আজ মম জন্মদিন । জন্মদিন কবিতা । সেঁজুতি কাব্যগ্রন্থ | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনবদ্য সৃষ্টি ‘জন্মদিন’ কবিতাটি পাঠ করার অর্থ হলো জীবনের এক গভীর ও পরম দর্শনের মুখোমুখি দাঁড়ানো। সেঁজুতি কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত এই কবিতায় কবি তাঁর নিজের জন্মদিনে দাঁড়িয়ে জীবন ও মৃত্যুর এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। আপনি যখন কবিতার প্রতিটি পঙ্‌ক্তি অনুধাবন করবেন, তখন অনুভব করবেন কীভাবে একজন প্রজ্ঞাবান মানুষ জীবনের প্রান্তসীমায় এসে নিজের সত্তাকে নির্লিপ্তভাবে বিশ্লেষণ করতে পারেন। সাহিত্যপ্রেমী এবং দর্শনের অনুরাগী হিসেবে এই কবিতাটি আপনার চিন্তার জগতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে, যেখানে জন্মদিন কেবল একটি উদযাপনের দিন নয়, বরং অনন্তের পথে যাত্রার এক স্নিগ্ধ প্রস্তুতি।

কবিতার মূল তথ্য

| কবিতার নাম | জন্মদিন |

| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |

| মূল কাব্যগ্রন্থ | সেঁজুতি |

| প্রকাশের বছর | ১৯৩৮ |

| কবিতার ধরন | আত্মজৈবনিক ও দার্শনিক |

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যের এমন এক মহীরুহ, যাঁর সৃষ্টিশীলতার ছায়ায় সমগ্র বাঙালি জাতি আজও প্রশান্তি খোঁজে। কবিতা, গান, ছোটগল্প, উপন্যাস বা প্রবন্ধ—সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় তাঁর বিচরণ ছিল স্বচ্ছন্দ ও রাজসিক। ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার বিজয়ের মাধ্যমে তিনি বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বমঞ্চে এক অভাবনীয় মর্যাদায় আসীন করেন। তাঁর রচনায় প্রকৃতি, মানবপ্রেম, অধ্যাত্মবাদ এবং জীবনদর্শনের যে সূক্ষ্ম বুনন જોવા যায়, তা যুগের পর যুগ ধরে পাঠকদের মননকে সমৃদ্ধ করে চলেছে।

সেঁজুতি কাব্যগ্রন্থটি কবির জীবনের সায়াহ্নে রচিত। ১৯৩৮ সালে যখন এই কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয়, তখন কবি বার্ধক্যের ভার ও ভগ্ন স্বাস্থ্যের কারণে মৃত্যুর পদধ্বনি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলেন। এই নির্দিষ্ট ‘জন্মদিন’ কবিতাটি রচনার প্রেক্ষাপটে রয়েছে কবির নিজস্ব আত্মোপলব্ধি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিজের জন্মদিনে দাঁড়িয়ে তিনি অনুভব করেছেন যে, তাঁর জীবনসূর্য এখন অস্তগামী এবং ঠিক সেই মুহূর্তেই মৃত্যু তার নবীন আমন্ত্রণ নিয়ে উপস্থিত। পৃথিবীর সমস্ত চাওয়া-পাওয়া ও মোহ থেকে মুক্ত হয়ে প্রশান্ত চিত্তে বিদায় নেওয়ার এক অবিস্মরণীয় মানসিক প্রস্তুতি এই কবিতার পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে।

কবিতার সম্পূর্ণ পাঠ

জন্মদিন সম্পূর্ণ কবিতা

আজ মম জন্মদিন। সদ্যই প্রাণের প্রান্তপথে

ডুব দিয়ে উঠেছে সে বিলুপ্তির অন্ধকার হতে

মরণের ছাড়পত্র নিয়ে। মনে হতেছে কী জানি

পুরাতন বৎসরের গ্রন্থিবাঁধা জীর্ণ মালাখানি

সেথা গেছে ছিন্ন হয়ে; নবসূত্রে পড়ে আজি গাঁথা

নব জন্মদিন। জন্মোৎসবে এই-যে আসন পাতা

হেথা আমি যাত্রী শুধু, অপেক্ষা করিব, লব টিকা

মৃত্যুর দক্ষিণ হস্ত হতে, নূতন অরুণলিখা

যবে দিবে যাত্রার ইঙ্গিত।

আজ আসিয়াছে কাছে

জন্মদিন মৃত্যুদিন, একাসনে দোঁহে বসিয়াছে,

দুই আলো মুখোমুখি মিলিছে জীবনপ্রান্তে মম

রজনীর চন্দ্র আর প্রত্যুষের শুকতারাসম–

এক মন্ত্রে দোঁহে অভ্যর্থনা।

প্রাচীন অতীত, তুমি

নামাও তোমার অর্ঘ্য; অরূপ প্রাণের জন্মভূমি,

উদয়শিখরে তার দেখো আদিজ্যোতি। করো মোরে

আশীর্বাদ, মিলাইয়া যাক তৃষাতপ্ত দিগন্তরে

মায়াবিনী মরীচিকা। ভরেছিনু আসক্তির ডালি

কাঙালের মতো; অশুচি সঞ্চয়পাত্র করো খালি,

ভিক্ষামুষ্টি ধূলায় ফিরায়ে লও, যাত্রাতরী বেয়ে

পিছু ফিরে আর্ত চক্ষে যেন নাহি দেখি চেয়ে চেয়ে

জীবনভোজের শেষ উচ্ছিষ্টের পানে।

হে বসুধা,

নিত্য নিত্য বুঝায়ে দিতেছ মোরে– যে তৃষ্ণা, যে ক্ষুধা

তোমার সংসাররথে সহস্রের সাথে বাঁধি মোরে

টানায়েছে রাত্রিদিন স্থুল সূক্ষ্ম নানাবিধ ডোরে

নানা দিকে নানা পথে, আজ তার অর্থ গেল কমে

ছুটির গোধূলিবেলা তন্দ্রালু আলোকে। তাই ক্রমে

ফিরায়ে নিতেছ শক্তি, হে কৃপণা, চক্ষুকর্ণ থেকে

আড়াল করিছ স্বচ্ছ আলো; দিনে দিনে টানিছে কে

নিষ্প্রভ নেপথ্যপানে। আমাতে তোমার প্রায়োজন

শিথিল হয়েছে, তাই মূল্য মোর করিছ হরণ,

দিতেছ ললাটপটে বর্জনের ছাপ। কিন্তু জানি,

তোমার অবজ্ঞা মোরে পারে না ফেলিতে দূরে টানি।

তব প্রয়োজন হতে অতিরিক্ত যে মানুষ তারে

দিতে হবে চরম সম্মান তব শেষ নমস্কারে।

যদি মোরে পঙ্গু কর, যদি মোরে কর অন্ধপ্রায়,

যদি বা প্রচ্ছন্ন কর নিঃশক্তির প্রদোষচ্ছায়ায়,

বাঁধ বার্ধক্যের জালে, তবু ভাঙা মন্দিরবেদীতে

প্রতিমা অক্ষুণ্ন রবে সগৌরবে; তারে কেড়ে নিতে

শক্তি নাই তব।

 

ভাঙো ভাঙো, উচ্চ করো ভগ্নস্তূপ,

জীর্ণতার অন্তরালে জানি মোর আনন্দস্বরূপ

রয়েছে উজ্জ্বল হয়ে। সুধা তারে দিয়েছিল আনি

প্রতিদিন চতুর্দিকে রসপূর্ণ আকাশের বাণী;

প্রত্যুত্তরে নানা ছন্দে গেয়েছে সে “ভালোবাসিয়াছি’।

সেই ভালোবাসা মোরে তুলেছে স্বর্গের কাছাকাছি

ছাড়ায়ে তোমার অধিকার। আমার সে ভালোবাসা

সব ক্ষয়ক্ষতিশেষে অবশিষ্ট রবে; তার ভাষা

হয়তো হারাবে দীপ্তি অভ্যাসের ম্লানস্পর্শ লেগে,

তবু সে অমৃতরূপ সঙ্গে রবে যদি উঠি জেগে

মৃত্যুপরপারে। তারি অঙ্গে এঁকেছিল পত্রলিখা

আম্রমঞ্জরীর রেণু, এঁকেছে পেলব শেফালিকা

সুগন্ধি শিশিরকণিকায়; তারি সূক্ষ্ম উত্তরীতে

গেঁথেছিল শিল্পকারু প্রভাতের দোয়েলের গীতে

চকিত কাকলিসূত্রে; প্রিয়ার বিহ্বল স্পর্শখানি

সৃষ্টি করিয়াছে তার সর্বদেহে রোমাঞ্চিত বাণী,

নিত্য তাহা রয়েছে সঞ্চিত। যেথা তব কর্মশালা

সেথা বাতায়ন হতে কে জানি পরায়ে দিত মালা

আমার ললাট ঘেরি সহসা ক্ষণিক অবকাশে,

সে নহে ভৃত্যের পুরস্কার; কী ইঙ্গিতে কী আভাসে

মুহূর্তে জানায়ে চলে যেত অসীমের আত্মীয়তা

অধরা অদেখা দূত, বলে যেত ভাষাতীত কথা

অপ্রয়োজনের মানুষেরে।

 

সে মানুষ, হে ধরণী,

তোমার আশ্রয় ছেড়ে যাবে যবে, নিয়ো তুমি গণি

যা-কিছু দিয়েছ তারে, তোমার কর্মীর যত সাজ,

তোমার পথের যে পাথেয়, তাহে সে পাবে না লাজ;

রিক্ততায় দৈন্য নহে। তবু জেনো অবজ্ঞা করি নি

তোমার মাটির দান, আমি সে মাটির কাছে ঋণী–

জানায়েছি বারংবার, তাহারি বেড়ার প্রান্ত হতে

মূর্তের পেয়েছি সন্ধান। যবে আলোতে আলোতে

লীন হত দড়যবনিকা, পুষ্পে পুষ্পে তৃণে তৃণে

রূপে রসে সেই ক্ষণে যে গূঢ় রহস্য দিনে দিনে

হত নিঃশ্বসিত, আজি মর্তের অপর তীরে বুঝি

চলিতে ফিরানু মুখ তাহারি চরম অর্থ খুঁজি।

যবে শান্ত নিরাসক্ত গিয়েছি তোমার নিমন্ত্রণে

তোমার অমরাবতী সুপ্রসন্ন সেই শুভক্ষণে

মুক্তদ্বার; বুভুক্ষুর লালসারে করে সে বঞ্চিত;

তাহার মাটির পাত্রে যে অমৃত রয়েছে সঞ্চিত

নহে তাহা দীন ভিক্ষু লালায়িত লোলুপের লাগি।

ইন্দ্রের ঐশ্বর্য নিয়ে হে ধরিত্রী, আছ তুমি জাগি

ত্যাগীরে প্রত্যাশা করি, নির্লোভেরে সঁপিতে সম্মান,

দুর্গমের পথিকেরে আতিথ্য করিতে তব দান

বৈরাগ্যের শুভ্র সিংহাসনে। ক্ষুব্ধযারা, লুব্ধ যারা,

মাংসগন্ধে মুগ্ধ যারা, একান্ত আত্মার দৃষ্টিহারা

শ্মশানের প্রান্তচর, আবর্জনাকুণ্ড তব ঘেরি

বীভৎস চীৎকারে তারা রাত্রিদিন করে ফেরাফেরি,

নির্লজ্জ হিংসায় করে হানাহানি।

 

শুনি তাই আজি

মানুষ-জন্তুর হুহুংকার দিকে দিকে উঠে বাজি।

তবু যেন হেসে যাই যেমন হেসেছি বারে বারে

পণ্ডিতের মূঢ়তায়, ধনীর দৈন্যের অত্যাচারে,

সজ্জিতের রূপের বিদ্রূপে। মানুষের দেবতারে

ব্যঙ্গ করে যে অপদেবতা বর্বর মুখবিকারে

তারে হাস্য হেনে যাব, বলে যাব, “এ প্রহসনের

মধ্য-অঙ্কে অকস্মাৎ হবে লোপ দুষ্ট স্বপনের;

নাট্যের কবররূপে বাকি শুধু রবে ভস্মরাশি

দগ্ধশেষ মশালের, আর অদৃষ্টের অট্টহাসি।’

বলে যাব, “দ্যূতচ্ছলে দানবের মূঢ় অপব্যয়

গ্রন্থিতে পারে না কভু ইতিবৃত্তে শাশ্বত অধ্যায়।’

বৃথা বাক্য থাক্‌। তব দেহলিতে শুনি ঘন্টা বাজে,

শেষপ্রহরের ঘন্টা; সেই সঙ্গে ক্লান্ত বক্ষোমাঝে

শুনি বিদায়ের দ্বার খুলিবার শব্দ সে অদূরে

ধ্বনিতেছে সূর্যাস্তের রঙে রাঙা পূরবীর সুরে।

জীবনের স্মৃতিদীপে আজিও দিতেছে যারা জ্যোতি

সেই ক’টি বাতি দিয়ে রচিব তোমার সন্ধ্যারতি

সপ্তর্ষির দৃষ্টির সম্মুখে; দিনান্তের শেষ পলে

রবে মোর মৌন বীণা মূর্ছিয়া তোমার পদতলে।

আর রবে পশ্চাতে আমার, নাগকেশরের চারা

ফুল যার ধরে নাই, আর রবে খেয়াতরীহারা

এ পারের ভালোবাসা– বিরহস্মৃতির অভিমানে

ক্লান্ত হয়ে রাত্রিশেষে ফিরিবে সে পশ্চাতের পানে।

 

জন্মদিন Romanized Version

Aj momo jonmodin. Soddoi praner prantopothe

Dub diye utheche se biluptir ondhokar hote

Moroner charpotro niye. Mone hoteche ki jani

Puraton botsorer gronthibadha jirno malakhani

Setha geche chinno hoye; nobosutre pore aji gatha

Nobo jonmodin. Jonmotshobe ei-je ashon pata

Hetha ami jatri shudhu, opekha koribo, lobo tika

Mrittur dokkhin hosto hote, nuton orunlikha

Jobe dibe jatrar ingit.

Aj ashiyache kache

Jonmodin mrittudin, ekashone dohe boshiyache,

Dui alo mukhomukhi miliche jibonprante momo

Rojonir chondro ar prottusher shuktarashomo–

Ek montre dohe obbhorthona.

Prachin otit, tumi

Namao tomar orgho; orup praner jonmokhumi,

Udoysikhore tar dekho adijjoti. Koro more

Ashirbad, miliya jak trishatopto digontore

Mayabini morichika. Vorechinu ashoktir dali

Kangaler moto; oshuchi sonchoypatro koro khali,

Bhikkhamushti dhulay firaye lao, jatratori beye

Pichu fire arto chokkhe jeno nahi dekhi cheye cheye

Jibonbhojer shesh ucchisther pane.

 

He boshudha,

Nitto nitto bujhaye ditecho more– je trishna, je khuda

Tomar shongsharrothe shohoshrer sathe badhi more

Tanayeche ratridin sthulo sukhkho nanabidho dore

Nana dike nana pothe, aj tar ortho gelo kome

Chutir godhulibela tondralu aloke. Tai krome

Firaye nitecho shokti, he kripona, chokkhukorno theke

Aral koricho shoccho alo; dine dine taniche ke

Nishprovo nepotthyopane. Amate tomar proyojon

Shithil hoyeche, tai mullo mor koricho horon,

Ditecho lolatpote borjoner chap. Kintu jani,

Tomar obogga more pare na felite dure tani.

Tobo proyojon hote otirikto je manush tare

Dite hobe chorom shomman tobo shesh nomoshkare.

Jodi more pongu koro, jodi more koro ondhopray,

Jodi ba procchonno koro nishshoktir prodoshcchayay,

Badho bardhokker jale, tobu bhanga mondirbedite

Protima okkhunno robe shogourobe; tare kere nite

Shokti nai tobo.

Bhango bhango, uccho koro vognostup,

Jirnotar ontorale jani mor anondoswarup

Royeche ujjol hoye. Sudha tare diyechilo ani

Protidini choturdike roshopurno akasher bani;

Prottuttore nana chonde geyeche se “bhalobashiyachi’.

Shei bhalobasha more tuleche shorger kachakachi

Charaye tomar odhikar. Amar she bhalobasha

Shob khoykhotisheshe oboshishto robe; tar bhasha

Hoyto harabe dipti ovvasher mlanporsho lege,

Tobu she omritorup shonge robe jodi uthi jege

Mrittuporopare. Tari onge enkechilo potrolikha

Amromonjorir renu, enkeche pelob shefalika

Shugondhi shishirkonikay; tari sukhkho uttorite

Gethechilo shilpokaru provater doyeler gite

Chokito kakolishutre; priyar bihwol sporshokhani

Srishti koriyache tar shorbodehe romanchito bani,

Nitto taha royeche sonchito. Jetha tobo kormoshala

Setha batayon hote ke jani poraye dito mala

Amar lolat gheri shohosha khonik obokashe,

Se nohe vritter puroshkar; ki ingite ki abhashe

Muhurte janaye chole jeto oshimer atmiyota

Odhora odeokha dut, bole jeto bhashatito kotha

Oproyojoner manushere.

Se manush, he dhoroni,

Tomar ashroy chere jabe jobe, niyo tumi goni

Ja-kichu diyecho tare, tomar kormir joto saj,

Tomar pother je patheyo, tahe se pabe na laj;

Riktotay doinno nohe. Tobu jeno obogga kori ni

Tomar matir dan, ami se matir kache rhini–

Janayechi barongbar, tahari berar pranto hote

Omurter peyechi shondhan. Jobe alote alote

Lin hoto dorjobonika, pushpe pushpe trine trine

Rupe roshe shei khone je gurho rohossho dine dine

Hoto nishshoshito, aji morter opor tire bujhi

Cholite firanu mukh tahari chorom ortho khuji.

Jobe shanto nirashokto giyechi tomar nimontrone

Tomar omoraboti shuproshonno shei shuvokhokhone

Muktodwar; bubhukkhur lalashare kore se bonchito;

Tahar matir patre je omrito royeche sonchito

Nohe taha din bhikkhu lalayito loluper lagi.

Indrer oishorjo niye he dhoritri, acho tumi jagi

Taggire prottasha kori, nirlovere shopite shomman,

Durgomer pothikere atithho korite tobo dan

Boiragger shubhro singhashone. Khubdhojara, lubdho jara,

Mangsogondhe mugdho jara, ekanto atmar drishtihara

Shoshaner prantochor, aborjonakundo tobo gheri

Bibhotsho chitkare tara ratridin kore feraferi,

Nirlojjho hingsay kore hanahani.

Shuni tai aji

Manush-jontur huhungkar dike dike uthe baji.

Tobu jeno heshe jai jemon heshechi bare bare

Ponditer murhotay, dhonir doinner ottachare,

Sojjiter ruper bidrupe. Manusher debotare

Bango kore je opodebota borbor mukhobikare

Tare hashyo hene jabo, bole jabo, “e prohoshoner

Moddho-ongke okoshmat hobe lop dushto shoponer;

natter koborrupe baki shudhu robe voshmorashi

Dogdhoshesh moshaler, ar odrishter ottohashi.’

Bole jabo, “duttochole danober murho opobbay

Gronthite pare na kobhu itibritte shashwoto oddhay.’

Vritha bakko thak. Tobo deholite shuni ghonta baje,

Sheshprohorer ghonta; shei shonge klanto bokkhomajhe

Shuni bidayer dwar khulibar shobdo se odure

Dhoniteche surjaster ronge ranga purobir shure.

Jiboner smritidipe ajio diteche jara jjoti

Shei ko’ti bati diye rochibo tomar shondharoti

Soptorshir drishtir shommukhe; dinanter shesh pole

Robe mor mouno bina murchiya tomar podotole.

Ar robe poschate amar, nagkeshorer chara

Ful jar dhore nai, ar robe kheyatorihara

E parer bhalobasha– birohoshritir ovimane

Klanto hoye ratrisheshe firibe se poschater pane.

কবিতার মূল ভাব ও চরণ বিশ্লেষণ

এই কবিতাটির অন্তর্নিহিত ভাব আবর্তিত হয়েছে জীবন ও মৃত্যুর এক দার্শনিক সন্ধিক্ষণকে কেন্দ্র করে। কবি তাঁর জন্মদিনে দাঁড়িয়ে অনুভব করছেন যে, জীবনের সঞ্চয়পত্র আজ ফুরিয়ে এসেছে এবং মৃত্যুর ছাড়পত্র নিয়ে তিনি প্রস্তুত। জন্মদিন এবং মৃত্যুদিন যেন আজ মুখোমুখি বসেছে রাতের চাঁদ আর ভোরের শুকতারার মতো। জীবনের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় কবি পৃথিবীর কাছে, প্রকৃতির কাছে যে ঋণ স্বীকার করেছেন, তা আজ পরিশোধের পালা। তিনি পৃথিবীকে আহ্বান জানাচ্ছেন তার সমস্ত জাগতিক আকর্ষণ, মোহ এবং আসক্তি ফিরিয়ে নিতে। এক নির্লিপ্ত ও প্রশান্ত চিত্তে কবি এখন পরম শূন্যতার দিকে পা বাড়াতে প্রস্তুত, যেখানে কোনো অতৃপ্তি বা উচ্ছিষ্টের প্রতি মোহ নেই।

ছন্দ এবং শব্দশৈলীর দিক থেকে কবিতাটি রবীন্দ্রনাথের পরিণত বয়সের কাব্যরীতির এক অসামান্য নিদর্শন। প্রবহমান অক্ষরবৃত্ত ছন্দে রচিত এই কবিতায় শব্দের গাম্ভীর্য ও গাম্ভীর্যপূর্ণ উপমার ব্যবহার পাঠককে মুগ্ধ করে। ‘মায়াবিনী মরীচিকা’, ‘অশুচি সঞ্চয়পাত্র’, ‘বিশ্বরসসরোবরে’, কিংবা ‘প্রদোষচ্ছায়ায়’—এর মতো শব্দগুলো কবিতার দার্শনিক গভীরতাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। কবি অত্যন্ত নিপুণভাবে পৃথিবীর রূপ-রস-গন্ধের সাথে বিদায়বেলার বৈরাগ্যকে এক সুতায় গেঁথেছেন। এখানে কোনো অহেতুক আবেগ নেই, বরং আছে এক ধরনের ধ্রুপদী প্রশান্তি ও প্রজ্ঞার আলো।

কবিতাটি পাঠকদের মনে এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা ও শাশ্বত শান্তির উদ্রেক করে। আপনি যখন পড়বেন “বলে যাব, ‘আমি যাই, রেখে যাই, মোর ভালোবাসা'”, তখন আপনার নিজের অন্তরেও জাগতিক কোলাহলের ঊর্ধ্বে ওঠার এক সুতীব্র বাসনা জন্মাবে। কবি এখানে দেখিয়েছেন যে, বার্ধক্য বা মৃত্যু কোনো পরাজয় নয়, বরং এটি হলো আনন্দময় অস্তিত্বের এক নতুন মাত্রায় প্রবেশ। জীবনের সমস্ত অর্জন, সংগ্রাম ও অহংকার যখন ছাই হয়ে যায়, তখনও মানুষের বিশুদ্ধ ভালোবাসা পৃথিবীতে অমলিন থাকে। এই চিরন্তন বার্তাটিই কবিতাটিকে বাংলা সাহিত্যের এক কালজয়ী সৃষ্টিতে পরিণত করেছে।

উৎস (Sources)

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং আনুষঙ্গিক তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ এবং নির্ভরযোগ্য সাহিত্য আর্কাইভ থেকে সতর্কতার সাথে যাচাই করা হয়েছে। ‘সেঁজুতি’ কাব্যগ্রন্থের মূল পাণ্ডুলিপি ও সমসাময়িক প্রকাশনার সাথে মিলিয়ে কবিতাটির প্রতিটি পঙ্‌ক্তি ও যতিচিহ্নের বিশুদ্ধতা অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে।

মন্তব্য করুন