বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন সায়াহ্নে রচিত ‘আরোগ্য’ (১৯৪১) কাব্যগ্রন্থের অন্যতম একটি শ্রেষ্ঠ শান্ত স্নিগ্ধ, গ্রামবাংলার নিসর্গচিত্রনির্ভর ও অন্তিম জীবনদর্শনভিত্তিক সৃষ্টি হলো ‘ঘণ্টা বাজে দূরে’। এই কবিতায় শহরের কোলাহল ও আত্মঘোষণার মুখরতা থেকে দূরে, গ্রামীণ জীবনের সাধারণ দৃশ্যপট—মেঠো পথ, নদীর ঘাট, হাটের পসরা, জেলের নৌকা এবং বহু দূরের সেই স্মৃতি ও বিচ্ছেদবেদনার এক অপূর্ব রূপ অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | ঘণ্টা বাজে দূরে |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | আরোগ্য |
| প্রকাশের বছর | ১৯৪১ (১৩৪৮ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | প্রকৃতি-ভিত্তিক ও আত্মিক উপলব্ধিযুক্ত লিরিক কবিতা (Nature & Reflective Lyric) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
১৯৪১ সালে প্রকাশিত ‘আরোগ্য’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনের একদম শেষ পর্বের একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সৃষ্টি। অসুস্থতা ও বার্ধক্যের প্রাঙ্গণে বসে কবি প্রকৃতির নিভৃত সান্নিধ্য ও গ্রামীণ জীবনের সহজ রূপকে নতুন দৃষ্টিতে উপলব্ধি করেছেন। ‘ঘণ্টা বাজে দূরে’ কবিতায় কবি শহরের কৃত্রিমতা ও অভ্রভেদী মুখরতা থেকে দূরে গ্রামীণ বাংলার এক ছবি এঁকেছেন—যেখানে অশথতলা, খেয়ার অপেক্ষা, গুড়ের কলস, পাটের বস্তার ওজন, বলদ ও মহিষের সাঁতার কেটে নদী পার হওয়া, গঙ্গার ঘাটে নৌকা বাঁধা এবং দূরে রেলগাড়ির ধোঁয়া ও ধ্বনি এক শান্ত আবহ তৈরি করে। স্মৃতির রোমন্থনে ভেসে ওঠে বহুদিন আগের গঙ্গাতীরের নিশীথ রাতের সেই গানের ধ্বনি। জীবনের অন্তিম প্রান্তে এসে চেতনার প্রত্যন্ত প্রদেশে জেগে ওঠা এই উপেক্ষিত ও সাধারণ ছবিগুলোই যেন কবির মনে জীবনের সর্বশেষ বিচ্ছেদবেদনা ও সুদূরের ঘণ্টা বাজিয়ে দেয়।
ঘণ্টা বাজে দূরে কবিতা (সম্পূর্ণ)
ঘন্টা বাজে দূরে।
শহরের অভ্রভেদী আত্মঘোষণার
মুখরতা মন থেকে লুপ্ত হয়ে গেল,
আতপ্ত মাঘের রৌদ্রে অকারণে ছবি এল চোখে
জীবনযাত্রার প্রান্তে ছিল যাহা অনতিগোচর।
গ্রামগুলি গেঁথে গেঁথে মেঠো পথ গেছে দূর-পানে
নদীর পাড়ির ‘পর দিয়ে।
প্রাচীন অশথতলা,
খেয়ার আশায় লোক ব’সে
পাশে রাখি হাটের পসরা।
গঞ্জের টিনের চালাঘরে
গুড়ের কলস সারি সারি,
চেটে যায় ঘ্রাণলুব্ধ পাড়ার কুকুর,
ভিড় করে মাছি।
রাস্তায় উপুড়মুখো গাড়ি
পাটের বোঝাই ভরা,
একে একে বস্তা টেনে উচ্চস্বরে চলেছে ওজন
আড়তের আঙিনায়।
বাঁধা-খোলা বলদেরা
রাস্তার সবুজ প্রান্তে ঘাস খেয়ে ফেরে,
লেজের চামর হানে পিঠে।
সর্ষে আছে স্তূপাকার
গোলায় তোলার অপেক্ষায়।
জেলেনৌকো এল ঘাটে,
ঝুড়ি কাঁখে জুটেছে মেছুনি;
মাথার উপরে ওড়ে চিল।
মহাজনী নৌকোগুলো ঢালুতটে বাঁধা পাশাপাশি।
মাল্লা বুনিতেছে জাল রৌদ্রে বসি চালের উপরে।
আঁকড়ি মোষের গলা সাঁতারিয়া চাষী ভেসে চলে
ওপারে ধানের খেতে।
অদূরে বনের ঊর্ধ্বে মন্দিরের চূড়া
ঝলিছে প্রভাত-রৌদ্রালোকে।
মাঠের অদৃশ্য পারে চলে রেলগাড়ি
ক্ষীণ হতে ক্ষীণতর
ধ্বনিরেখা টেনে দিয়ে বাতাসের বুকে,
পশ্চাতে ধোঁয়ায় মেলি
দূরত্বজয়ের দীর্ঘ বিজয়পতাকা।
মনে এল, কিছুই সে নয়, সেই বহুদিন আগে,
দু’পহর রাতি,
নৌকা বাঁধা গঙ্গার কিনারে।
জ্যোৎস্নায় চিক্কণ জল,
ঘনীভূত ছায়ামূর্তি নিষ্কম্প অরণ্যতীরে-তীরে,
ক্কচিৎ বনের ফাঁকে দেখা যায় প্রদীপের শিখা।
সহসা উঠিনু জেগে।
শব্দশূন্য নিশীথ-আকাশে
উঠিছে গানের ধ্বনি তরুণ কন্ঠের,
ছুটিছে ভাঁটির স্রোতে তন্বী নৌকা তরতর বেগে।
মুহূর্তে অদৃশ্য হয়ে গেল;
দুই পারে স্তব্ধ বনে জাগিয়া রহিল শিহরণ;
চাঁদের-মুকুট-পরা অচঞ্চল রাত্রির প্রতিমা
রহিল নির্বাক্ হয়ে পরাভূত ঘুমের আসনে।
পশ্চিমের গঙ্গাতীর, শহরের শেষপ্রান্তে বাসা,
দূর প্রসারিত চর
শূন্য আকাশের নীচে শূন্যতার ভাষ্য করে যেন।
হেথা হোথা চরে গোরু শস্যশেষ বাজরার খেতে;
তর্মুজের লতা হতে
ছাগল খেদায়ে রাখে কাঠি হাতে কৃষাণ-বালক।
কোথাও বা একা পল্লীনারী
শাকের সন্ধানে ফেরে ঝুড়ি নিয়ে কাঁখে।
কভু বহু দূরে চলে নদীর রেখার পাশে পাশে
নতপৃষ্ঠ ক্লিষ্টগতি গুণটানা মাল্লা একসারি।
জলে স্থলে সজীবের আর চিহ্ন নাই সারাবেলা।
গোলকচাঁপার গাছ অনাদৃত কাছের বাগানে;
তলায়-আসন-গাঁথা বৃদ্ধ মহানিম,
নিবিড় গম্ভীর তার আভিজাত্যচ্ছায়া।
রাত্রে সেথা বকের আশ্রয়।
ইঁদারায় টানা জল
নালা বেয়ে সারাদিন কুলুকুলু চলে
ভুট্টার ফসলে দিতে প্রাণ।
ভজিয়া জাঁতায় ভাঙে গম
পিতল-কাঁকন-পরা হাতে।
মধ্যাহ্ন আবিষ্ট করে একটানা সুর।
পথে-চলা এই দেখাশোনা
ছিল যাহা ক্ষণচর
চেতনার প্রত্যন্ত প্রদেশে,
চিত্তে আজ তাই জেগে ওঠে;
এই-সব উপেক্ষিত ছবি
জীবনের সর্বশেষ বিচ্ছেদবেদনা
দূরের ঘণ্টার রবে এনে দেয় মনে।
ঘণ্টা বাজে দূরে কবিতার Romanized Version:
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- প্রকৃতির শান্ত রূপ ও স্মৃতির রোমন্থন: শহরের কোলাহল থেকে দূরে গ্রামীণ জীবনের সাধারণ কর্মব্যস্ততা এবং বহু দূরের অতীত স্মৃতির এক অপূর্ব নিসর্গচিত্র এই কবিতায় ফুটে উঠেছে।
- অন্তিম জীবনদর্শন ও বিচ্ছেদবেদনা: জীবনের অন্তিম প্রান্তে এসে চারপাশের এই উপেক্ষিত ও সাধারণ ছবিগুলো কবির মনে সুদূর অতীতের স্মৃতি এবং জীবনের শেষ বিচ্ছেদবেদনার সুর বেজে তোলে।
উৎস:
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (আরোগ্য কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

![আমার মাঝারে যে আছে aamaar maajhaare je aachhe [ কবিতা ] – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমার মাঝারে যে আছে aamaar maajhaare je aachhe [ কবিতা ] - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/আমার-মাঝারে-যে-আছে-aamaar-maajhaare-je-aachhe-কবিতা--1024x536.gif)


![আরোগ্য কাব্যগ্রন্থের 'ঘণ্টা বাজে দূরে' কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 1 ঘণ্টা বাজে দূরে ghonta baje dure [ কবিতা ] - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/06/ঘণ্টা-বাজে-দূরে-ghonta-baje-dure-কবিতা--1024x536.gif)


![আরোগ্য কাব্যগ্রন্থের 'অলস সময় ধারা বেয়ে' কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 3 কবিতা - অলস সময় ধারা বেয়ে - কাব্যগ্রন্থ আরোগ্য [ ১৯৪১ ] - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2024/12/কবিতা-অলস-সময়-ধারা-বেয়ে-কাব্যগ্রন্থ-আরোগ্য-১৯৪১-রবীন্দ্রনাথ-ঠাকুর-1024x536.png)
![না জানি কারে দেখিয়াছি naa jaani kaare dekhiyaachhi [ কবিতা ] – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর না জানি কারে দেখিয়াছি naa jaani kaare dekhiyaachhi [ কবিতা ] - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/না-জানি-কারে-দেখিয়াছি-naa-jaani-kaare-dekhiyaachhi-কবিতা--1024x576.gif)

![কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থের বিরহ কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিরহ biraho [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/বিরহ-biraho-কবিতা--1024x536.gif)
