু রূপ বা ‘ভোলানাথ’-এর প্রতীক ব্যবহার করে বিশ্বপ্রকৃতির ধ্বংস ও সৃষ্টির লীলা, মোহমুক্তি এবং পরম স্বাধীনতার এক অনন্য রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন। শিশু যেমন খেলনা বানিয়ে আবার নিজেই তা ভেঙে ফেলে উল্লাস করে, তেমনি এই মহাবিশ্বের স্রষ্টা ও ধ্বংসের খেলায় কোনো জড়তা বা মায়া নেই।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামশিশু-ভোলানাথ
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থশিশু-ভোলানাথ
প্রকাশের বছর১৯২২ (১৩২৯ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনদার্শনিক ও প্রতীকধর্মী লিরিক কবিতা (Philosophical and Symbolic Lyrical Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

১৯২২ সালে প্রকাশিত ‘শিশু-ভোলানাথ’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাবজগতে এক বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এই গ্রন্থের নামকরণ করা হয়েছে এই বিখ্যাত কবিতাটির নামানুসারে। কবিতায় শিবের অপর নাম ‘ভোলানাথ’—যিনি সরল, উদাসীন এবং প্রলয়ের দেবতা—তাকে এক শিশুর সাথে তুলনা করা হয়েছে। শিশু যেমন নিজের গড়া খেলনা মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে ফেলে আবার নতুন খেলা শুরু করে, পরম পুরুষও তেমনি এই মহাবিশ্বের সৃষ্টি ও প্রলয়ের খেলায় লিপ্ত। পার্থিব মোহ, বিত্ত ও লজ্জার সমস্ত শৃঙ্খল ভেঙে ফেলে চিরমুক্ত এক সত্তার বন্দনা করা হয়েছে এই কবিতায়।

শিশু-ভোলানাথ – সম্পূর্ণ কবিতা

ওরে মোর শিশু-ভোলানাথ,
তুলি দুই হাত
যেখানে করিস পদপাত
বিষম তাণ্ডবে তোর লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় সব;
আপন বিভব
আপনি করিস নষ্ট হেলাভরে;
প্রলয়ের ঘূর্ণ-চক্র’পরে
চূর্ণ খেলেনার ধূলি উড়ে দিকে দিকে;
আপন সৃষ্টিকে
ধ্বংস হতে ধ্বংসমাঝে মুক্তি দিস অনর্গল,
খেলারে করিস রক্ষা ছিন্ন করি খেলেনা-শৃঙ্খল।
অকিঞ্চন, তোর কাছে কিছুরি তো কোনো মূল্য নাই।
রচিস যা তোর ইচ্ছা তাই
যাহা খুশি তাই দিয়ে,
তার পর ভুলে যাস যাহা ইচ্ছা তাই নিয়ে।
আবরণ তোরে নাহি পারে সম্বরিতে, দিগম্বর,
স্রস্ত ছিন্ন পড়ে ধূলি’পর।
লজ্জাহীন সজ্জাহীন বিত্তহীন আপনা-বিস্তৃত,
অন্তরে ঐশ্বর্য তোর, অন্তরে অমৃত।
দারিদ্র৻ করে না দীন, ধূলি তোরে করে না অশুচি,
নৃত্যের বিক্ষোভে তোর সব গ্লানি নিত্য যায় ঘুচি।
ওরে শিশু-ভোলানাথ, মোরে ভক্ত ব’লে
নে রে তোর তাণ্ডবের দলে;
দে রে চিত্তে মোর
সকল-ভোলার ঐ ঘোর,
খেলেনা-ভাঙার খেলা দে আমারে বলি।
আপন সৃষ্টির বন্ধ আপনি ছিঁড়িয়া যদি চলি
তবে তোর মত্ত নর্তসের চালে
আমার সকল গান ছন্দে ছন্দে মিলে যাবে তালে।

শিশু-ভোলানাথ Romanized Version

Ore mor shishu-bholanath,
Tuli dui hat
Jekhane koris podpat
Bishom tandobe tor londovhondo hoye jay shob;
Apon bibhob
Apni koris noshto helabhore,
Proloyer ghurn-chokro ‘pore
Churn khelanar dhuli ure dike dike;
Apon srishtike
Dhongsho hote dhongshomajhe mukti dis onorgol,
Khelare koris rokkha chhino kori khelana-shringhol.
Okinchon, tor kache kichhuri to kono muljo nai.
Rochis ja tor ichchha tai
Jaha khushi tai diye,
Tar pore bhule jas jaha ichchha tai niye.
Aboron tore nahi pare shomborite, digombor,
Srosto chhino pore dhuli ‘por.
Lojjahin sojjahin bittohin apona-bhistrito,
Ontore oishorjo tor, ontore amrito.
Daridro kore na din, dhuli tore kore na oshuchi,
Nrityer bikkhobe tor shob glani nityo jay ghuchi.
Ore shishu-bholanath, more bhokto bo’le
Ne re tor tandober dole;
De re chitte mor
Sokol-kholar ei ghor,
Khelana-bhangار khela de amare boli.
Apon srishtir bondho apni chhiriya jodi choli
Tobe tor motto nortoner chale
Amar shokol gan chonde chonde mile jabe tale.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • প্রলয় ও সৃষ্টির লীলা:
“ওরে মোর শিশু-ভোলানাথ, / তুলি দুই হাত / যেখানে করিস পদপাত / বিষম তাণ্ডবে তোর লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় সব…”
— শিশু-ভোলানাথের তাণ্ডব নৃত্যে এই পৃথিবীর সমস্ত পুরোনো ও জরাগ্রস্ত সৃষ্টি লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। কিন্তু এই ধ্বংসের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে নতুন সৃষ্টির বীজ ও মুক্তির আনন্দ।
  • খেলনা ভাঙার আনন্দ:
“আপন সৃষ্টিকে / ধ্বংস হতে ধ্বংসমাঝে মুক্তি দিস অনর্গল, / খেলারে করিস রক্ষা ছিন্ন করি খেলেনা-শৃঙ্খল।”
— পার্থিব বস্তু বা সৃষ্টি কোনোটিকেই সে চিরস্থায়ী বলে আঁকড়ে ধরে থাকে না। খেলনা ভেঙে সে যেমন আনন্দ পায়, তেমনি স্রষ্টাও নিজের সৃষ্টিকে ভেঙে আবার নতুন করে গড়ার খেলায় মত্ত থাকেন।
  • দিগম্বর ও বিত্তহীনতার স্বাধীনতা:
“লজ্জাহীন সজ্জাহীন বিত্তহীন আপনা-বিস্তৃত, / অন্তরে ঐশ্বর্য তোর, অন্তরে অমৃত।”
— বাহ্যিক কোনো আবরণ বা বিত্তের মোহ তাকে বাঁধতে পারে না। তাঁর আসল ঐশ্বর্য ও অমৃত লুকিয়ে রয়েছে অন্তরের গভীরে। দারিদ্র্য বা ধূলি তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না।
  • কবির আকুতি: কবিতার শেষাংশে কবি প্রার্থনা করেন যেন তাঁকেও সেই মত্ত তাণ্ডবের দলে নেওয়া হয়। সমস্ত সৃষ্টির বন্ধন ও মোহ ছিন্ন করে সেই নর্তনের তালে নিজের জীবন ও গানকে মিলিয়ে দেওয়ার পরম মুক্তির আকাঙ্ক্ষাই এই কবিতার মূল বাণী।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (শিশু-ভোলানাথ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন