শেষ সপ্তক কাব্যগ্রন্থের মনে হয়েছিল আজ সব-কটা দুর্গ্রহ কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিণত বয়সের আধুনিক গদ্যকবিতার সংকলন ‘শেষ সপ্তক’-এর ১৯ সংখ্যক কবিতা হলো ‘মনে হয়েছিল আজ সব-কটা দুর্গ্রহ’। ব্যক্তিস্বার্থের আপাত-সীমাহীন যন্ত্রণা ও অদৃষ্টের নিষ্ঠুর আঘাতকে মহাকালের অনন্ত সৃষ্টির প্রেক্ষাপটে স্থাপন করে কীভাবে এক চিরন্তন শিল্প ও বাণীরূপে অবলোকন করা যায়, তার এক গভীর দার্শনিক ও নান্দনিক উপলব্ধি এ কবিতায় ব্যক্ত হয়েছে।

শেষ সপ্তক কাব্যগ্রন্থের মনে হয়েছিল আজ সব-কটা দুর্গ্রহ কবিতা

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামমনে হয়েছিল আজ সব-কটা দুর্গ্রহ (১৯ সংখ্যক কবিতা)
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থশেষ সপ্তক
প্রকাশের বছর১৯৩৫ (১৩৪২ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনআধুনিক গদ্যকবিতা ও দার্শনিক ভাবপ্রধান লিরিক (Philosophical Prose Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯৩৫ সালে প্রকাশিত ‘শেষ সপ্তক’ কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ মুক্ত গদ্যছন্দে মানুষের অস্তিত্বের গভীর সংকট, দুঃখ এবং মহাকালের রূপান্তরকে প্রত্যক্ষ করেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে যখন পুঞ্জীভূত দুর্যোগ ও অপঘাত মানুষকে চতুর্দিক থেকে অবরুদ্ধ করে ফেলে, তখন মনে হয় এ দুঃখ অন্তহীন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ সেই ক্ষণিক বর্তমানের প্রাচীর ডিঙিয়ে তাকিয়েছেন অতীতের মহাকাব্যিক পটভূমিতে। ইতিহাসের কত রক্তক্ষরণ ও দুর্যোগকালের তীব্র আর্তনাদ সরস্বতীর রুদ্রবীণায় সুর হয়ে এবং মহাকাব্যের বাণীতে রূপ নিয়ে অমরত্ব লাভ করেছে—এই দূরদৃষ্টি কবির তাৎক্ষণিক ব্যক্তিব্যাথাকে এক প্রশান্ত মহাজাগতিক মুক্তি দান করে।

সম্পূর্ণ কবিতা:

মনে হয়েছিল আজ সব-কটা দুর্গ্রহ

চক্র ক’রে বসেছে দুর্মন্ত্রণায়।

অদৃষ্ট জাল ফেলে অন্তরের শেষ তলা থেকে

টেনে টেনে তুলছে নাড়ি-ছেঁড়া যন্ত্রণাকে।

মনে হয়েছিল, অন্তহীন এই দুঃখ;

মনে হয়েছিল, পন্থহীন নৈরাশ্যের বাধায়

শেষ পর্যন্ত এমনি ক’রে

অন্ধকার হাতড়িয়ে বেড়ানো।

ভিতসুদ্ধ বাসা গেছে ডুবে,

ভাগ্যের ভাঙনের অপঘাতে।

এমন সময়ে সদ্যবর্তমানের

প্রাকার ডিঙিয়ে দৃষ্টি গেল

দূর অতীতের দিগন্তলীন

বাগ্‌বাদিনীর বাণীসভায়

যুগান্তরের ভগ্নশেষের ভিত্তিচ্ছায়ায়

ছায়ামূর্তি বাজিয়ে তুলেছে রুদ্রবীণায়

পুরাণখ্যাত কালের কোন্‌ নিষ্ঠুর আখ্যায়িকা।

দুঃসহ দুঃখের স্মরণতন্তু দিয়ে গাঁথা

সেই দারুণ কাহিনী।

কোন্‌ দুর্দাম সর্বনাশের

বজ্রঝঞ্ঝনিত মৃত্যুমাতাল দিনের

হুহুংকার,

যার আতঙ্কের কম্পনে

ঝংকৃত করছে বীণাপাণি

আপন বীণার তীব্রতম তার।

দেখতে পেলেম

কতকালের দুঃখ লজ্জা গ্লানি,

কত যুগের জলৎধারা মর্মনিঃস্রাব

সংহত হয়েছে,

ধরেছে দহনহীন বাণীমূর্তি

অতীতের সৃষ্টিশালায়।

আর তার বাইরে পড়ে আছে

নির্বাপিত বেদনার পর্বতপ্রমাণ ভস্মরাশি,

জ্যোতির্হীন বাক্যহীন অর্থশূন্য।

 

সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

Mone hoyechhilo aj shob-kota durgroho
Chokro ko’re boshechhe durmontronay.
Odrrishto jal phele ontorer shesh tola theke
Tene tene tulchhe nari-chhenra jontronake.
Mone hoyechhilo, ontohin ei dukkho;
Mone hoyechhilo, ponthohin noirassher badhay
Shesh porjonto emni ko’re
Ondhokar hatriye berano.
Bhit-shuddho basha gechhe dube,
Bhagger bhangoner opoghate.
Emon shomoye shoddobortomaner
Prakar dingoie drishti gelo
Dur otiter digontolin
Bagbadinir banishobhay
Jugantorer bhognoshesher bhittichhayay
Chhayamurti bajiye tulechhe rudrobinay
Purankhyato kaler kon nishthur akkhyayika.
Duhsho dukkher smorontontu diye gatha
Shei darun kahini.
Kon durdam shorbonasher
Bojrojhonjhonito mrittyumatal diner
Huhungkar,
Jar atonker kompone
Jhongkrito korchhe binapani
Apon binar tibrotomo tar.
Dekhte pelem
Kotokaler dukkho lojja glani,
Koto juger jolotdhara mormonissrab
Shonghoto hoyechhe,
Dhorechhe dohonhin banimurti
Otiter srishtishalay.
Ar tar baire pore achhe
Nirbapito bedonar porbotproman bhosmorashi,
Jyotirhin bakkyohin orthoshunno.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • ব্যক্তিগত যন্ত্রণার চরম অভিঘাত:
    “অদৃষ্ট জাল ফেলে অন্তরের শেষ তলা থেকে / টেনে টেনে তুলছে নাড়ি-ছেঁড়া যন্ত্রণাকে। / মনে হয়েছিল, অন্তহীন এই দুঃখ;”
    — কবিতার সূচনায় সংকটের এক ভয়াল রূপ ফুটে উঠেছে। ভাগ্য যেন সবদিক থেকে নিষ্ঠুর ফাঁদ পেতে অন্তরের গভীরতম যন্ত্রণাকে টেনে বের করছে এবং বর্তমানকে এক নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের মাঝে নিক্ষেপ করেছে।
  • মহাকালের রুদ্রবীণা ও দুঃখের শিল্পরূপ:
    “এমন সময়ে সদ্যবর্তমানের / প্রাকার ডিঙিয়ে দৃষ্টি গেল / দূর অতীতের দিগন্তলীন / বাগ্‌বাদিনীর বাণীসভায় … ছায়ামূর্তি বাজিয়ে তুলেছে রুদ্রবীণায় / পুরাণখ্যাত কালের কোন্‌ নিষ্ঠুর আখ্যায়িকা।”
    — সংকীর্ণ বর্তমানের দেয়াল পেরিয়ে কবি যখন ইতিহাসের দিকে দৃষ্টিপাত করেন, তখন দেখেন অতীতের বহু ধ্বংস, রক্তপাত ও মৃত্যুর গর্জন সরস্বতীর রুদ্রবীণায় শিল্পিত হয়ে মহাকাব্যের শাশ্বত সুর ধারণ করেছে।
  • দহনহীন বাণীমূর্তি বনাম শূন্য ভস্মরাশি:
    “কত যুগের জলৎধারা মর্মনিঃস্রাব / সংহত হয়েছে, / ধরেছে দহনহীন বাণীমূর্তি / অতীতের সৃষ্টিশালায়। / আর তার বাইরে পড়ে আছে / নির্বাপিত বেদনার পর্বতপ্রমাণ ভস্মরাশি,”
    — জীবনের সমস্ত দুঃখ, গ্লানি ও ক্ষোভ সৃষ্টির স্পর্শ পেয়ে দহনহীন এক চিরন্তন বাণীমূর্তিতে রূপ নেয়। আর যা বাণীতে উত্তীর্ণ হতে পারে না, তা নিভে যাওয়া অঙ্গারের মতো অর্থহীন ছাইয়ের স্তূপ হয়ে বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যায়। সৃষ্টির এই রূপান্তরমূলক সত্যই মানুষের ক্ষণিক দুঃখকে বৃহত্তর অর্থে মুক্তি দেয়।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি ও রচনাকাল-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (শেষ সপ্তক কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন