রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর কাব্যগ্রন্থ বীথিকা তাঁর পরিণত কাব্যভাবনার এক সংযত ও অন্তর্মুখী প্রকাশ। বীথিকায় রবীন্দ্রনাথ প্রেম, বিরহ, আত্মসংযম ও আত্মশুদ্ধির পথকে গভীর মানবিক দৃষ্টিতে অন্বেষণ করেছেন। এই গ্রন্থের অন্তর্গত “ব্যর্থ মিলন” কবিতাটি প্রেমের অপূর্ণতার কাব্যিক দলিল—যেখানে মিলনের ব্যর্থতা হতাশায় শেষ না হয়ে ধীরে ধীরে তপস্যা, সংযম ও আত্মিক শান্তির দিকে রূপান্তরিত হয়। এখানে প্রেম আর দাবি নয়; প্রেম হয়ে ওঠে সাধনা।
Table of Contents
ব্যর্থ মিলন কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বুঝিলাম, এ মিলন ঝড়ের মিলন,
কাছে এনে দূরে দিল ঠেলি।
ক্ষুব্ধ মন
যতই ধরিতে চায়, বিরুদ্ধ আঘাতে
তোমারে হারায় হতাশ্বাস।
তব হাতে
দাক্ষিণ্য যে নাই, শুধু শিথিল পরশে
করিছে কৃপণ কৃপা। কর্তব্যের বশে
যে-দান করিলে তার মূল্য অপহরি
লুকায়ে রাখিলে কোথা
আমি খুঁজে মরি
পাই নে নাগাল। শরতের মেঘ তুমি
ছায়া মাত্র দিয়ে ভেসে যাও
–মরুভূমি
শূন্য-পানে চেয়ে থাকে, পিপাসা তাহার
সমস্ত হৃদয় ব্যাপি করে হাহাকার।
ভয় করিয়ো না মোরে।
এ করুণাকণা
রেখো মনে–ভুল করে মনে করিয়ো না
দস্যু আমি, লোভেতে নিষ্ঠুর।
জেনো মোরে
প্রেমের তাপস।
সুকঠোর ব্রত ধ’রে
করিব সাধনা,
আশাহীন ক্ষোভহীন
বহ্নিতপ্ত ধ্যানাসনে রব রাত্রিদিন।
ছাড়িয়া দিলাম হাত।
যদি কভু হয়
তপস্যা সার্থক, তবে পাইব হৃদয়।
না-ও যদি ঘটে, তবে আশাচঞ্চলতা
দাহিয়া হইবে শান্ত। সেও সফলতা।

মিলনের ভ্রান্ত স্বরূপ : ঝড়ের কাছাকাছি আসা
কবিতার শুরুতেই কবি স্পষ্ট করে দেন—এই মিলন স্থায়ী নয়, এটি “ঝড়ের মিলন”। কাছে এসে দূরে ঠেলে দেওয়া—এই অস্থিরতা প্রেমিকের মনে ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম দেয়। যতই ধরা দিতে চাওয়া হোক, বিরুদ্ধ আঘাতে প্রিয় সত্তা হারিয়ে যায়। এই মিলনে দাক্ষিণ্যের অভাব, আছে কেবল শিথিল পরশ—যেন কর্তব্যের বশে দেওয়া কৃপণ দান, যার প্রকৃত মূল্য লুকিয়ে থাকে অধরাই।
শরতের মেঘের উপমা এখানে গভীর—ছায়া দেয়, কিন্তু জল দেয় না। ফলে প্রেমিকের হৃদয় মরুভূমির মতো পিপাসার্ত হয়ে থাকে; শূন্যতার দিকে তাকিয়ে থাকে হাহাকারে।
আত্মসম্মান ও স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা
কবি অনুরোধ করেন—তাঁকে যেন ভুল করে লোভী বা নিষ্ঠুর ভাবা না হয়। তিনি “প্রেমের তাপস”—যিনি করুণার কণা ভিক্ষা চান না, চান স্বীকৃতি ও সত্যতা। এই অংশে প্রেমিকের আত্মসম্মান স্পষ্ট; প্রেম এখানে দয়ার পাত্র নয়, সাধনার বিষয়।
তপস্যার পথে উত্তরণ
কবিতার শেষভাগে আসে রূপান্তর। কবি হাত ছেড়ে দেন—এটি পরাজয় নয়, আত্মসংযমের সিদ্ধান্ত। আশা ও ক্ষোভহীন হয়ে, বহ্নিতপ্ত ধ্যানাসনে বসে তিনি সাধনার কথা বলেন। যদি তপস্যা সার্থক হয়, তবে হৃদয়ের মিলন ঘটবে; আর না হলেও আশাচঞ্চলতা দগ্ধ হয়ে যে শান্তি আসবে—সেই শান্তিও সফলতা।
এখানে প্রেম ব্যর্থ হলেও জীবন ব্যর্থ নয়। ব্যর্থতা নিজেই হয়ে ওঠে আত্মশুদ্ধির পথ।
দার্শনিক তাৎপর্য
“ব্যর্থ মিলন” আমাদের শেখায়—
- সব মিলন পূর্ণতায় পৌঁছায় না, তবু তা অর্থহীন নয়
- প্রেম দাবি করলে ক্ষয় হয়, ত্যাগ করলে পরিণত হয়
- অপূর্ণতা আত্মিক শান্তির পথে নিয়ে যেতে পারে
রবীন্দ্রনাথ এখানে প্রেমকে আবেগের সীমা ছাড়িয়ে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক অনুশীলন হিসেবে দেখিয়েছেন।
“ব্যর্থ মিলন” বীথিকা কাব্যগ্রন্থের এক গভীর অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন কবিতা। এখানে মিলনের ব্যর্থতা কবিকে ভাঙে না; বরং তাঁকে সংযম, তপস্যা ও শান্তির দিকে নিয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই কবিতার মাধ্যমে জানান—সব প্রাপ্তিই মিলনে নয়, কিছু প্রাপ্তি আত্মদহনের পরের শান্তিতে। এই উপলব্ধিই কবিতাটিকে চিরকালীন করে তোলে।
