শ্যামলী কাব্যগ্রন্থের চিরযাত্রী কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শ্যামলী’ কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম গভীর দার্শনিক, প্রগতিশীল ও মননশীল রচনা হলো ‘চিরযাত্রী’। ১৯৩৬ সালে প্রকাশিত গদ্যছন্দে রচিত এই কবিতায় কবি মানবজীবনের চিরন্তন গতিশীলতা, সভ্যতার উত্থান-পতন, জড়তা ও স্থবিরতার বিরুদ্ধে মানুষের অফুরান অগ্রযাত্রার এক অনন্য রূপক ফুটিয়ে তুলেছেন। মানুষ কেবল একটি ঘরে বা সীমানায় আবদ্ধ থাকার জন্য জন্মায়নি; তার চিরযাত্রা অনাগতকালের দিকে এবং অজানা দিগন্তের সন্ধানে।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামচিরযাত্রী
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থশ্যামলী
প্রকাশের বছর১৯৩৬ (১৩৪৩ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনদার্শনিক, প্রতীকী ও আধুনিক গদ্যকবিতা (Philosophical, Symbolic and Modern Prose Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

১৯৩৬ সালে প্রকাশিত ‘শ্যামলী’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনের শেষ দশকের একটি অনন্য সৃষ্টি। এই কাব্যগ্রন্থের বেশিরভাগ কবিতাই মুক্ত ছন্দ বা গদ্যছন্দে রচিত, যেখানে কবির চিন্তাধারা আরও বেশি ক্ষুরধার, আধুনিক এবং বিশ্বমানবতার সংকটের প্রতি সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। ‘চিরযাত্রী’ কবিতায় কবি দেখিয়েছেন যে, যারা চিরকাল ঘর-বাড়ি ও স্থাবর সম্পদে আটকে থাকতে চায়, তারা সময়ের প্রবাহে হারিয়ে যায়। কিন্তু যাদের রক্তে ও স্বপ্নে অজানাকে জানার নেশা রয়েছে, তারা সমস্ত বাধা, মৃত্যু এবং ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে যুগের পর যুগ ধরে এগিয়ে চলে।

চিরযাত্রী – সম্পূর্ণ কবিতা

অস্পষ্ট অতীত থেকে বেরিয়ে পড়েছে ওরা দলে দলে,
ওরা সন্ধানী, ওরা সাধক,
বেরিয়ে এসেছে পুরাপৌরাণিক কালের
সিংহদ্বার দিয়ে।
তার তোরণের রেখা
আঁচড় কেটেছে অজানা আখরে,
ভেঙে-পড়া ভাষায়।
যাত্রী ওরা, রণযাত্রী,
ওদের চিরযাত্রা অনাগতকালের দিকে।
যুদ্ধ হয় নি শেষ,
বাজছে নিত্যকালের দুন্দুভি।
বহুশত যুগের পদপতনশব্দে
থর্‌থর্‌ করে ধরিত্রী,
অর্ধেক রাত্রে দুরুদুরু করে বক্ষ,
চিত্ত হয় উদাস,
তুচ্ছ হয় ধনমান,
মৃত্যু হয় প্রিয়।
তেজ ছিল যাদের মজ্জায়,
যারা চলতে বেরিয়েছিল পথে
মৃত্যু পেরিয়ে আজও তারাই চলেছে;
যারা বাস্তু ছিল আঁকড়িয়ে
তারা জিয়ন-মরা, তাদের নিঝুম বস্‌তি
বোবা সমুদ্রের বালুর ডাঙায়।
তাদের জগৎজোড়া প্রেতস্থানে
অশুচি হাওয়ায়
কে তুলবে ঘর,
কে রইবে চোখ উলটিয়ে কপালে,
কে জমাবে জঞ্জাল।
কোন্‌ আদিকালে মানুষ এসে দাঁড়িয়েছে
বিশ্বপথের চৌমাথায়।
পাথেয় ছিল রক্তে, পাথেয় ছিল স্বপ্নে,
পাথেয় ছিল পথেই।
যেই এঁকেছে নক্‌শা,
ঘর বেঁধেছে পাকা গাঁথুনির,
ছাদ তুলেছে মেঘ ঘেঁষে_
পরের দিন থেকে মাটির তলায়
ভিত হয়েছে ঝাঁঝরা।
সে বাঁধ বেঁধেছে পাথরে পাথরে,
তলিয়ে গেছে বন্যার ধাক্কায়।
সারারাত হিসেব করেছে স্থাবর সম্পদের,
রাতের শেষে হিসেবে বেরোল সর্বনাশ।
সে জমা করেছে ভোগের ধন সাত হাট থেকে,
ভোগে লেগেছে আগুন,
আপন তাপে গুমরে গুমরে
গেছে ভোগের জোগান আঙার হয়ে।
তার রীতি, তার নীতি, তার শিকল, তার খাঁচা
চাপা পড়েছে মাটির নীচে।
পরযুগের কবরস্থানে।
কখনো বা ঘুমিয়েছে সে
ঝিমিয়ে-পড়া নেশার আসরে বাতি-নেবা দালানে
আরামের গদি পেতে।
অন্ধকারে ঝোপের থেকে
ঝাঁপিয়ে পড়েছে স্কন্ধকাটা দুঃস্বপ্ন,
পাগ্‌লা জন্তুর মতো
গোঁ গোঁঃ শব্দে ধরেছে তার টুঁটি চেপে,
বুকের পাঁজরগুলোর ঠক ঠক দিয়েছে নাড়া,
গুঙরে উঠে জেগেছে সে মৃত্যুযন্ত্রণায়।
ক্ষোভের মাতুনিতে ভেঙে ফেলেছে মদের পাত্র,
ছিঁড়ে ফেলেছে ফুলের মালা।
বারে বারে রক্তে-পিছল দুর্গমে
ছুটে এসেছে শতচ্ছিদ্র শতাব্দীর বাইরে
পথ-না-চেনা দিক্‌সীমানার অলক্ষ্যে।
তার হৃৎপিণ্ডের রক্তের ধাক্কায় ধাক্কায়
ডমরুতে বেজেছে গুরু গুরু,
“পেরিয়ে চলো, পেরিয়ে চলো।”
ওরে চিরপথিক,
করিস নে নামের মায়া,
রাখিস নে ফলের আশা,
ওরে ঘরছাড়া মানুষের সন্তান।
কালের-রথ-চলা রাস্তায়
বারে বারে কারা তুলেছিল জয়ের নিশান
বারে বারে পড়েছে চুরমার হয়ে
মানুষের কীর্তিনাশা সংসারে।
লড়াইয়ে-জয়-করা রাজত্বের প্রাচীর
সে পাকা করতে গেছে ভুল সীমানায়।
সীমানাভাঙার দল ছুটে আসছে
বহু যুগ থেকে
বেড়া ডিঙিয়ে, পাথর গুঁড়িয়ে,
পার হয়ে পর্বত;
আকাশে বেজে উঠছে নিত্যকালের দুন্দুভি,
“পেরিয়ে চলো,
পেরিয়ে চলো।”

চিরযাত্রী Romanized Version

Oshposhto otit theke beriye poreche ora dole dole,
Ora sondhani, ora sadhok,
Beriyeche purapou-ranik kaler
Singhaddar diye.
Tar toroner rekha
Achor keteche ojana akhare,
Bhanga-pora bhashay.
Jatri ora, ronjatri,
Oder chirojatra onagtokaler dike.
Juddho hoy ni shesh,
Bajje nittokaler dundubhi.
Bohushot juger podpoton-shobde
Tharthor kore dhoritri,
Ordhek ratre durudur kore bokkho,
Chitto hoy udash,
Tuchchho hoy dhonman,
Mrittu hoy priyo.
Tej chhilo jader mojjay,
Jara cholte beriyechhilo pothe
Mrittu periye ajiyo tara choleche;
Jara bastu chhilo ankriye
Tara jiyon-mora, tader nijhum bosh-ti
Boba somudrer balur dangay.
Tader jogotjora pretsthane
Oshuchi haway
Ke tulbe ghor,
Ke roibe chokh ultiye kopale,
Ke jomabe jonjal.
Kon adikale manush ese dariyeche
Bishvopother choumathay.
Pathey chhilo rokte, pathey chhilo shopne,
Pathey chhilo pothei.
Yei enkeche noksha,
Ghor bedheche paka gathunir,
Chhad tuleche megh ghese_
Porer din theke matir tolay
Bhit hoyeche jhanjhara.
Se bandh bedheche pathare pathare,
Toliye geche bonyar dhakkay.
Sararat hiseb koreche sthabor shompoder,
Rater shesh e hisebe berolo shorbonash.
Se joma koreche bhoger dhon sat hat theke,
Bhoge legeche agun,
Apon tape gumre gumre
Geche bhoger jogan angar hoye.
Tar riti, tar niti, tar shikol, tar khacha
Chapa poreche matir niche.
Porojuger koborsthane.
Kokhonoo ba ghumieche se
Jhimiye-pora neshar asore bati-neba dalane
Aramer godi pete.
Ondhakare jhoper theke
Jhapiye poreche skondhakata dushwopno,
Pagla jontur moto
Go go shobde dhoreche tar tuti chepe,
Buker panjor-gulo thok thok diyeche nara,
Gungre uthe jegeche se mrittujontronay.
Khoborer matunite bhenge feleche moder patro,
Chhire feleche fuler mala.
Bare bare rokte-pichhol durgome
Chhute esheche shotochchhidro shatabdhir baire
Poth-na-chena dik-shimanar olokkhe.
Tar hridpinder rokter dhakkay dhakkay
Domrutue bejeche guru guru,
“Periye cholo, periye cholo.”
Ore chiropothik,
Karis ne namer maya,
Rakhis ne foler asha,
Ore ghorchhara manusher shontan.
Kaler-roth-chola rastay
Bare bare kara tulechilo joyer nishan
Bare bare poreche churmar hoye
Manusher kirtinasha shongshare.
Loraiye-joy-kora rajotwer prachir
Se paka korte geche bhul shimanay.
Shimanabhangar dol chhute asche
Bohu jug theke
Bera dingiye, pathor guriye,
Par hoye porbot;
Akashe beje uthche nittokaler dundubhi,
“Periye cholo,
Periye cholo.”

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • চিরযাত্রার চেতনা: মানবজাতি আদিম অতীত থেকে শুরু করে অনাগত ভবিষ্যতের দিকে এক অন্তহীন যাত্রায় রয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডি বা সীমানায় থেমে থাকা মানুষের আসল ধর্ম নয়।
  • স্থাবর সম্পদের মোহ বনাম গতিশীলতা:
“যারা বাস্তু ছিল আঁকড়িয়ে / তারা জিয়ন-মরা, তাদের নিঝুম বস্‌তি / বোবা সমুদ্রের বালুর ডাঙায়।”
— যারা ইট-কাঠের বাড়ি, ঘরকন্না ও স্থাবর সম্পদে অন্ধের মতো আটকে থাকে, কবি তাদের জীবন্মৃত বা স্থবির বলেছেন। অন্যদিকে, যারা সমস্ত মায়া ত্যাগ করে পথের আহ্বানে সাড়া দেয়, তারাই প্রকৃত জীবন্ত।
  • সীমানা ভাঙার ডাক: মানুষের গড়া অহংকারের সাম্রাজ্য, লোভের ইমারত এবং সীমানার প্রাচীর কালের ধাক্কায় বারবার চুরমার হয়ে যায়। নতুন যুগ সবসময় পুরোনো জঞ্জাল ও খাঁচা ভেঙে এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করে।
  • “ওরে চিরপথিক, করিস নে নামের মায়া, রাখিস নে ফলের আশা, ওরে ঘরছাড়া মানুষের সন্তান।”
    — এই চরণের মাধ্যমে কবি মানবাত্মাকে সমস্ত পার্থিব মোহ, নাম-যশ ও ফলাকাঙ্ক্ষা থেকে মুক্ত হয়ে চিরকালের অজানা পথের যাত্রী হওয়ার চিরন্তন আহ্বান জানিয়েছেন।

মন্তব্য করুন