পরিশেষ কাব্যগ্রন্থের বুদ্ধজন্মোৎসব কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পরিশেষ’ কাব্যগ্রন্থের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শান্তরসপ্রধান, সার্বজনীন ও মানবকল্যাণকামী স্তোত্রধর্মী কবিতা হলো ‘বুদ্ধজন্মোৎসব’। হিংসা, যুদ্ধোন্মাদনা ও লোভের আগুনে দগ্ধ আধুনিক পৃথিবীর চরম সংকটকালে গৌতম বুদ্ধের অহিংসা, ত্যাগ ও অপার মৈত্রীর অমৃতবাণীকে পুনরায় মর্ত্যধামে আবাহন করার এক ব্যাকুল প্রার্থনা এ কবিতায় ধ্রুপদী ছন্দে ধ্বনিত হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামবুদ্ধজন্মোৎসব
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থপরিশেষ
প্রকাশের বছর১৯৩২ (১৩৩৯ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনস্তোত্রধর্মী প্রার্থনা-কবিতা ও সংস্কৃত ছন্দাশ্রিত লিরিক (Hymn of Peace / Spiritual Lyric)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯৩২ সালে প্রকাশিত ‘পরিশেষ’ কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ সমকালীন বৈশ্বিক অবক্ষয়, হানাহানি ও সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বুদ্ধের বিশ্বমৈত্রী ও করুণার আদর্শকে মানবমুক্তির একমাত্র পথ হিসেবে তুলে ধরেছেন। ১৯২৭ সালের মে মাসে কলকাতার বুদ্ধ জন্মোৎসব উপলক্ষে সংস্কৃত ছন্দের ওজস্বিতায় কবি এটি রচনা করেছিলেন। মানুষ যখন লোভ ও হিংসার বিষে জর্জরিত হয়ে ভ্রাতৃঘাতী দ্বন্দ্বে লিপ্ত, তখন কবি ‘মহাভিক্ষু’ বুদ্ধের কাছে মানুষের ক্ষুদ্র অহংকার ভিক্ষা হিসেবে চেয়েছেন, যাতে ত্যাগ ও করুণার পুণ্যালোকে কলঙ্কিত ধরণী পুনরায় শান্ত ও পবিত্র হতে পারে।

সম্পূর্ণ কবিতা:

সংস্কৃত ছন্দের নিয়ম-অনুসারে পঠনীয়

           হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী,

                 নিত্য নিঠুর দ্বন্দ্ব,

           ঘোর কুটিল পন্থ তার,

                 লোভজটিল বন্ধ।

      নূতন তব জন্ম লাগি কাতর যত প্রাণী,

      কর ত্রাণ মহাপ্রাণ, আন অমৃতবাণী,

           বিকশিত কর প্রেমপদ্ম

           চিরমধুনিষ্যন্দ।

শান্ত হে, মুক্ত হে, হে অনন্তপুণ্য,

           করুণাঘন, ধরণীতল কর কলঙ্কশূন্য।

           এসো দানবীর, দাও

                 ত্যাগকঠিন দীক্ষা,

           মহাভিক্ষু, লও সবার

                 অহংকার ভিক্ষা।

লোক লোক ভুলুক শোক, খণ্ডন কর মোহ,

উজ্জ্বল কর জ্ঞানসূর্য-উদয়-সমারোহ,

           প্রাণ লভুক সকল ভুবন,

                 নয়ন লভুক অন্ধ।

শান্ত হে, মুক্ত হে, হে অনন্তপুণ্য,

       করুণাঘন, ধরণীতল কর কলঙ্কশূন্য।

           ক্রন্দনময় নিখিলহৃদয়

                 তাপদহনদীপ্ত।

           বিষয়বিষ-বিকারজীর্ণ

                 খিন্ন অপরিতৃপ্ত।

           দেশ দেশ পরিল তিলক রক্তকলুষগ্লানি,

           তব মঙ্গলশঙ্খ আন, তব দক্ষিণ পাণি,

                 তব শুভ সংগীতরাগ,

                         তব সুন্দর ছন্দ।

           শান্ত হে, মুক্ত হে, হে অনন্তপুণ্য,

                 করুণাঘন, ধরণীতল কর কলঙ্কশূন্য।

 

 

Amar Rabindranath Logo

সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

(Shongskrito chhongder niyom-onushare pothoniyo)
Hingshay unmotto pritthwi,
Nitto nithur dwondwo,
Ghor kutil pontho tar,
Lobhojotil bondho.
Nuton tobo jonmo lagi kator joto prani,
Koro tran mohapran, ano omritobani,
Bikoshito koro premopodmo
Chiromodhuni-shyondo.
Shanto he, mukto he, he onontopunno,
Korunaghono, dhoronitolo koro kolonko-shunno.
Esho danobir, dao
Tyagokothin dikkha,
Mohabhikkhu, lowo shobar
Ohongkar bhikkha.
Loko loko bhuluk shoko, khondono koro moho,
Ujjwolo koro gyanoshurjo-udoyo-shomarohô,
Prano lobhuk shokol bhubon,
Noyon lobhuk ondho.
Shanto he, mukto he, he onontopunno,
Korunaghono, dhoronitolo koro kolonko-shunno.
Krondonomoy nikhilohridoy
Tapodohonodipto.
Bishoyobisho-bikarojirno
Khinno oporitripto.
Desh desh porilo tilok roktokolushoglani,
Tobo monggoloshongkho ano, tobo dokkhino pani,
Tobo shubho shongitorago,
Tobo shundoro chhongdo.
Shanto he, mukto he, he onontopunno,
Korunaghono, dhoronitolo koro kolonko-shunno.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • হিংসা ও লোভের সংকটকালে পরিত্রাণের ডাক:
    “হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী, / নিত্য নিঠুর দ্বন্দ্ব, / … কর ত্রাণ মহাপ্রাণ, আন অমৃতবাণী, / বিকশিত কর প্রেমপদ্ম / চিরমধুনিষ্যন্দ।”
    — পৃথিবী যখন হানাহানি, শোষণ ও লোভের বিষবাষ্পে শ্বাসরুদ্ধ, তখন মানুষ বাঁচার পথ হারিয়ে ফেলে। এই অন্ধকারের বুক চিরে বুদ্ধের সেই প্রেমপদ্ম প্রস্ফুটিত হোক, যা তার অমৃতরসে মানুষের হিংসা ও ক্রোধের দাহকে নিবারণ করতে পারে।
  • অহংকার ভিক্ষা ও আত্মত্যাগের দীক্ষা:
    “এসো দানবীর, দাও / ত্যাগকঠিন দীক্ষা, / মহাভিক্ষু, লও সবার / অহংকার ভিক্ষা।”
    — বুদ্ধ হলেন ‘মহাভিক্ষু’, কিন্তু তিনি ধনরত্ন ভিক্ষা করেন না; মানুষের সর্বনাশা অহংকার ও আত্মম্ভরিতাকে তিনি ভিক্ষাপাত্রে তুলে নিতে চান। বৈষয়িক মোহ ও অহংবোধ দূর হলেই কেবল ত্যাগের কঠিন শক্তিতে মানবজাতি আত্মশুদ্ধির সন্ধান পায়।
  • রক্তকলুষ গ্লানি মোচন ও শাশ্বত কল্যাণ:
    “দেশ দেশ পরিল তিলক রক্তকলুষগ্লানি, / তব মঙ্গলশঙ্খ আন, তব দক্ষিণ পাণি, / … শান্ত হে, মুক্ত হে, হে অনন্তপুণ্য, / করুণাঘন, ধরণীতল কর কলঙ্কশূন্য।”
    — যুদ্ধবাজ রাষ্ট্রশক্তিগুলোর কপালে রক্তের যে কলঙ্কিত তিলক আঁকা হয়েছে, তা মোচনের জন্য প্রয়োজন বুদ্ধের মঙ্গলশঙ্খের পবিত্র ধ্বনি এবং আশীর্বাদের অভয়হস্ত। তাঁর অপরিসীম করুণা ও প্রেমের পরশেই কেবল ধরণী পাপের গ্লানি থেকে মুক্ত হয়ে শান্তিময় হতে পারে।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, সংস্কৃত ছন্দের নির্দেশনা ও রচনাকাল-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (পরিশেষ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন