রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গীতবিতান’-এর প্রেম পর্যায়ের (গান নং ১৫১) অন্যতম জনপ্রিয় ও হৃদয়স্পর্শী গান “তবু মনে রেখো”। ১২৯৪ বঙ্গাব্দে (১৮৮৭-১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দ) রচিত এই গানটিতে প্রিয়জনের স্মৃতিতে চিরস্থায়ী আসন পাওয়ার এক নিঃশব্দ আকুতি প্রকাশ পেয়েছে। সম্পর্কের শারীরিক দূরত্ব, মানসিক ব্যবধান কিংবা জীবনের গতিপথ বদলালেও ভালোবাসার স্মৃতি যেন কখনো মুছে না যায়—এই গানের ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠেছে সেই উদাস ও সমর্পণমুখী ভাব। বৈষ্ণব কীর্তনের সুররীতি ও দাদরা তালের মিষ্টি চালে গানটি শ্রুतिमধুর এক আবেদন সৃষ্টি করে।
Table of Contents
গানের বিস্তারিত তথ্য
| তথ্যবিবরণ | বিস্তারিত তথ্য |
| গানের নাম | তবু মনে রেখো |
| গীতিকার / রচয়িতা | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| সুরকার | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| পর্যায় | প্রেম (গান নং ১৫১) |
| উপ-পর্যায় / অঙ্গ | কীর্তন অঙ্গ / বিরহ |
| তাল | দাদরা |
| রাগ | কীর্তন সুরাশ্রিত |
| রচনাকাল (বঙ্গাব্দ) | ১২৯৪ |
| রচনাকাল (খ্রিস্টাব্দ) | ১৮৮৭-১৮৮৮ |
| গ্রন্থ / সংকলন | গীতবিতান, স্বরবিতান |
তবু মনে রেখো যদি দূরে যাই চলে গানের লিরিক
তবু মনে রেখো যদি দূরে যাই চলে।
যদি পুরাতন প্রেম ঢাকা পড়ে যায় নবপ্রেমজালে।
যদি থাকি কাছাকাছি,
দেখিতে না পাও ছায়ার মতন আছি না আছি–
তবু মনে রেখো।
যদি জল আসে আঁখিপাতে,
এক দিন যদি খেলা থেমে যায় মধুরাতে,
তবু মনে রেখো।
এক দিন যদি বাধা পড়ে কাজে শারদ প্রাতে– মনে রেখো।
যদি পড়িয়া মনে
ছলোছলো জল নাই দেখা দেয় নয়নকোণে–
তবু মনে রেখো।
Tobu Mone Rekho (Romanized Lyric)
Tobu mone rekho jodi dure jai chole।
Jodi puraton prem dhaka pore jay nobopremojale।
Jodi thaki kachhakachhi,
Dekhite na pao chhayar moton achhi na achhi—
Tobu mone rekho।
Jodi jol ase aankhipate,
Ek din jodi khela theme jay modhurate,
Tobu mone rekho।
Ek din jodi badha pore kaje sharod prate— mone rekho।
Jodi poriya mone
Chholchhol jol nai dekha dey noyonokone—
Tobu mone rekho।
গানের মূল ভাব
“তবু মনে রেখো” গানটির মূল নির্যাস হলো ভালোবাসার নিঃস্বার্থ নিবেদন। মানবজীবনে বিচ্ছেদ বা দূরত্ব অননিবার্য হতে পারে। প্রিয়জন দূরে সরে যেতে পারে, কিংবা নতুন কোনো অনুভূতির আবহে পুরোনো সম্পর্কের স্মৃতি ধূসর হয়ে আসতে পারে। কিন্তু প্রকৃত প্রেমিক কোনো অধিকার প্রয়োগ করেন না, অধিকার দাবিও করেন না; তিনি কেবল চান প্রিয়জনের হৃদয়ের একান্তে তাঁর স্মৃতিটুকুর অস্তিত্ব যেন অমলিন থাকে।
জীবনের আনন্দে কিংবা বেদনায়, উৎসবের মধুরাতে কিংবা কর্মমুখর শরতের সকালে—যেকোনো মুহূর্তে যদি হঠাৎ পুরোনো স্মৃতি ভেসে ওঠে, তবে নয়নকোণে অশ্রু আসুক বা না আসুক, স্মরণের সেই পরম মুহূর্তটুকুই ভালোবাসার সার্থকতা।
চরণ ও স্তবক বিশ্লেষণ
১. দূরত্ব ও পরিবর্তনের মাঝে স্মৃতির আকুতি
- “তবু মনে রেখো যদি দূরে যাই চলে / যদি পুরাতন প্রেম ঢাকা পড়ে যায় নবপ্রেমজালে”এখানে ‘দূরত্ব’ কেবল ভৌগোলিক নয়, মানসিক দূরত্বের রূপক। মানুষের জীবনে নতুন প্রেম বা নতুন অনুভূতি এলে পুরোনো স্মৃতি ঢেকে যাওয়া স্বাভাবিক। কবি এই স্বাভাবিকতাকে স্বীকার করে নিয়েও অনুযোগহীন কণ্ঠে অনুরোধ জানিয়েছেন—সেই পরিবর্তনের মাঝেও যেন পুরোনো দিনগুলোর কথা ভুলে না যাওয়া হয়।
২. দৃশ্যমান অনুপস্থিতি ও ছায়ার অস্তিত্ব
- “যদি থাকি কাছাকাছি / দেখিতে না পাও ছায়ার মতন আছি না আছি”কখনো কখনো মানুষ পাশাপাশি থেকেও অলক্ষ্যে থেকে যায়। অনাদর বা অবহেলায় নিজের অস্তিত্ব যখন ছায়ার মতো আবছা হয়ে ওঠে, তখনও প্রেমিকের মন প্রিয়জনের শুভাকাঙ্ক্ষী হয়ে পাশে থাকতে চায়।
৩. জীবনের ভিন্ন ভিন্ন মুহূর্তে স্মরণ
- “এক দিন যদি খেলা থেমে যায় মধুরাতে… / এক দিন যদি বাধা পড়ে কাজে শারদ প্রাতে”উৎসব বা আনন্দের অবসান (‘মধুরাত’) কিংবা দৈনন্দিন জীবনসংগ্রামের প্রারম্ভ (‘শারদ প্রাত’)—জীবনের প্রতিটি বিশেষ সন্ধিক্ষণে প্রিয়জনের অবচেতন মনে নিজের জন্য একটুখানি স্মৃতি প্রার্থনা করা হয়েছে। নয়নকোণে জল না আসলেও স্মৃতির অনুভূতির অস্তিত্বটুকুই এখানে মূল।
গানের সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য
- কোমল শব্দচয়ন: ‘নবপ্রেমজাল’, ‘শারদ প্রাত’, এবং ‘ছায়ার মতন’-এর মতো শব্দ ব্যবহার কাব্যিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে।
- অনুপস্থিতির রূপক: প্রেমিক নিজেকে সরাসরি কোনো দৃশ্যমান সত্তা হিসেবে উপস্থাপন না করে ‘ছায়া’ বা ‘স্মৃতি’-র মতো সূক্ষ্ম সত্তায় রূপায়িত করেছেন।
- সংযমী আবেগ: বিরহের গান হলেও এতে তীব্র চিৎকার বা হাহাকার নেই; রয়েছে গভীর সংযম ও কোমল আত্মসমর্পণ।
সংগীততাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য
- কীর্তন অঙ্গের সুর: গানটি বাংলার প্রথাগত বৈষ্ণব কীর্তনের সুররীতিতে নিবদ্ধ। কীর্তনের স্বভাবজাত ব্যাকুলতা ও সমর্পণের সুর এই গানে স্পষ্ট।
- দাদরা তাল: ৩।৩ ছন্দের প্রবহমান ‘দাদরা’ তালে সুরারোপিত হওয়ার কারণে গানের কথামালা সহজ ও সাবলীল দোলায় দোলে।
রচনাপ্রেক্ষিত ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব
১২৯৪ বঙ্গাব্দে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন গানটি রচনা করেন, তখন তাঁর রবীন্দ্রসংগীতের আদি পর্বের কাব্যিক ও গীতিময় রূপটি বিকাশ লাভ করছিল। কীর্তন অঙ্গের সুরকে আধুনিক গান ও কবিতার সাথে যুক্ত করার যে সুনিপুণ দক্ষতা রবীন্দ্রনাথের ছিল, এই গানটি তার অন্যতম সেরা নিদর্শন। রবীন্দ্রসংগীতের প্রেম ও বিরহ ধারায় “তবু মনে রেখো” সর্বকালের অন্যতম আবেদনময় সৃষ্টি হিসেবে বিবেচিত।
উৎস ও তথ্যসূত্র
- গীতবিতান (প্রেম পর্যায়, গান নং ১৫১), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী প্রকাশন বিভাগ।
- স্বরবিতান, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী প্রকাশনা।
- Tagoreweb Digital Archive, প্রামাণ্য রবীন্দ্রসংগীত তথ্যভাণ্ডার।
![তবু মনে রেখো - Tobu mone rekho [ রবীন্দ্রসঙ্গীত, প্রেম ১৫১ ] 1 তবু মনে রেখো - Tobu mone rekho [ রবীন্দ্রসঙ্গীত, প্রেম ১৫১ ]](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/11/তবু-মনে-রেখো.gif)