বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আরোগ্য’ (১৯৪১) কাব্যগ্রন্থের অন্যতম একটি গভীর ঐতিহাসিক, জীবনবাদী ও দার্শনিক সৃষ্টি হলো ‘অলস সময় ধারা বেয়ে’। এই কবিতায় সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন, ইতিহাসের খণ্ডচিত্র এবং সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের চিরন্তন কর্মমুখরতা ও অমরত্বের এক অসাধারণ রূপ অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | অলস সময় ধারা বেয়ে |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | আরোগ্য |
| প্রকাশের বছর | ১৯৪১ (১৩৪৮ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | ঐতিহাসিক ও মানবতাবাদী লিরিক কবিতা (Historical / Humanistic Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
১৯৪১ সালে প্রকাশিত ‘আরোগ্য’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনের শেষপর্যায়ের এক অনন্য সৃষ্টি, যেখানে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও পৃথিবীর জীবনপ্রবাহ ও মানুষের শ্রমের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ পেয়েছে। ‘অলস সময় ধারা বেয়ে’ কবিতায় কবি মহাকালের পটভূমিতে ইতিহাসের উত্থান-পতনকে অত্যন্ত নিপুণভাবে দেখেছেন। অতীতে এই মহাশূন্যের পথ বেয়ে কত সাম্রাজ্যলোভী পাঠান ও মোগল এসেছে, তাদের বিজয়রথের চাকা ধূলিজাল উড়িয়েছে, কিন্তু আজ তাদের কোনো চিহ্ন নেই। একইভাবে প্রবল ইংরেজরাও একদিন তাদের লোহাবাঁধা পথে তেজ বিকীর্ণ করেছে, কিন্তু কালপ্রবাহে তাদের সাম্রাজ্যের দেশবেড়াজালও একদিন ভেসে যাবে। অন্যদিকে, রাজছত্র ভেঙে পড়লেও, রণডঙ্কার শব্দ থেমে গেলেও এবং জয়স্তম্ভের অর্থ ভুলে গেলেও—মাঠের সাধারণ মানুষ, কৃষক, এবং খেটে খাওয়া জনতা চিরকাল ধরে খেয়াঘাট থেকে শুরু করে অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গ ও পঞ্জাব-গুজরাটে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে। সাম্রাজ্যের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়েও মানুষের এই নিত্যদিনের কর্ম ও জীবনের মহামন্ত্রধ্বনিই শাশ্বত সত্য—এই গভীর জীবনদর্শনই কবিতার মূল প্রাণ।
![আরোগ্য কাব্যগ্রন্থের 'অলস সময় ধারা বেয়ে' কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 2 কবিতা - অলস সময় ধারা বেয়ে - কাব্যগ্রন্থ আরোগ্য [ ১৯৪১ ] - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2024/12/কবিতা-অলস-সময়-ধারা-বেয়ে-কাব্যগ্রন্থ-আরোগ্য-১৯৪১-রবীন্দ্রনাথ-ঠাকুর-1024x536.png)
অলস সময় ধারা বেয়ে কবিতা (সম্পূর্ণ)
অলস সময়-ধারা বেয়ে
মন চলে শূন্য-পানে চেয়ে।
সে মহাশূন্যের পথে ছায়া-আঁকা ছবি পড়ে চোখে।
কত কাল দলে দলে গেছে কত লোকে
সুদীর্ঘ অতীতে
জয়োদ্ধত প্রবল গতিতে।
এসেছে সাম্রাজ্যলোভী পাঠানের দল,
এসেছে মোগল;
বিজয়রথের চাকা
উড়ায়েছে ধূলিজাল,উড়িয়াছে বিজয়পতাকা।
শূন্যপথে চাই,
আজ তার কোনো চিহ্ন নাই।
নির্মল সে নীলিমায় প্রভাতে ও সন্ধ্যায় রাঙালো
যুগে যুগে সূর্যোদয় সূর্যাস্তের আলো।
আরবার সেই শূন্যতলে
আসিয়াছে দলে দলে
লৌহবাঁধা পথে
অনলনিশ্বাসী রথে
প্রবল ইংরেজ,
বিকীর্ণ করেছে তার তেজ।
জানি তারো পথ দিয়ে বয়ে যাবে কাল,
কোথায় ভাসায়ে দেবে সাম্রাজ্যের দেশবেড়া জাল;
জানি তার পণ্যবাহী সেনা
জ্যোতিষ্কলোকের পথে রেখামাত্র চিহ্ন রাখিবে না।
মাটির পৃথিবী-পানে আঁখি মেলি যবে
দেখি সেথা কলকলরবে
বিপুল জনতা চলে
নানা পথে নানা দলে দলে
যুগ যুগান্তর হতে মানুষের নিত্য প্রয়োজনে
জীবনে মরণে।
ওরা চিরকাল
টানে দাঁড়, ধরে থাকে হাল,
ওরা মাঠে মাঠে
বীজ বোনে, পাকা ধান কাটে।
ওরা কাজ করে
নগরে প্রান্তরে।
রাজছত্র ভেঙে পড়ে,রণডঙ্কা শব্দ নাহি তোলে,
জয়স্তম্ভ মূঢ়সম অর্থ তার ভোলে,
রক্তমাখা অস্ত্র হাতে যত রক্ত-আঁখি
শিশুপাঠ্য কাহিনীতে থাকে মুখ ঢাকি।
ওরা কাজ করে
দেশে দেশান্তরে,
অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গের সমুদ্র-নদীর ঘাটে ঘাটে,
পঞ্জাবে বোম্বাই-গুজরাটে।
গুরুগুরু গর্জন গুন্গুন্ স্বর
দিনরাত্রে গাঁথা পড়ি দিনযাত্রা করিছে মুখর।
দুঃখ সুখ দিবসরজনী
মন্দ্রিত করিয়া তোলে জীবনের মহামন্ত্রধ্বনি।
শত শত সাম্রাজ্যের ভগ্নশেষ-‘পরে
ওরা কাজ করে।

অলস সময় ধারা বেয়ে কবিতার Romanized Version:
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- সাম্রাজ্যের নশ্বরতা: কালপ্রবাহে রাজা-বাদশাহ, পাঠান-মোগল ও ইংরেজদের পরাক্রমশালী সাম্রাজ্য এবং বিজয়রথ একদিন ধূলিসাৎ হয়ে যায়, ইতিহাসের পাতায় তাদের চিহ্নমাত্র থাকে না।
- শ্রমজীবী মানুষের অমরত্ব: রাজছত্র ভেঙে পড়লেও সাধারণ মানুষ, কৃষক ও শ্রমিকরা মাঠে-ঘাটে নিরলসভাবে কাজ করে যায়—তাদের এই শাশ্বত পরিশ্রম ও জীবনযাত্রাই পৃথিবীর আসল ইতিহাস ও প্রাণশক্তি।
উৎস:
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (আরোগ্য কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

![কণিকা কাব্যগ্রন্থের হার-জিত কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হার-জিত harjit [ কবিতা ]- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/হার-জিত-harjit-কবিতা--1024x536.gif)


![আরোগ্য কাব্যগ্রন্থের 'ঘণ্টা বাজে দূরে' কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 4 ঘণ্টা বাজে দূরে ghonta baje dure [ কবিতা ] - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/06/ঘণ্টা-বাজে-দূরে-ghonta-baje-dure-কবিতা--1024x536.gif)


![কঙ্কাল ছোটগল্প,গল্পগুচ্ছ [ konkal ] – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কঙ্কাল ছোটগল্প,গল্পগুচ্ছ [ konkal ] - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/কঙ্কাল-ছোটগল্প-1024x536.gif)
![মহুয়া কাব্যগ্রন্থের মিলন কবিতা । Milan Kobita মিলন milan [ কবিতা ] - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/মিলন-milan-কবিতা--1024x536.gif)