শিশু ভোলানাথ কাব্যগ্রন্থের বুড়ী কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শিশু ভোলানাথ’ কাব্যগ্রন্থের একটি চমৎকার শিশুতোষ ও রূপকথার আমেজ মেশানো কবিতা হলো ‘বুড়ী’। আকাশে চাঁদের কোণায় বসে থাকা সেই কাল্পনিক চরকা-কাটা বুড়ির রূপকথার গল্পকে কেন্দ্র করে কবি এখানে এক অপরূপ কল্পনার জাল বুনেছেন, যেখানে সেই আদ্যিকালের বুড়ি তার সব বয়স ভুলে গিয়ে পৃথিবীতে এক ছোট্ট শিশু হয়ে মায়ের কোলে জন্ম নেয়।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামবুড়ী
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থশিশু ভোলানাথ
প্রকাশের বছর১৯২২ (১৩২৯ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনশিশুতোষ ও রূপকথার কবিতা

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯২২ সালে প্রকাশিত ‘শিশু ভোলানাথ’ কাব্যগ্রন্থে শিশুদের কল্পনার জগৎ, রূপকথার আশ্চর্য মায়া এবং শৈশবের নির্মল আনন্দকে কবি নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন। বাংলার লোককথায় ‘চাঁদের বুড়ি’ একটি অত্যন্ত পরিচিত চরিত্র। কবি এই কবিতায় সেই লোককথার বুড়িকে আপন কল্পনার রঙে সাজিয়েছেন। বাংলার ঘরে ঘরে আদর করে ছোট মেয়েদের “বুড়ি” ডাকার যে চিরায়ত প্রথা রয়েছে, তাকে কবি অত্যন্ত মিষ্টি ও কল্পনাবিলাসী এক প্রেক্ষাপটে দাঁড় করিয়েছেন এই কবিতায়।

সম্পূর্ণ কবিতা:

এক যে ছিল চাঁদের কোণায়
চরকা-কাটা বু’ড়ী
পুরাণে তার বয়স লেখে
সাত-শ হাজার কুড়ি।
সাদা সুতোয় জাল বোনে সে
হয় না বুনন সারা
পণ ছিল তার ধরবে জালে
লক্ষ কোটি তারা।
হেনকালে কখন আঁখি
পড়ল ঘুমে ঢুলে,
স্বপনে তার বয়সখানা
বেবাক গেল ভুলে।
ঘুমের পথে পথ হারিয়ে,
মায়ের কোলে এসে
পূর্ণ চাঁদের হাসিখানি
ছড়িয়ে দিল হেসে।
সন্ধ্যেবেলায় আকাশ চেয়ে
কী পড়ে তার মনে।
চাঁদকে করে ডাকাডাকি,
চাঁদ হাসে আর শোনে।
যে-পথ দিয়ে এসেছিল
স্বপন-সাগর তীরে
দু-হাত তুলে সে-পথ দিয়ে
চায় সে যেতে ফিরে।
হেনকালে মায়ের মুখে
যেমনি আঁখি তোলে
চাঁদে ফেরার পথখানি যে
তক্‌খনি সে ভোলে।
কেউ জানে না কোথায় বাসা,
এল কী পথ বেয়ে,
কেউ জানে না এই মেয়ে সেই
আদ্যিকালের মেয়ে।
বয়সখানার খ্যাতি তবু
রইল জগৎ জুড়ি–
পাড়ার লোকে যে দেখে সেই
ডাকে, “বু’ড়ী বু’ড়ী”।
সব-চেয়ে যে পুরানো সে,
কোন্‌ মন্ত্রের বলে
সব-চেয়ে আজ নতুন হয়ে
নামল ধরাতলে।

সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

Ek je chhilo chander konay
Chorka-kata bu’ri
Purane tar boyosh lekhe
Shat-sho hazar kuri.
Shada shutoy jal bone she
Hoy na bunon shara
Pon chhilo tar dhorbe jale
Lokkho koti tara.
Henokale kokhon ankhi
Porlo ghume dhule,
Swopone tar boyoshkhana
Bebak gelo bhule.
Ghumer pothe poth hariye,
Mayer kole eshe
Purno chander hashikhani
Chhoriye dilo heshe.
Shondhyebelay akash cheye
Ki pore tar mone.
Chandke kore dakadaki,
Chand hashe ar shone.
Je-poth diye eshechhilo
Swopon-shagor tire
Du-hat tule she-poth diye
Chay she jete phire.
Henokale mayer mukhe
Jemoni ankhi tole
Chande pherar pothkhani je
Tokkhoni she bhole.
Keu jane na kothay basha,
Elo ki poth beye,
Keu jane na ei meye shei
Addikaler meye.
Boyoshkhanar khati tobu
Roilo jogot juri–
Parar loke je dekhe shei
Dake, “Bu’ri bu’ri”.
Shob-cheye je purano she,
Kon montrer bole
Shob-cheye aj notun hoye
Namlo dhoratole.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • চাঁদের বুড়ির অবাস্তব সাধনা:
    “সাদা সুতোয় জাল বোনে সে / হয় না বুনন সারা / পণ ছিল তার ধরবে জালে / লক্ষ কোটি তারা।”
    — অনন্তকাল ধরে চাঁদের কোণায় বসে থাকা সেই কাল্পনিক বুড়ির অসীম ধৈর্য এবং লক্ষ কোটি তারা ধরার এক অবাস্তব লক্ষ্যের কথা এখানে বলা হয়েছে।
  • ভুলে যাওয়া বয়স ও নতুন জন্ম:
    “ঘুমের পথে পথ হারিয়ে, / মায়ের কোলে এসে / পূর্ণ চাঁদের হাসিখানি / ছড়িয়ে দিল হেসে।”
    — ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে বুড়ি তার আদি অনন্ত বয়স ভুলে যায় এবং পথ হারিয়ে পৃথিবীর এক মায়ের কোলে ছোট্ট মানবশিশু রূপে নেমে আসে, যার হাসিতে পূর্ণিমার চাঁদের আলো ঝরে পড়ে।
  • শৈশবের ডাকনামের চমৎকার ব্যাখ্যা:
    “সব-চেয়ে যে পুরানো সে, / কোন্‌ মন্ত্রের বলে / সব-চেয়ে আজ নতুন হয়ে / নামল ধরাতলে।”
    — ছোট মেয়েদের আদর করে “বুড়ি” ডাকার প্রথাটি এখানে দারুণভাবে ফুটে উঠেছে। পাড়ার লোক যখন সেই ছোট্ট মেয়েটিকে “বুড়ি” বলে ডাকে, তখন কেউ জানে না যে সে সত্যিই সেই আদ্যিকালের চাঁদের বুড়ি, যে আজ পৃথিবীর বুকে একেবারে নতুন এক শিশুর রূপ নিয়ে জন্ম নিয়েছে।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি ও প্রাসঙ্গিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (শিশু ভোলানাথ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন