দৃষ্টিজালে জড়ায় ওকে হাজারখানা চোখ । জন্মদিন কবিতা | সেঁজুতি কাব্যগ্রন্থ | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেঁজুতি কাব্যগ্রন্থের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ‘জন্মদিন’ কবিতাটি এক ক্লান্ত নক্ষত্রের আত্মকথন। আপনি যখন এই কবিতার গভীরে প্রবেশ করবেন, তখন দেখতে পাবেন খ্যাতির চূড়ায় বসে থাকা একজন মানুষ কীভাবে সাধারণ মানুষের ভিড়ে মিশে যাওয়ার জন্য আকুল হয়ে উঠেছেন। হাজারো চোখের দৃষ্টি আর স্তুতির ভিড়ে হাঁপিয়ে ওঠা এক কবির নিভৃত জীবনের প্রতি যে তীব্র তৃষ্ণা, তা এই কবিতায় এক অপূর্ব কাব্যিক সুষমায় ধরা দিয়েছে। কবিতাটি আপনাকে বাধ্য করবে জীবনের সেই সহজ ও অনাড়ম্বর সৌন্দর্যকে নতুন করে উপলব্ধি করতে, যেখানে কৃত্রিমতার কোনো স্থান নেই, আছে কেবল প্রকৃতির অপার মুগ্ধতা।

কবিতার মূল তথ্য

| কবিতার নাম | জন্মদিন |

| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |

| মূল কাব্যগ্রন্থ | সেঁজুতি |

| প্রকাশের বছর | ১৯৩৮ |

| কবিতার ধরন | আত্মজৈবনিক ও প্রকৃতিপ্রেম |

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের এমন এক ধ্রুবতারা, যাঁর আলোয় আজও আলোকিত সমগ্র বাঙালি মনন। সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই যেখানে তাঁর জাদুকরী হাতের ছোঁয়া পড়েনি। ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার অর্জনের পর তিনি শুধু বাংলার নয়, হয়ে উঠেছিলেন সমগ্র বিশ্বের এক পরম পূজ্য ব্যক্তিত্ব। কিন্তু জীবনের সায়াহ্নে এসে এই বিপুল খ্যাতি, অবিরাম সংবর্ধনা আর মানুষের অন্তহীন কৌতূহল তাঁকে মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তুলেছিল। তাঁর পরিণত বয়সের রচনাগুলোতে তাই বারবার ফিরে এসেছে জাঁকজমকহীন এক শান্ত জীবনের প্রতি তীব্র অনুরাগ।

সেঁজুতি কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশের সময় রবীন্দ্রনাথ জীবনের আটাত্তরতম বর্ষে পদার্পণ করেছেন। এই নির্দিষ্ট কবিতাটি রচনার প্রেক্ষাপটে লুকিয়ে আছে খ্যাতির বিড়ম্বনা থেকে মুক্তির এক নীরব আর্তনাদ। চারপাশের মানুষের অতি-উৎসাহ, നിരন্তর প্রশংসা এবং হাজারো চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টির জাঁতাকলে পিষ্ট কবি চাইছেন এই ‘নিলাজ মঞ্চ’ থেকে নেমে আসতে। তিনি ফিরে যেতে চাইছেন সেই আদিম, অকৃত্রিম প্রকৃতির কোলে, যেখানে সজনে পাতার মতো হালকা পরিচয়ে বাঁচা যায়, যেখানে কোনো কোলাহল নেই। এটি কেবল একটি জন্মদিনের কবিতা নয়, এটি খ্যাতির কারাগারে বন্দী এক মহান শিল্পীর মুক্তির ইশতেহার।

কবিতার সম্পূর্ণ পাঠ

জন্মদিন সম্পূর্ণ কবিতা

দৃষ্টিজালে জড়ায় ওকে হাজারখানা চোখ,

ধ্বনির ঝড়ে বিপন্ন ওই লোক।

জন্মদিনের মুখর তিথি যারা ভুলেই থাকে,

দোহাই ওগো, তাদের দলে লও এ মানুষটাকে–

সজনে পাতার মতো যাদের হালকা পরিচয়,

দুলুক খসুক শব্দ নাহি হয়।

সবার মাঝে পৃথক ও যে ভিড়ের কারাগারে

খ্যাতি-বেড়ির নিরন্ত ঝংকারে।

সবাই মিলে নানা রঙে রঙিন করছে ওরে,

নিলাজ মঞ্চে রাখছে তুলে ধরে,

আঙুল তুলে দেখাচ্ছে দিনরাত;

কোথায় লুকোয় ভেবে না পায়, আড়াল ভূমিসাৎ।

দাও-না ছেড়ে ওকে

স্নিগ্ধ-আলো শ্যামল-ছায়া বিরল-কথার লোকে,

বেড়াহীন বিরাট ধূলি-‘পর,

সেই যেখানে মহাশিশুর আদিম খেলাঘর।

ভোরবেলাকার পাখির ডাকে প্রথম খেয়া এসে

ঠেকল যখন সব-প্রথমের চেনাশোনার দেশে,

নামল ঘাটে যখন তারে সাজ রাখে নি ঢেকে,

ছুটির আলো নগ্ন গায়ে লাগল আকাশ থেকে–

যেমন করে লাগে তরীর পালে,

যেমন লাগে অশোক গাছের কচি পাতার ডালে।

নাম ভোলা ফুল ফুটল ঘাসে ঘাসে

সেই প্রভাতের সহজ অবকাশে।

ছুটির যজ্ঞে পুষ্পহোমে জাগল বকুলশাখা,

ছুটির শূন্যে ফাগুনবেলা মেলল সোনার পাখা।

ছুটির কোণে গোপনে তার নাম

আচম্‌কা সেই পেয়েছিল মিষ্টিসুরের দাম;

কানে কানে সে নাম ডাকার ব্যথা উদাস করে

চৈত্রদিনের স্তব্ধ দুইপ্রহরে।

আজ সবুজ এই বনের পাতায় আলোর ঝিকিঝিকি

সেই নিমেষের তারিখ দিল লিখি।

তাহারে ডাক দিয়েছিল পদ্মানদীর ধারা,

কাঁপন-লাগা বেণুর শিরে দেখেছে শুকতারা;

কাজল-কালো মেঘের পুঞ্জ সজল সমীরণে

নীল ছায়াটি বিছিয়েছিল তটের বনে বনে;

ও দেখেছে গ্রামের বাঁকা বাটে

কাঁখে কলস মুখর মেয়ে চলে স্নানের ঘাটে;

সর্ষেতিসির খেতে

দুইরঙা সুর মিলেছিল অবাক আকাশেতে;

তাই দেখেছে চেয়ে চেয়ে অস্তরবির রাগে–

বলেছিল, এই তো ভালো লাগে।

সেই-যে ভালো-লাগাটি তার যাক সে রেখে পিছে,

কীর্তি যা সে গেঁথেছিল হয় যদি হোক মিছে,

না যদি রয় নাই রহিল নাম–

এই মাটিতে রইল তাহার বিস্মিত প্রণাম।

 

জন্মদিন Romanized Version

Drishtijale joray oke hazarkhana chokh,

Dhonir jhore biponno oi lok.

Jonmodiner mukhor tithi jara bhulei thake,

Dohai ogo, tader dole lao e manushtake–

Sojne patar moto jader halka porichoy,

Duluk khoshuk shobdo nahi hoy.

Sobar majhe prithok o je bhirer karagare

Khati-berir nironto jhongkare.

Sobai mile nana ronge rongin korche ore,

Nilaj monche rakhche tule dhore,

Angul tule dekhacche dinrat;

Kothay lukoy bhebe na pay, aral bhumishat.

 

Dao-na chere oke

Snigdho-alo shyamol-chaya birol-kothar loke,

Berahin birat dhuli-‘por,

Shei jekhane mohashishur adim khelaghor.

Bhorbelakar pakhir dake prothom kheya eshe

Theklo jokhon sob-prothomer chenashonar deshe,

Namlo ghate jokhon tare saj rakhe ni dheke,

Chutir alo nogno gaye laglo akash theke–

Jemon kore lage torir pale,

Jemon lage oshok gacher kochi patar dale.

Nam bhola ful futlo ghashe ghashe

Shei provater shohoj obokashe.

Chutir jogge pushpohome jaglo bokulshakha,

Chutir shunne fagunbela melolo sonar pakha.

Chutir kone gopone tar nam

Ahomka shei peyechilo mishtishurer dam;

Kane kane she nam dakar byatha udash kore

Choitrodiner stobdho duiprohore.

 

Aj shobuj ei boner patay alor jhikijhiki

Shei nimesher tarikh dilo likhi.

Tahare dak diyechilo podmanodir dhara,

Kapon-laga benur shire dekheche shuktara;

Kajol-kalo megher punjo sojol somirone

Nil chayati bichiyechilo toter bone bone;

O dekheche gramer baka bate

Kakhe kolosh mukhor meye chole snaner ghate;

Sorshetishir khete

Duironga shur milechilo obak akashete;

Tai dekheche cheye cheye ostorobir rage–

Bolechilo, ei to bhalo lage.

Shei-je bhalo-lagati tar jak se rekhe piche,

Kirti ja she gethechilo hoy jodi hok miche,

Na jodi roy nai rohilo nam–

Ei matite roilo tahar bishmito pronam.

কবিতার মূল ভাব ও চরণ বিশ্লেষণ

কবিতাটির অন্তরালে লুকিয়ে আছে এক নিদারুণ মানসিক একাকীত্ব এবং জাগতিক আড়ম্বর থেকে মুক্তির তীব্র বাসনা। হাজারো মানুষের দৃষ্টি আর প্রশংসার ঝড়ে বিপন্ন কবি অনুভব করছেন যে, এই খ্যাতি মূলত একটি কারাগার। তিনি সেইসব অখ্যাত মানুষের দলে মিশে যেতে চান, যাদের জীবন সজনে পাতার মতো নিঃশব্দে ঝরে পড়ে, কেউ খবর রাখে না। সমাজের তৈরি করা ‘নিলাজ মঞ্চে’ দাঁড়িয়ে থাকার ক্লান্তি থেকে মুক্তি চেয়ে তিনি প্রকৃতির বিশাল ধূলিকণায়, আদিম খেলাঘরে ফিরে যেতে চাইছেন। যেখানে কোনো কৃত্রিম সাজসজ্জা নেই, আছে কেবল ভোরের আলো, নাম-না-জানা ঘাসফুল আর উদার আকাশ।

ছন্দ এবং শব্দচয়নের চমৎকারিত্বে কবিতাটি রবীন্দ্রসাহিত্যের এক অমূল্য রত্ন। মুক্তক অক্ষরবৃত্তের সাবলীল প্রবাহে কবিতাটি যেন পাঠকের সাথে এক নিবিড় কথোপকথনে মেতে ওঠে। ‘খ্যাতি-বেড়ির নিরন্ত ঝংকার’, ‘নিলাজ মঞ্চ’, কিংবা ‘স্নিগ্ধ-আলো শ্যামল-ছায়া বিরল-কথার লোক’—এর মতো শব্দবন্ধগুলো কবির মানসিক যন্ত্রণাকে মূর্ত করে তোলে। গ্রামবাংলার চিরচেনা রূপ—পদ্মার ধারা, বাঁকা পথ, কাঁখে কলসি নিয়ে চলা মেয়ে, কিংবা সর্ষেক্ষেতের সৌন্দর্য—অত্যন্ত সুনিপুণভাবে চিত্রিত হয়েছে। নাগরিক কোলাহল আর প্রকৃতির শান্ত সমাহিত রূপের যে বৈপরীত্য কবি এখানে তুলে ধরেছেন, তা এককথায় অনবদ্য।

এই কবিতা পাঠ করার পর আপনার মনে এক অদ্ভুত শূন্যতা ও একইসাথে প্রশান্তি কাজ করবে। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্মান পেয়েও একজন মানুষ যে কেবল মাটির কাছাকাছি সাধারণ জীবনযাপনেই প্রকৃত আনন্দ খুঁজে পান, এই সত্যটি পাঠককে গভীরভাবে নাড়া দেয়। জীবনের সমস্ত কীর্তি ও নামডাককে তুচ্ছ জ্ঞান করে কেবল প্রকৃতির প্রতি ‘বিস্মিত প্রণাম’ জানিয়ে বিদায় নেওয়ার যে বাসনা কবি প্রকাশ করেছেন, তা আপনার অহংকারকে চূর্ণ করে দেবে। খ্যাতি বা সম্পদের চেয়ে যে প্রকৃতির সহজ সুন্দর রূপই মানুষের পরম চাওয়া হতে পারে, কবিতাটি সেই শাশ্বত দর্শনকেই প্রতিষ্ঠিত করে।

উৎস (Sources)

কবিতাটির মূল পাঠ, বিন্যাস এবং আনুষঙ্গিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ থেকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও যাচাই করা হয়েছে। ‘সেঁজুতি’ কাব্যগ্রন্থের মূল পাণ্ডুলিপি এবং নির্ভরযোগ্য সাহিত্য কোষের সাথে মিলিয়ে কবিতাটির যতিচিহ্ন ও বানানের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করা হয়েছে, যাতে মূল রচনার কোনো প্রকার বিকৃতি না ঘটে।

মন্তব্য করুন