কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর–এর কাব্যগ্রন্থ বিচিত্রতা (১৯৩৩) তাঁর শেষ জীবনের কাব্যভাবনার এক গভীর ও বৈচিত্র্যময় দলিল। এই গ্রন্থে কবি প্রেম, আত্মদান, ঈশ্বরচেতনা, শিল্প ও মানবজীবনের অন্তর্লীন সত্যকে সংক্ষিপ্ত অথচ তীক্ষ্ণ কবিতায় রূপ দিয়েছেন। বিচিত্রতা–র কবিতাগুলির ভাষা সহজ, প্রায় লোকজ, কিন্তু ভাবনায় দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক। “স্যাকরা” কবিতাটি এই গ্রন্থের একটি ক্ষুদ্র অথচ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ রচনা, যেখানে প্রেম ও দানের চূড়ান্ত অর্থ এক অনাড়ম্বর কথোপকথনের ভেতর দিয়ে উন্মোচিত হয়।
এই কবিতায় স্যাকরা—অর্থাৎ গয়না গড়ার কারিগর—এক প্রতীকী চরিত্র। তার হাতে গড়া অলংকার কেবল বাহ্য সৌন্দর্যের বস্তু নয়; তা অন্তরের প্রিয়ার জন্য উৎসর্গীকৃত। কবি প্রশ্ন করেন, “কার লাগি এই গয়না গড়াও?” উত্তরে স্যাকরার সরল ঘোষণা—“একা আমার প্রিয়ার তরে।” এই প্রিয়া কোনো দৃশ্যমান মানুষ নয়; সে অবস্থান করে “মনের ভিতর, বুকের কাছে।” এখানে প্রিয়া হয়ে ওঠে আত্মার আদর্শ, ঈশ্বর বা পরম সত্যের প্রতীক।
কবিতার সংলাপধর্মী গঠন একে আরও গভীর করে তোলে। কবি জিজ্ঞাসা করেন—রাজারা তো এই গয়না কিনে নেয়, তবে কেন আগে প্রেয়সীকে সাজানো? স্যাকরার উত্তরে ধরা পড়ে এক অনন্য জীবনদর্শন: বাহ্য স্বীকৃতি বা রাজসম্মান নয়, প্রথম ও শেষ কর্তব্য হলো অন্তরের প্রিয়কে নিবেদন। অলংকারের সোনাও তখন অর্থ বদলায়—তা আর বস্তুগত ধাতু নয়, “অলখ ছোঁওয়ায়” রূপ পাওয়া এক পবিত্র স্পর্শ।
“স্যাকরা” কবিতার শেষ অংশে রবীন্দ্রনাথ দানের সর্বজনীন তাৎপর্য তুলে ধরেন। স্যাকরা জানায়, সে একলাই প্রিয়ার চরণতলে গয়না দেয়—কিন্তু সেই দানের মধ্য দিয়েই “পায় সকলে।” অর্থাৎ নিঃস্বার্থ আত্মদান কখনো ব্যক্তিগত থাকে না; তা সমগ্র মানবসমাজের কল্যাণে প্রসারিত হয়। এই ধারণা রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদী দর্শনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
সংক্ষিপ্ত পরিসরে “স্যাকরা” কবিতাটি প্রেম, শিল্প ও আত্মোৎসর্গের এক অনুপম রূপক। এখানে কবি দেখান, প্রকৃত সৌন্দর্য বাহিরে নয়—তা জন্ম নেয় অন্তরের প্রিয়কে উৎসর্গ করার মধ্য দিয়ে। এই কবিতা পাঠককে প্রশ্ন করে: আমরা যা গড়ি, যা অর্জন করি—তা কি সত্যিই আমাদের অন্তরের প্রিয়ার জন্য, নাকি কেবল বাহ্য জগতের স্বীকৃতির আশায়?
স্যাকরা কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কার লাগি এই গয়না গড়াও
যতন-ভরে।
স্যা-করা বলে, একা আমার
প্রিয়ার তরে।
শুধাই তারে, প্রিয়া তোমার
কোথায় আছে।
স্যা-করা বলে, মনের ভিতর
বুকের কাছে।
আমি বলি, কিনে তো লয়
মহারাজাই।
স্যা-করা বলে, প্রেয়সীরে
আগে সাজাই।
আমি শুধাই, সোনা তোমার
ছোঁয় কবে সে।
স্যা-করা বলে অলখ ছোঁওয়ায়
রূপ লভে সে।
শুধাই, একি একলা তারি
চরণতলে।
স্যা-করা বলে, তারে দিলেই
পায় সকলে।


![ভালোবেসে মন বললে bhalobese mon bolle [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভালোবেসে মন বললে bhalobese mon bolle [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/ভালোবেসে-মন-বললে-bhalobese-mon-bolle-কবিতা--1024x536.gif)





![অনেককালের একটিমাত্র দিন onekkaler ektimatro din [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অনেককালের একটিমাত্র দিন onekkaler ektimatro din [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/অনেককালের-একটিমাত্র-দিন-onekkaler-ektimatro-din-কবিতা--1024x536.gif)
