Table of Contents
শেষ সপ্তক কাব্যগ্রন্থের মনে হয়েছিল আজ সব-কটা দুর্গ্রহ কবিতা
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয়বিবরণ | তথ্য |
| কবিতার নাম | মনে হয়েছিল আজ সব-কটা দুর্গ্রহ (১৯ সংখ্যক কবিতা) |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | শেষ সপ্তক |
| প্রকাশের বছর | ১৯৩৫ (১৩৪২ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | আধুনিক গদ্যকবিতা ও দার্শনিক ভাবপ্রধান লিরিক (Philosophical Prose Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
সম্পূর্ণ কবিতা:
মনে হয়েছিল আজ সব-কটা দুর্গ্রহ
চক্র ক’রে বসেছে দুর্মন্ত্রণায়।
অদৃষ্ট জাল ফেলে অন্তরের শেষ তলা থেকে
টেনে টেনে তুলছে নাড়ি-ছেঁড়া যন্ত্রণাকে।
মনে হয়েছিল, অন্তহীন এই দুঃখ;
মনে হয়েছিল, পন্থহীন নৈরাশ্যের বাধায়
শেষ পর্যন্ত এমনি ক’রে
অন্ধকার হাতড়িয়ে বেড়ানো।
ভিতসুদ্ধ বাসা গেছে ডুবে,
ভাগ্যের ভাঙনের অপঘাতে।
এমন সময়ে সদ্যবর্তমানের
প্রাকার ডিঙিয়ে দৃষ্টি গেল
দূর অতীতের দিগন্তলীন
বাগ্বাদিনীর বাণীসভায়
যুগান্তরের ভগ্নশেষের ভিত্তিচ্ছায়ায়
ছায়ামূর্তি বাজিয়ে তুলেছে রুদ্রবীণায়
পুরাণখ্যাত কালের কোন্ নিষ্ঠুর আখ্যায়িকা।
দুঃসহ দুঃখের স্মরণতন্তু দিয়ে গাঁথা
সেই দারুণ কাহিনী।
কোন্ দুর্দাম সর্বনাশের
বজ্রঝঞ্ঝনিত মৃত্যুমাতাল দিনের
হুহুংকার,
যার আতঙ্কের কম্পনে
ঝংকৃত করছে বীণাপাণি
আপন বীণার তীব্রতম তার।
দেখতে পেলেম
কতকালের দুঃখ লজ্জা গ্লানি,
কত যুগের জলৎধারা মর্মনিঃস্রাব
সংহত হয়েছে,
ধরেছে দহনহীন বাণীমূর্তি
অতীতের সৃষ্টিশালায়।
আর তার বাইরে পড়ে আছে
নির্বাপিত বেদনার পর্বতপ্রমাণ ভস্মরাশি,
জ্যোতির্হীন বাক্যহীন অর্থশূন্য।
সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- ব্যক্তিগত যন্ত্রণার চরম অভিঘাত:“অদৃষ্ট জাল ফেলে অন্তরের শেষ তলা থেকে / টেনে টেনে তুলছে নাড়ি-ছেঁড়া যন্ত্রণাকে। / মনে হয়েছিল, অন্তহীন এই দুঃখ;”— কবিতার সূচনায় সংকটের এক ভয়াল রূপ ফুটে উঠেছে। ভাগ্য যেন সবদিক থেকে নিষ্ঠুর ফাঁদ পেতে অন্তরের গভীরতম যন্ত্রণাকে টেনে বের করছে এবং বর্তমানকে এক নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের মাঝে নিক্ষেপ করেছে।
- মহাকালের রুদ্রবীণা ও দুঃখের শিল্পরূপ:“এমন সময়ে সদ্যবর্তমানের / প্রাকার ডিঙিয়ে দৃষ্টি গেল / দূর অতীতের দিগন্তলীন / বাগ্বাদিনীর বাণীসভায় … ছায়ামূর্তি বাজিয়ে তুলেছে রুদ্রবীণায় / পুরাণখ্যাত কালের কোন্ নিষ্ঠুর আখ্যায়িকা।”— সংকীর্ণ বর্তমানের দেয়াল পেরিয়ে কবি যখন ইতিহাসের দিকে দৃষ্টিপাত করেন, তখন দেখেন অতীতের বহু ধ্বংস, রক্তপাত ও মৃত্যুর গর্জন সরস্বতীর রুদ্রবীণায় শিল্পিত হয়ে মহাকাব্যের শাশ্বত সুর ধারণ করেছে।
- দহনহীন বাণীমূর্তি বনাম শূন্য ভস্মরাশি:“কত যুগের জলৎধারা মর্মনিঃস্রাব / সংহত হয়েছে, / ধরেছে দহনহীন বাণীমূর্তি / অতীতের সৃষ্টিশালায়। / আর তার বাইরে পড়ে আছে / নির্বাপিত বেদনার পর্বতপ্রমাণ ভস্মরাশি,”— জীবনের সমস্ত দুঃখ, গ্লানি ও ক্ষোভ সৃষ্টির স্পর্শ পেয়ে দহনহীন এক চিরন্তন বাণীমূর্তিতে রূপ নেয়। আর যা বাণীতে উত্তীর্ণ হতে পারে না, তা নিভে যাওয়া অঙ্গারের মতো অর্থহীন ছাইয়ের স্তূপ হয়ে বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যায়। সৃষ্টির এই রূপান্তরমূলক সত্যই মানুষের ক্ষণিক দুঃখকে বৃহত্তর অর্থে মুক্তি দেয়।