বিচিত্রতা কাব্যগ্রন্থের নীহারিকা কবিতা | Niharika Kobita | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর–এর কাব্যগ্রন্থ বিচিত্রতা (১৯৩৩) তাঁর পরিণত বয়সের কাব্যচিন্তার এক সূক্ষ্ম ও গভীর নিদর্শন। এই গ্রন্থে প্রেম আর স্মৃতি, পাওয়া আর হারানো, আত্মা আর সৃষ্টির মধ্যবর্তী অস্পষ্ট সীমারেখা বারবার ফিরে আসে। “নীহারিকা” কবিতাটি সেই অস্পষ্টতারই কাব্যিক রূপ—যেখানে অতীতের এক অনির্দিষ্ট সত্তা, আধা-স্বপ্ন আধা-স্মৃতির মতো, কবির শূন্য মনে এসে কথা বলে। নীহারিকার মতোই এই কবিতা—স্পষ্ট নয়, অথচ অনুভবে গভীর; ধরা যায় না, কিন্তু ছুঁয়ে থাকে দীর্ঘকাল।

কবিতার সূচনা প্রকৃতির এক স্নিগ্ধ, বিষণ্ন মুহূর্তে—বাদলশেষের আকাশ, তমালছায়া, দিঘির জল, ঝুঁকে-পড়া ডাল। এই আবহের মধ্যেই কবির শূন্য মনে হঠাৎ জেগে ওঠে এক অচেনা পরিচিত কণ্ঠ। প্রশ্ন ও উত্তরের সংলাপে ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়—এই আগন্তুক আসলে স্মৃতিরই রূপ, একদিনের স্পর্শ, এক রাতের আলো, এক অসম্পূর্ণ স্বীকৃতির প্রতিচ্ছবি।

নীহারিকা নিজেকে পরিচয় দেয় সেই হারানো অনুভূতি হিসেবে, যাকে কবি একদিন চিনতে পারেননি, ভাষা দিতে পারেননি। সে ছিল “খেয়ালস্রোতের তরী”, শ্রাবণরাত্রির লুকিয়ে-ফোটা কেয়া—অর্থাৎ আকস্মিক, ক্ষণিক, অথচ গভীর। অবহেলার কারণে সে হারিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু হারিয়েও সে জয়ী হয়েছে—কারণ কবির ভাষা, ছন্দ ও গানের ভিতরেই সে স্থায়ী বাসা বেঁধেছে।

এই কবিতায় রবীন্দ্রনাথ স্মৃতি ও সৃষ্টির সম্পর্ককে অনন্যভাবে তুলে ধরেন। যা একদিন অস্বীকৃত ছিল, তা-ই পরে কবিতার প্রাণ হয়ে ওঠে। বিরহ এখানে নিছক বিচ্ছেদ নয়; তা মিলনের গভীরে গোপনে রয়ে যাওয়া এক শক্তি। নীহারিকা জানায়—তার নাম ভুলে যাওয়া হলেও, তার পদধ্বনি আর থামে না; কবির বীণা, পল্লব, গানের কানাকানির মধ্যেই সে বেঁচে থাকে।

শেষাংশে নীহারিকা হয়ে ওঠে চিরন্তন অনুপস্থিতির প্রতীক—যে একদিন একা এসে এক নিমেষের ছোঁয়া রেখে চলে যায়, কিন্তু সমস্ত গানের সঙ্গে রেখে যায় “ভোলা নামের ধুয়া”। এই ধোঁয়াশাই কবিতার মূল সুর—স্মৃতি, প্রেম ও সৃষ্টির মাঝখানে থাকা এক নীল, উদাস, নীহারময় অস্তিত্ব।

“নীহারিকা” তাই শুধু একটি কবিতা নয়; এটি রবীন্দ্রনাথের আত্মসমীক্ষার কাব্যিক দলিল, যেখানে হারানো অনুভূতিই শেষ পর্যন্ত শিল্পের গভীরতম সম্পদ হয়ে ওঠে।

 

নীহারিকা কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বাদল-শেষের আবেশ আছে ছুঁয়ে

                   তমালছায়াতলে,

সজনে গাছের ডাল পড়েছে নুয়ে

                   দিঘির প্রান্তজলে।

        অস্তরবির-পথ-তাকানো মেঘে

        কালোর বুকে আলোর বেদন লেগে–

                   কেন এমন খনে

        কে যেন সে উঠল হঠাৎ জেগে

                   আমার শূন্য মনে।

“কে গো তুমি, ওগো ছায়ায় লীন”

                   প্রশ্ন পুছিলাম।

সে কহিল, “ছিল এমন দিন

                   জেনেছ মোর নাম।

        নীরব রাতে নিসুত দ্বিপ্রহরে

        প্রদীপ তোমার জ্বেলে দিলেম ঘরে,

                   চোখে দিলেম চুমো;

        সেদিন আমায় দেখলে আলস-ভরে

                   আধ-জাগা আধ-ঘুমো।

আমি তোমার খেয়ালস্রোতে তরী,

                   প্রথম-দেওয়া খেয়া–

মাতিয়েছিলেম শ্রাবণশর্বরী

                   লুকিয়ে-ফোটা কেয়া।

        সেদিন তুমি নাও নি আমায় বুঝে,

        জেগে উঠে পাও নি ভাষা খুঁজে,

                   দাও নি আসন পাতি–

সংশয়িত স্বপন-সাথে যুঝে

                   কাটল তোমার রাতি।

তার পরে কোন্‌ সব-ভুলিবার দিনে

                   নাম হল মোর হারা!

আমি যেন অকালে আশ্বিনে

                   এক-পসলার ধারা।

        তার পরে তো হল আমার জয়–

        সেই প্রদোষের ঝাপসা পরিচয়

                   ভরল তোমার ভাষা,

        তার পরে তো তোমার ছন্দোময়

                   বেঁধেছি মোর বাসা।

চেনো কিম্বা নাই বা আমায় চেনো

                   তবু তোমার আমি।

সেই সেদিনের পায়ের ধ্বনি জেনো

                   আর যাবে না থামি।

        যে-আমারে হারালে সেই কবে

        তারই সাধন করে গানের রবে

                   তোমার বীণাখানি।

        তোমার বনে প্রোল্লোল পল্লবে

                   তাহার কানাকানি।

সেদিন আমি এসেছিলেম একা

                   তোমার আঙিনাতে।

দুয়ার ছিল পাথর দিয়ে ঠেকা

                   নিদ্রাঘেরা রাতে।

        যাবার বেলা সে-দ্বার গেছি খুলে

        গন্ধ-বিভোল পবন-বিলোল ফুলে,

                        রঙ-ছড়ানো বনে–

        চঞ্চলিত কত শিথিল চুলে,

                        কত চোখের কোণে।

রইল তোমার সকল গানের সাথে

                   ভোলা নামের ধুয়া।

রেখে গেলেম সকল প্রিয়হাতে

                   এক নিমেষের ছুঁয়া।

        মোর বিরহ সব মিলনের তলে

        রইল গোপন স্বপন-অশ্রুজলে–

                   মোর আঁচলের হাওয়া

        আজ রাতে ওই কাহার নীলাঞ্চলে

                   উদাস হয়ে ধাওয়া।”

আরও দেখুনঃ

Amar Rabindranath Logo

মন্তব্য করুন