বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শৈশব সঙ্গীত’ কাব্যগ্রন্থের একটি অত্যন্ত সুকুমার, ভাবপ্রবণ ও রূপকধর্মী কবিতা হলো ‘কামিনী ফুল’। এই কবিতায় কবি কামিনী ফুলের চরম সুকুমারতা, কোমলতা এবং মানুষের স্থূল স্পর্শে তার ঝরে পড়ার বেদনাকে এক অপূর্ব লিরিক্যাল ছন্দে ফুটিয়ে তুলেছেন। সৌন্দর্যের নিখুঁত রূপকে জোর করে মুঠোয় না পুরে তাকে দূর থেকে উপভোগ করার এক গভীর জীবনদর্শন এখানে দারুণভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | কামিনী ফুল |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | শৈশব সঙ্গীত |
| প্রকাশের বছর | ১৮৮৪ |
| কবিতার ধরন | লিরিক ও রূপক কবিতা (Lyrical and Allegorical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
১৮৮৪ সালে প্রকাশিত ‘শৈশব সঙ্গীত’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিজীবনের প্রারম্ভিক রচনার অন্তর্ভুক্ত। এই কাব্যগ্রন্থের কবিতায় রোমান্টিক সুকুমার প্রবৃত্তি, রূপের প্রতি মুগ্ধতা এবং গভীর সূক্ষ্ম অনুভূতির প্রকাশ ঘটেছে। ‘কামিনী ফুল’ কবিতায় কবি কামিনী ফুলের মতো অত্যন্ত সুকোমল ও স্পর্শকাতর ফুলের রূপক ব্যবহার করে মানবজীবনের বা প্রকৃতির এমন কিছু অতি সংবেদনশীল সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তুলেছেন, যা মানুষের একটুখানি স্থূল বা অসাবধানী স্পর্শেই মলিন বা নষ্ট হয়ে যায়।
কামিনী ফুল – সম্পূর্ণ কবিতা
ছি ছি সখা কি করিলে, কোন্ প্রাণে পরশিলে
কামিনীকুসুম ছিল বন আলো করিয়া–
মানুষপরশ-ভরে শিহরিয়া সকাতরে
ওই যে শতধা হয়ে পড়িল গো ঝরিয়া।
জান ত কামিনী সতী, কোমল কুসুম অতি
দূর হ’তে দেখিবারে, ছুঁইবারে নহে সে–
দূর হ’তে মৃদু বায়, গন্ধ তার দিয়ে যায়,
কাছে গেলে মানুষের শ্বাস নাহি সহে সে।
মধুপের পদক্ষেপে পড়িতেছে কেঁপে কেঁপে,
কাতর হতেছে কত প্রভাতের সমیره!
পরশিতে রবিকর শুকায়েছে কলেবর,
শিশিরের ভরটুকু সহিছে না শরীরে।
হেন কোমলতাময় ফুল কি না-ছুঁলে নয়!
হায় রে কেমন বন ছিল আলো করিয়া!
মানুষপরশ-ভরে শিহরিয়া সকাতরে,
ওই যে শতধা হয়ে পড়িল গো ঝরিয়া!
কামিনী ফুল Romanized Version
Chi chi sokha ki korile, kon prane porshile
Kamini-kusum chhilo bon alo koriya–
Manush-porash-bhore shihoriya sokatore
Oi je shotodha hoye porilo go jhoriya.
Jan ta kamini shoti, komol kusum oti
Dur hote dekhibare, chhuybare nahe se–
Dur hote mridu bay, gondho tar diye jay,
Kachhe gele manusher shash nahi sohe se.
Modhuper podkhepe poriteche kepe kepe,
Kator hoteche koto probhater somire!
Porshite robikor shukayeche kolebor,
Shishirer bhortuku sohiche na shorire.
Hen komoltomoy ful ki na-chhuule noy!
Hay re kemon bon chhilo alo koriya!
Manush-porash-bhore shihoriya sokatore,
Oi je shotodha hoye porilo go jhoriya!
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- রূপক ও তাৎপর্য: কামিনী ফুল হলো চরম সুকুমারতা, পবিত্রতা এবং সংবেদনশীল সৌন্দর্যের প্রতীক।
- দূরের সৌন্দর্য ও স্পর্শের বিপদ: ফুলটি এতই কোমল যে তা দূর থেকে দেখলেই সুন্দর, মৃদু বাতাসে তার গন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু মানুষের শ্বাস বা স্থূল স্পর্শ তার অত্যন্ত সুকুমার অস্তিত্ব সহ্য করতে পারে না।
- প্রকৃতির অতি-সংবেদনশীলতা: ভ্রমরের পদক্ষেপে বা ভোরের বাতাসে সে কেঁপে ওঠে; সূর্যের তীব্র আলো বা সামান্য শিশিরের ভারটুকুও তার শরীর সহ্য করতে পারে না।
- “মানুষপরশ-ভরে শিহরিয়া সকাতরে, / ওই যে শতধা হয়ে পড়িল গো ঝরিয়া।”— এই চরণের মাধ্যমে কবি ফুটিয়ে তুলেছেন যে, মানুষের স্থূল ও অপরিনামদর্শী স্পর্শ বা লোভ অনেক সময় সুন্দর ও সুকুমার জিনিসগুলোর বিনাশ ডেকে আনে। সৌন্দর্যকে জোর করে দখল করতে গেলে তা নষ্ট হয়ে যায়, তাকে তার নিজস্ব মুক্ত পরিবেশে বাঁচতে দেওয়াই শ্রেয়।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (শৈশব সঙ্গীত কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।
![শৈশব সঙ্গীত কাব্যগ্রন্থের কামিনী ফুল কবিতা - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 1 কামিনী ফুল kamini phul [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/কামিনী-ফুল-kamini-phul-কবিতা-.gif)