বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শিশু ভোলানাথ’ কাব্যগ্রন্থের একটি অতি মনোহর, কৌতুকপূর্ণ ও স্নেহমাখা শিশুতোষ কবিতা হলো ‘দুষ্টু’। মায়ের কাছে প্রতিনিয়ত অন্যের সাথে তুলনায় নেমে আসা এক চঞ্চল শিশুর মিষ্টি অভিমান, আত্মপক্ষ সমর্থন এবং শেষে বাবার প্রতি শিশুসুলভ নিষ্পাপ প্রশ্নের মাধ্যমে অভিযোগ খণ্ডন এ কবিতায় অত্যন্ত প্রাণবন্ত রূপ নিয়েছে।
Table of Contents
শিশু ভোলানাথ কাব্যগ্রন্থের দুষ্টু কবিতা
দুষ্টু কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয়বিবরণ | তথ্য |
| কবিতার নাম | দুষ্টু |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | শিশু ভোলানাথ |
| প্রকাশের বছর | ১৯২২ (১৩২৯ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | শিশুতোষ ও কৌতুকপ্রধান লিরিক কবিতা (Children’s Humorous Lyric) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
দুষ্টু সম্পূর্ণ কবিতা:
তোমার কাছে আমিই দু’ষ্টু
ভালো যে আর সবাই।
মিত্তিরদের কালু নিলু
ভারি ঠাণ্ডা ক-ভাই!
যতীশ ভালো, সতীশ ভালো,
ন্যাড়া নবীন ভালো,
তুমি বল ওরাই কেমন
ঘর করে রয় আলো।
মাখন বাবুর দুটি ছেলে
দু’ষ্টু তো নয় কেউ–
গেটে তাদের কুকুর বাঁধা
কর্তেছে ঘেউ ঘেউ।
পাঁচকড়ি ঘোষ লক্ষ্মী ছেলে,
দত্তপাড়ার গবাই,
তোমার কাছে আমিই দু’ষ্টু
ভালো যে আর সবাই।
তোমার কথা আমি যেন
শুনি নে কক্খনোই,
জামাকাপড় যেন আমার
সাফ থাকে না কোনোই!
খেলা করতে বেলা করি,
বৃষ্টিতে যাই ভিজে,
দু’ষ্টুপনা আরো আছে
অমনি কত কী যে!
বাবা আমার চেয়ে ভালো?
সত্যি বলো তুমি,
তোমার কাছে করেন নি কি
একটুও দু’ষ্টুমি?
যা বল সব শোনেন তিনি,
কিচ্ছু ভোলেন নাকো?
খেলা ছেড়ে আসেন চলে
যেমনি তুমি ডাক?
দুষ্টু সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- পাড়ার ছেলেদের তুলনায় শিশুর অভিমান:“তোমার কাছে আমিই দু’ষ্টু / ভালো যে আর সবাই। / মিত্তিরদের কালু নিলু / ভারি ঠাণ্ডা ক-ভাই!”— পাড়ার একের পর এক শান্ত ও লক্ষ্মী ছেলের নাম ধরে ধরে শিশুটি মায়ের সামনে তুলে ধরে। সবাই যেন নিখুঁত, কেবল সেই একাই মায়ের চোখে দোষী—এই তীব্র অথচ মিষ্টি অনুযোগ শিশুর মনের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।
- দোষের স্বীকারোক্তি ও আত্মপক্ষ সমর্থন:“খেলা করতে বেলা করি, / বৃষ্টিতে যাই ভিজে, / দু’ষ্টুপনা আরো আছে / অমনি কত কী যে!”— নিজের ত্রুটিগুলো যেমন জামাকাপড় নোংরা করা, বৃষ্টিতে ভেজা বা দেরিতে খেলা সেরে ফেরা—সবই সে সরলভাবে মেনে নেয়। তবে তার দাবি, কেবল এইটুকু দুরন্তপনার জন্যই তাকে সবার চেয়ে খারাপ ভাবা অনুচিত।
- বাবার প্রতি শিশুসুলভ পাল্টা প্রশ্ন:“বাবা আমার চেয়ে ভালো? / সত্যি বলো তুমি, / তোমার কাছে করেন নি কি / একটুও দু’ষ্টুমি?”— কবিতাটির মোড় ঘুরে যায় শেষ স্তবকে। সবচেয়ে বড় যুক্তি হিসেবে শিশুটি তার বাবাকে টেনে আনে। বাবা কি সত্যিই মায়ের সব কথা মেনে চলেন, নাকি তিনিও ডাকলে খেলা বা কাজ ফেলে আসেন না—এই অনাবিল কৌতুক শিশুর বুদ্ধিমত্তা ও নিষ্পাপ ভালোবাসাকেই গভীর মমতায় উন্মোচন করে।