রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর শেষ জীবনের কাব্যচিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকলন হলো পরিশেষ। এই কাব্যগ্রন্থে কবি স্মৃতি, নিঃসঙ্গতা, জীবনপথের সমাপ্তি ও চিরন্তন শান্তির দিকে ফিরে তাকিয়েছেন গভীর আত্মসমালোচনার দৃষ্টিতে। পরিশেষ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত “সাথী” কবিতাটি এক অনুপম স্মৃতিকবিতা—যেখানে মানুষের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রকৃতি কীভাবে নীরব সঙ্গী হয়ে থেকেছে, তারই এক দীর্ঘ, সংবেদনশীল আত্মকথন উঠে এসেছে।
Table of Contents
সাথী কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তখন বয়স সাত।
মুখচোরা ছেলে,
একা একা আপনারি সঙ্গে হত কথা।
মেঝে বসে
ঘরের গরাদেখানা ধরে
বাইরের দিকে চেয়ে চেয়ে
বয়ে যেত বেলা।
দূরে থেকে মাঝে-মাঝে ঢঙ ঢঙ করে
বাজত ঘণ্টার ধ্বনি,
শোনা যেত রাস্তা থেকে সইসের হাঁক।
হাঁসগুলো কলরবে ছুটে এসে নামত পুকুরে।
ও পাড়ার তেলকলে বাঁশি ডাক দিত।
গলির মোড়ের কাছে দত্তদের বাড়ি,
কাকাতুয়া মাঝে-মাঝে উঠত চীৎকার করে ডেকে।
একটা বাতাবিলেবু, একটা অশথ,
একটা কয়েতবেল, একজোড়া নারকেলগাছ,
তারাই আমার ছিল সাথী।
আকাশে তাদের ছুটি অহরহ,
মনে-মনে সে ছুটি আমার।
আপনারি ছায়া নিয়ে
আপনার সঙ্গে যে খেলাতে
তাদের কাটত দিন
সে আমারি খেলা।
তারা চিরশিশু
আমার সমবয়সী।
আষাঢ়ে বৃষ্টির ছাঁটে, বাদল-হাওয়ায়,
দীর্ঘ দিন অকারণে
তারা যা করেছে কলরব,
আমার বালকভাষা
হো হা শব্দ করে
করেছিল তারি অনুবাদ।
তার পরে একদিন যখন আমার
বয়স পঁচিশ হবে,
বিরহের ছায়াম্লান বৈকালেতে
ওই জানালায়
বিজনে কেটেছে বেলা।
অশথের কম্পমান পাতায় পাতায়
যৌবনের চঞ্চল প্রত্যাশা
পেয়েছে আপন সাড়া।
সকরুণ মূলতানে গুন্ গুন্ গেয়েছি যে গান
রৌদ্রে-ঝিলিমিলি সেই নারকেলডালে
কেঁপেছিল তারি সুর।
বাতাবিফুলের গন্ধ ঘুমভাঙা সাথীহারা রাতে
এনেছে আমার প্রাণে
দূর শয্যাতল থেকে
সিক্ত আঁখি আর কার উৎকণ্ঠিত বেদনার বাণী।
সেদিন সে গাছগুলি
বিচ্ছেদে মিলনে ছিল যৌবনের বয়স্য আমার।
তার পরে অনেক বৎসর গেল
আরবার একা আমি।
সেদিনের সঙ্গী যারা
কখন চিরদিনের অন্তরালে তারা গেছে সরে।
আবার আরেকবার জানলাতে
বসে আছি আকাশে তাকিয়ে।
আজ দেখি সে অশ্বত্থ, সেই নারকেল
সনাতন তপস্বীর মতো।
আদিম প্রাণের
যে বাণী প্রাচীনতম
তাই উচ্চারিত রাত্রিদিন
উচ্ছ্বসিত পল্লবে পল্লবে।
সকল পথের আরম্ভেতে
সকল পথের শেষে
পুরাতন যে নিঃশব্দ মহাশান্তি স্তব্ধ হয়ে আছে,
নিরাসক্ত নির্বিচল সেই শান্তি-সাধনার
মন্ত্র ওরা প্রতিক্ষণে দিয়েছে আমার কানে-কানে।

শৈশবের নিঃসঙ্গতা ও প্রকৃতির সান্নিধ্য
কবিতার সূচনা হয় সাত বছরের এক মুখচোরা শিশুকে দিয়ে—যে একা একা নিজের সঙ্গে কথা বলে, জানালার গরাদ ধরে বাইরের পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে থাকে। ঘরের ভেতরের নীরবতা ও বাইরের পরিচিত শব্দ—ঘণ্টাধ্বনি, সইসের হাঁক, হাঁসের কলরব—এই সব মিলিয়ে গড়ে ওঠে শিশুমনের এক নিজস্ব জগৎ।
এই শৈশবে মানুষের সঙ্গী নয়, বরং গাছই হয়ে ওঠে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু—একটি বাতাবিলেবু, একটি অশ্বত্থ, একটি কয়েতবেল আর নারকেলগাছ। তারা ছিল কবির “সাথী”—চিরশিশু, সমবয়সী, নিরবচ্ছিন্ন।
যৌবনে প্রকৃতির সঙ্গে অনুভবের মিলন
সময় এগোয়। বয়স পঁচিশে পৌঁছালে সেই জানালার ধারে বসে থাকা তরুণের জীবনে আসে বিরহ, প্রত্যাশা ও প্রেমের কম্পন। অশ্বত্থের পাতার কাঁপনে প্রতিধ্বনিত হয় যৌবনের চঞ্চল আকাঙ্ক্ষা, নারকেলডালে কেঁপে ওঠে গাওয়া গানের সুর। বাতাবিফুলের গন্ধ রাতের নিঃসঙ্গতায় জাগিয়ে তোলে দূরের কোনো বেদনার স্মৃতি।
এই পর্যায়ে গাছগুলো আর শুধু শৈশবের খেলাসঙ্গী নয়—তারা হয়ে ওঠে যৌবনের বয়স্য, বিচ্ছেদ ও মিলনের নীরব সাক্ষী।
বার্ধক্যে প্রত্যাবর্তন ও চিরন্তন শান্তি
এরপর আসে জীবনের দীর্ঘ একাকিত্ব। অনেক সঙ্গী হারিয়ে যায়, মানুষ সরে যায় অন্তরালে। আবার কবি বসেন জানালার ধারে—আকাশের দিকে তাকিয়ে। কিন্তু গাছগুলো রয়ে গেছে। এখন তারা আর খেলাধুলার সাথী নয়; তারা “সনাতন তপস্বী”—যেন আদিম প্রাণের প্রাচীন বাণী উচ্চারণ করছে দিনরাত।
এই গাছগুলোর মধ্য দিয়েই কবি উপলব্ধি করেন সেই চিরন্তন, নিরাসক্ত শান্তি—যা সকল পথের শুরুতে ছিল, সকল পথের শেষেও অপেক্ষা করে আছে।
দার্শনিক তাৎপর্য
“সাথী” কবিতাটি আমাদের শেখায়—
মানুষের জীবনে প্রকৃতি কেবল পটভূমি নয়, এক নীরব সহযাত্রী
মানুষ বদলায়, সম্পর্ক ভাঙে—কিন্তু প্রকৃতি থেকে যায়
জীবনের শেষ উপলব্ধি হলো নিঃশব্দ শান্তির সঙ্গে একাত্ম হওয়া
রবীন্দ্রনাথ এখানে প্রকৃতিকে কোনো রোম্যান্টিক অলংকার হিসেবে নয়, বরং জীবনসাধনার সহচর হিসেবে দেখেছেন।
“সাথী” কবিতাটি পরিশেষ কাব্যগ্রন্থের এক গভীর আত্মজৈবনিক রচনা। শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত জীবনের দীর্ঘ পথে যেসব সঙ্গী মানুষ চোখে দেখে না—নীরব গাছ, বাতাস, আকাশ—তাদের প্রতিই কবির এই কৃতজ্ঞ স্মরণ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই কবিতার মাধ্যমে আমাদের মনে করিয়ে দেন, জীবনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সাথীরা শব্দহীন হয়।
![পরিশেষ কাব্যগ্রন্থের সাথী কবিতা | Sathi Kobita 1 সাথী sathi [ কবিতা ] -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/06/সাথী-sathi-কবিতা-.gif)