বিচিত্রতা কাব্যগ্রন্থের আশীর্বাদ কবিতা [ Ashirbad Kobita, Bichitra Kabyagrantha ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর–এর কাব্যগ্রন্থ বিচিত্রতা ১৯৩৩ সালে প্রকাশিত হয় এবং এটি কবির পরিণত বয়সের এক গুরুত্বপূর্ণ কাব্যসংকলন হিসেবে বিবেচিত। এই গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ আত্মসমীক্ষা, শিল্পভাবনা ও মানবসৃষ্টির বহুমাত্রিক রূপকে নতুন ভাষায় প্রকাশ করেছেন। বিচিত্রতা–র কবিতাগুলির মধ্যে ব্যক্তিগত অনুভব, শিল্প ও সৃষ্টিশীলতার দার্শনিক উপলব্ধি গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। “আশীর্বাদ” কবিতাটি এই কাব্যগ্রন্থের অন্যতম উল্লেখযোগ্য রচনা, যা কবি লিখেছেন শিল্পী নন্দলাল বসুকে উদ্দেশ করে। পঞ্চাশ বছরের শিল্পী নন্দলাল বসুর প্রতি সত্তর বছরের “প্রবীণ যুবা” রবীন্দ্রনাথের এই আশীর্বাণী আসলে এক শিল্পীর প্রতি আর-এক শিল্পীর গভীর স্বীকৃতি ও স্নেহঘন শ্রদ্ধার প্রকাশ।

এই কবিতায় রবীন্দ্রনাথ নন্দলাল বসুর শিল্পীসত্তাকে এক চিরবালক সত্তা হিসেবে কল্পনা করেছেন। তাঁর চোখে নন্দলাল সেই শিল্পী, যাঁর দৃষ্টিতে জন্মলগ্ন থেকেই সৃষ্টির আলো স্নাত, যাঁর তুলিতে রেখা ও রঙ কেবল আকার নির্মাণ করে না—সংগীতের মতো সুর তোলে। কবিতার প্রতিটি স্তবকে রং, রেখা, নৃত্য, ছন্দ ও আলোর রূপক ব্যবহার করে কবি শিল্পসৃষ্টির এক জাদুকরী অভিজ্ঞতা নির্মাণ করেছেন। এখানে শিল্প কোনো কঠোর সাধনা নয়, বরং আনন্দময় খেলা—যেখানে সৃষ্টিকর্তা ও সৃষ্টি একে অপরকে ইশারায় চিনে নেয়।

“আশীর্বাদ” কবিতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রজন্মের সংলাপ। বয়সে প্রবীণ হয়েও কবি নিজেকে “তরুণ” বলে পরিচয় দেন, আর নন্দলাল বসুকে দেখেন চিরযৌবনের শিল্পী হিসেবে। এই কবিতায় রবীন্দ্রনাথ যেন নিজেও সেই খেলায় যোগ দিতে চান—নতুন আলোর মধ্যে নবজন্ম নেওয়া এক কাব্যসত্তাকে নন্দলালের শিল্পপথে চলার অনুপ্রেরণা দেন। ফলে কবিতাটি শুধু আশীর্বাণী নয়, এক ধরনের শিল্পঘোষণা।

সব মিলিয়ে, “আশীর্বাদ” কবিতাটি বিচিত্রতা কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত হয়েও স্বতন্ত্র মর্যাদা লাভ করেছে। এটি রবীন্দ্রনাথের শিল্পভাবনার এক উজ্জ্বল দলিল—যেখানে কবিতা, চিত্রকলা ও সৃষ্টির আনন্দ একসূত্রে মিলিত হয়েছে। এই কবিতা পাঠ মানে একজন মহান কবির চোখে আরেক মহান শিল্পীর সৃষ্টিসত্তাকে আবিষ্কার করা।

আশীর্বাদ কবিতা -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

পঞ্চাশ বছরের কিশোর গুণী নন্দলাল বসুর প্রতি

সত্তর বছরের প্রবীণ যুবা রবীন্দ্রনাথের আশীর্ভাষণ

    নন্দনের কুঞ্জতলে রঞ্জনার ধারা,

    জন্ম-আগে তাহার জলে তোমার স্নান সারা।

            অঞ্জন সে কী মধুরাতে

            লাগালো কে যে নয়নপাতে,

    সৃষ্টি-করা দৃষ্টি তাই পেয়েছে আঁখিতারা।

    এনেছে তব জন্মডালা অজর ফুলরাজি,

    রূপের-লীলালিখন-ভরা পারিজাতের সাজি।

            অপ্সরীর নৃত্যগুলি

            তুলির মুখে এনেছ তুলি,

    রেখার বাঁশি লেখার তব উঠিল সুরে বাজি।

    যে মায়াবিনী আলিম্পনা সবুজে নীলে লালে

    কখনো আঁকে কখনো মোছে অসীম দেশে কালে,

            মলিন মেঘে সন্ধ্যাকাশে

            রঙিন উপহাসি যে হাসে

    রঙজাগানো সোনার কাঠি সেই ছোঁয়ালো ভালে।

    বিশ্ব সদা তোমার কাছে ইশারা করে কত,

    তুমিও তারে ইশারা দাও আপন মনোমত।

            বিধির সাথে কেমন ছলে

            নীরবে তব আলাপ চলে,

    সৃষ্টি বুঝি এমনিতরো ইশারা অবিরত।

    ছবির ‘পরে পেয়েছ তুমি রবির বরাভয়,

    ধূপছায়ার চপল মায়া করেছ তুমি জয়।

            তব আঁকন-পটের ‘পরে

            জানি গো চিরদিনের তরে

    নটরাজের জটার রেখা জড়িত হয়ে রয়।

 

    চিরবালক ভুবনছবি আঁকিয়া খেলা করে,

    তাহারি তুমি সমবয়সী মাটির খেলাঘরে।

            তোমার সেই তরুণতাকে

            বয়স দিয়ে কভু কি ঢাকে,

    অসীম-পানে ভাসাও প্রাণ খেলার ভেলা-‘পরে।

    তোমারি খেলা খেলিতে আজি উঠেছে কবি মেতে,

    নববালক জন্ম নেবে নূতন আলোকেতে।

            ভাবনা তার ভাষায় ডোবা–

            মুক্ত চোখে বিশ্বশোভা

    দেখাও তারে, ছুটেছে মন তোমার পথে যেতে।

Amar Rabindranath Logo

মন্তব্য করুন