বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যৌবনকালের অনন্য সৃষ্টি ‘কড়ি ও কোমল’ কাব্যগ্রন্থের একটি গভীর ভাবগম্ভীর ও আত্মশুদ্ধিমূলক সনেট হলো ‘সিন্ধুতীরে’। সমুদ্রের সীমাহীন বিস্তৃতি, গগনস্পর্শী উদারতা এবং শাশ্বত রূপের সামনে দাঁড়িয়ে মানবহৃদয়ের ক্ষুদ্রতা, স্বার্থপরতা ও দীনতাকে অতিক্রম করে এক মহাজাগতিক ক্ষমা ও সর্বব্যাপী ভালোবাসায় আত্মনিয়োগের আকুল আর্তি এ কবিতায় অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় প্রকাশ পেয়েছে।
Table of Contents
কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থের সিন্ধুতীরে কবিতা
সিন্ধুতীরে কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয়বিবরণ | তথ্য |
| কবিতার নাম | সিন্ধুতীরে |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | কড়ি ও কোমল |
| প্রকাশের বছর | ১৮৮৬ (১২৯৩ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | সনেট বা চতুর্দশপদী দার্শনিক কবিতা (Philosophical Sonnet) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
সিন্ধুতীরে (সম্পূর্ণ কবিতা):
হেথা নাই ক্ষুদ্র কথা, তুচ্ছ কানাকানি,
ধ্বনিত হতেছে চিরদিবসের বাণী।
চিরদিবসের রবি ওঠে, অস্ত যায়,
চিরদিবসের কবি গাহিছে হেথায়।
ধরণীর চারি দিকে সীমাশূন্য গানে
সিন্ধু শত তটিনীরে করিছে আহ্বান–
হেথায় দেখিলে চেয়ে আপনার পানে
দুই চোখে জল আসে, কেঁদে ওঠে প্রাণ।
শত যুগ হেথা বসে মুখপানে চায়,
বিশাল আকাশে পাই হৃদয়ের সাড়া।
তীব্র বক্র ক্ষুদ্র হাসি পায় যদি ছাড়া
রবির কিরণে এসে মরে সে লজ্জায়।
সবারে আনিতে বুকে বুক বেড়ে যায়,
সবারে করিতে ক্ষমা আপনারে ছাড়া।
সিন্ধুতীরে কবিতা Romanized Version:
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- অনন্তের সুর ও পার্থিব তুচ্ছতার অবসান:“হেথা নাই ক্ষুদ্র কথা, তুচ্ছ কানাকানি, / ধ্বনিত হতেছে চিরদিবসের বাণী।”— সমুদ্রের উপকূলে সংসারের কোনো হীন স্বার্থপরতা বা পরনিন্দা নেই; সেখানে কেবল মহাকালের শাশ্বত ও উদার সুর নিরবধি প্রতিধ্বনিত হয়।
- আত্মসমালোচনা ও অনুশোচনা:“হেথায় দেখিলে চেয়ে আপনার পানে / দুই চোখে জল আসে, কেঁদে ওঠে প্রাণ।”— সিন্ধুর অসীম উদারতার বিপরীতে মানুষ যখন নিজের ক্ষুদ্রতা ও স্বার্থান্ধতার দিকে তাকায়, তখন অনুশোচনায় তার চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে এবং চিত্তের দীনতা প্রকট হয়ে ধরা পড়ে।
- উদার ক্ষমা ও সর্বগ্রাহী ভালোবাসা:“সবারে আনিতে বুকে বুক বেড়ে যায়, / সবারে করিতে ক্ষমা আপনারে ছাড়া।”— কবিতার এই অন্তিম দুটি চরণ মানবপ্রেমের এক চরম পরাকাষ্ঠা। সমুদ্রের মতো উদার হয়ে সমগ্র বিশ্বকে বুকে ধারণ করতে গিয়ে মানুষের হৃদয় আপনা থেকেই প্রসারিত হয়। তবে কবি এখানে অপর সবাইকে ক্ষমা করার মহত্ত্ব দেখালেও নিজের অতিতুচ্ছ স্খলনকে ক্ষমা না করার কঠিন আত্মশুদ্ধির আদর্শ তুলে ধরেছেন।
