স্তন ১ কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । কড়ি ও কোমল

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শুরুর দিকের অন্যতম বিখ্যাত ও যুগান্তকারী কাব্যগ্রন্থ ‘কড়ি ও কোমল’-এর একটি অত্যন্ত চমৎকার ও নান্দনিক সৃষ্টি হলো এই ‘স্তন ১’ কবিতাটি। নাম শুনে কবিতাটিকে অতি-আধুনিক বা শরীরী মনে হতে পারে, কিন্তু কবিগুরু এখানে নারীর মাতৃত্ব এবং তাঁর হৃদয়ের পবিত্রতম প্রেমকে এক অলৌকিক ও স্বর্গীয় সৌন্দর্যে রূপায়িত করেছেন।

কবিতার শুরুতে কবি দেখিয়েছেন, নারীর ভেতরের যে চিরন্তন প্রেম ও কোমলতা, তা যেন যৌবনের বসন্ত বাতাসে এক সুন্দর ফুল হয়ে বাইরে ফুটে উঠেছে। মায়ের মনের সেই লুকানো স্নেহ আর ভালোবাসা তরঙ্গের মতো উথলে উঠেছে তাঁর হৃদয়ের তীরে। এই দৈহিক রূপটি আসলে নারীর লজ্জাবতী মনেরই এক বহিঃপ্রকাশ, যা আলোর সামনে এসে থমকে গিয়ে আঁচলের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে চায়। প্রেমের এক অপূর্ব সুর যেন নারীর হৃদয়ের ছন্দে ছন্দে এখানে ধীর লয়ে মেতে উঠেছে।

সবশেষে কবি এই সৌন্দর্যের আসল তাৎপর্য তুলে ধরেছেন। নারীর এই রূপটি কেবল কামনার বস্তু নয়; এটি আসলে স্বয়ং দেবী লক্ষ্মীর কমলাসন বা পবিত্র বসার স্থান। অর্থাৎ, এখান থেকেই জন্ম নেয় পৃথিবীর সমস্ত স্নেহ, মমতা আর নতুন জীবনের স্পন্দন।

রবীন্দ্রনাথ এই কবিতায় আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে এক ধাক্কায় অনেক উঁচুতে নিয়ে গেছেন। তিনি শরীরকে স্থূলভাবে না দেখে, নারীর এই বিশেষ রূপটিকে এক পবিত্র মন্দির হিসেবে দেখিয়েছেন—যা প্রকারান্তরে নারীর আবহমান মাতৃত্ব, পবিত্রতা এবং পৃথিবীর প্রতি তাঁর নিঃস্বার্থ ভালোবাসারই এক পরম প্রতীক।

স্তন ১ কবিতা (Ston 1 Kobita) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । কড়ি ও কোমল

নারীর প্রাণের প্রেম মধুর কোমল,
বিকশিত যৌবনের বসন্ত সমীরে
কুসুমিত হয়ে ওই ফুটেছে বাহিরে,

সৌরভ সুধায় করে পরাণ পাগল।
মরমের কোমলতা তরঙ্গ তরল
উথলি উঠেছে যেন হৃদয়ের তীরে!

কি যেন বাঁশীর ডাকে জগতের প্রেমে
বাহিরিয়া আসিতেছে সলাজ হৃদয়,

সহসা আলােতে এসে গেছে যেন থেমে
সরমে মরিতে চায় অঞ্চল আড়ালে।
প্রেমের সঙ্গীত যেন বিকশিয়া রয়,

উঠিছে পড়িছে ধীরে হৃদয়ের তালে!
হেরগাে কমলাসন জননী লক্ষ্মীর―
হের নারী-হৃদয়ের পবিত্র মন্দির।

মন্তব্য করুন