চৈতালী কাব্যগ্রন্থের সভ্যতার প্রতি কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চৈতালী’ কাব্যগ্রন্থের অন্যতম বিখ্যাত ও কালোত্তীর্ণ সৃষ্টি হলো ‘সভ্যতার প্রতি’। এই কবিতায় কবি আধুনিক যান্ত্রিক ও বস্তুতান্ত্রিক সভ্যতার কঠোরতা থেকে মুক্তি চেয়ে প্রাচীন ভারতের তপোবনের শান্ত, স্নিগ্ধ ও আধ্যাত্মিক জীবনের প্রতি গভীর আকুলতা প্রকাশ করেছেন। ইট-পাথরের খাঁচায় বন্দি মানবজীবনকে পুনরায় প্রকৃতির বিশালতায় ফিরিয়ে নেওয়ার এক উদাত্ত আহ্বান রয়েছে এই রচনায়।

 কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামসভ্যতার প্রতি
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থচৈতালী
প্রকাশের বছর১৮৯৬ (১৩০৩ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনসনেট বা চতুর্দশপদী কবিতা (Sonnet)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৮৯৬ সালে প্রকাশিত ‘চৈতালী’ কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতিপ্রেম এবং প্রাচীন ভারতের তপোবন-কেন্দ্রিক ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধার বিষয়টি গভীরভাবে ফুটে উঠেছে। আধুনিক নগরকেন্দ্রিক সভ্যতার কোলাহল, ইট-পাথরের খাঁচা এবং যান্ত্রিকতা কবির মনকে ক্লান্ত করেছিল। তাই তিনি এই কৃত্রিমতা ও রাজভোগ থেকে বেরিয়ে এসে প্রকৃতির কোলে, গ্লানিহীন, স্বাধীন ও প্রশান্ত জীবনে ফিরে যাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছেন।

চৈতালী কাব্যগ্রন্থের সভ্যতার প্রতি কবিতা:

দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর,

লও যত লৌহ লোষ্ট্র কাষ্ঠ ও প্রস্তর

হে নবসভ্যতা! হে নিষ্ঠুর সর্বগ্রাসী,

দাও সেই তপোবন পুণ্যচ্ছায়ারাশি,

গ্লানিহীন দিনগুলি, সেই সন্ধ্যাস্নান,

সেই গোচারণ, সেই শান্ত সামগান,

নীবারধান্যের মুষ্টি, বল্কলবসন,

মগ্ন হয়ে আত্মমাঝে নিত্য আলোচন

মহাতত্ত্বগুলি। পাষাণপিঞ্জরে তব

নাহি চাহি নিরাপদে রাজভোগ নব–

চাই স্বাধীনতা, চাই পক্ষের বিস্তার,

বক্ষে ফিরে পেতে চাই শক্তি আপনার,

পরানে স্পর্শিতে চাই ছিঁড়িয়া বন্ধন

অনন্ত এ জগতের হৃদয়স্পন্দন।

 

চৈতালী কাব্যগ্রন্থের সভ্যতার প্রতি কবিতা Romanized Version:

Dao phire she oronno, low e nogor,
Low joto louho loshtro kashtho o prostor
He nobo-shobhyota! He nishthur shorbograshi,
Dao shei topobon punnochhayarashi,
Glanihin dinguli, shei shonddhasnan,
Shei gocharon, shei shanto shamgan,
Nibarodhhanner mushti, bolkoloboshon,
Mogno hoye attomajhe nitto alochon
Mohatottoguli. Pashanopinjore tobo
Nahi chahi nirapode rajbhog nobo–
Chai shadhinota, chai pokkher bistar,
Bokkhe phire pete chai shokti aponar,
Porane sporshite chai chhiriya bondhon
Ononto e jogoter hridoyospondon.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • কৃত্রিম সভ্যতার প্রতি অনীহা:
    “দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর, / লও যত লৌহ লোষ্ট্র কাষ্ঠ ও প্রস্তর”
    — কবি ইট, পাথর, কাঠ ও লোহায় গড়া এই নগরকেন্দ্রিক কোলাহলময় সভ্যতাকে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর কাছে এই যান্ত্রিক জীবনের চেয়ে প্রকৃতির সহজ-সরল জীবন অনেক বেশি কাম্য।
  • তপোবনের শান্ত জীবনের আকাঙ্ক্ষা:
    “দাও সেই তপোবন পুণ্যচ্ছায়ারাশি, / গ্লানিহীন দিনগুলি, সেই সন্ধ্যাস্নান,”
    — প্রাচীন ভারতের মুনি-ঋষিদের তপোবন, গোচারণের প্রান্তর, শান্ত সামগান এবং আত্মমগ্ন সাধনার জীবনের প্রতি কবির গভীর শ্রদ্ধা ও আকুলতা এখানে প্রকাশিত হয়েছে।
  • আত্মিক স্বাধীনতা ও প্রকৃতির সাথে একাত্মতা:
    “পরানে স্পর্শিতে চাই ছিঁড়িয়া বন্ধন / অনন্ত এ জগতের হৃদয়স্পন্দন।”
    — বস্তুবাদী সভ্যতার নিরাপদ রাজভোগ কবির কাছে পাষাণপিঞ্জর বা খাঁচার মতো। তিনি এই খাঁচা ভেঙে অনন্ত জগতের সাথে নিজের আত্মার স্পন্দনকে মেলাতে চেয়েছেন।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি ও প্রাসঙ্গিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (চৈতালী কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন