পরিশেষ কাব্যগ্রন্থের ভীরু কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পরিশেষ’ কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম মরমী, বিরহকাতর ও আত্মস্মরণমূলক প্রেমের কবিতা হলো ‘ভীরু’। এই কবিতায় প্রেমের এক সুক্ষ্ম দ্বিধা, না-বলা কথা এবং সংকোচের কারণে হাতছাড়া হয়ে যাওয়া সেই মুহূর্তের বেদনা অত্যন্ত শৈল্পিক ও দার্শনিক রূপ পেয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামভীরু
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থপরিশেষ
কবিতার ধরনআত্মস্মরণমূলক প্রেমের কবিতা (Reflective Romantic Lyric)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পরিশেষ’ কাব্যগ্রন্থটি তাঁর কাব্যজীবনের একটি পরিণত পর্যায়ের সৃষ্টি। এসময়ের কবিতায় জীবনের লাভ-ক্ষতি, অতীত হাতড়ে বেড়ানো এবং অভিজ্ঞতার আলোকে বর্তমানকে দেখার এক ধীরস্থির সুর বজায় থাকে। ‘ভীরু’ কবিতায় কবি অতীতে করা এক ভালোবাসার স্মৃতিচারণ করছেন, যেখানে আত্মবিশ্বাসের অভাবে বা অতিরিক্ত সংকোচের কারণে সেই প্রেম ধরা না দিয়েই অদৃশ্যে মিলিয়ে গেছে। একদিকের দ্বিধা আর অন্যদিকের অভিমান—এই দুইয়ের টানাপোড়েনেই কবিতাটি আবর্তিত।

 

পরিশেষ কাব্যগ্রন্থের ভীরু কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

তাকিয়ে দেখি পিছে

           সেদিন ভালোবেসেছিলেম,

                     দিন না যেতেই হয়ে গেল মিছে।

                 বলার কথা পাই নি আমি খুঁজে,

                 আপনা হতে নেয় নি কেন বুঝে,

                 দেবার মতন এনেছিলেম কিছু,

                      ডালির থেকে পড়ে গেল নিচে।

                 ভরসা ছিল না যে,

           তাই তো ভেবে দেখি নি হায়

                    কী ছিল তার হাসির দ্বিধা-মাঝে।

 

                 গোপন বীণা সুরেই ছিল বাঁধা,

                 ঝংকার তায় দিয়েছিল আধা,

                 সংশয়ে আজ তলিয়ে গেল কোথা,

                     পাব কি তায় দুঃখসাগর সিঁচে।

           হায় রে গরবিনী,

      বারেক তব করুণ চাহনিতে

                 ভী’রুতা মোর লও নি কেন জিনি।

           যে-মণিটি ছিল বুকের হারে

           ফেলে দিলে কোন্‌ খেদে হায় তারে,

           ব্যর্থ রাতের অশ্রুফোঁটার মালা

                আজ তোমার ওই বক্ষে ঝলকিছে।

Amar Rabindranath Logo

ভীরু Romanized Version

Takiye dekhi pichhe
Sedin bhalobeshechhilem,
Din na jetei hoye gelo miche.
Bolar kotha pai ni ami khuze,
Apona hote ney ni keno buzhe,
Debar moton enechi-lem kichhu,
Dalir theke pore gelo niche.
Bhorsha chhilo na je,
Tai to bhebhe dekhi ni hay
Ki chhilo tar hashir didha-majhe.

                  Gopon bina shurei chhilo badha,

Jhongkar tay diyechhilo adha,

Shongshoye aj toliye gelo kotha,

Pabo ki tay dukkhoshagor sinche.

Hay re gorobini,

Bareko tobo koruno chahonite

Bhiruta mor lo-o ni keno zhini.

Je-moniti chhilo buker hare

Fele dile kon khede hay tare,

Byartho rater oshru-fotar mala

Aj tomar oi bokkhe jholkiche.

 

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • সংকোচ ও হারানো সুযোগ:
“বলার কথা পাই নি আমি খুঁজে, / আপনা হতে নেয় নি কেন বুঝে…”
— সম্পর্কের গভীরে না-বলা কথাগুলো যে সময়ে প্রকাশ করা প্রয়োজন ছিল, ভীরুতা ও সংকোচের কারণে তা সম্ভব হয়নি। এই না-বলা ভালোবাসার যন্ত্রণা নিয়েই কবি অতীত হাতড়ে বেড়াচ্ছেন।
  • সংশয়ের বিষাদ:
“সংশয়ে আজ তলিয়ে গেল কোথা, / পাব কি তায় দুঃখসাগর সিঁচে।”
— মনের মধ্যে যে গোপন সংগীত বা ভালোবাসার সুর ছিল, তা সংশয়ের কারণে হারিয়ে গেছে। সেই হারানো মণি বা প্রেম এখন দুঃখসাগরের তলদেশে তলিয়ে গেছে, যা আর ফিরে পাওয়ার আশা নেই।
  • অশ্রুর মালা:
“ব্যর্থ রাতের অশ্রুফোঁটার মালা / আজ তোমার ওই বক্ষে ঝলকিছে।”
— শেষাংশে কবি বিরহের যে রূপটি ফুটিয়েছেন, তা অত্যন্ত মর্মস্পর্শী। তাদের ভালোবাসার ব্যর্থতা বা বিরহের চিহ্নটিই আজ করুণ এক অলঙ্কার হয়ে ওই রমণীর বক্ষে ঝলমল করছে।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (পরিশেষ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন