সোনার তরী কাব্যগ্রন্থের ‘দেউল’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দেউল’ কবিতাটি তাঁর সোনার তরী কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত একটি গভীর প্রতীকধর্মী কবিতা। কবিতাটিতে একজন স্রষ্টার আত্মনিমগ্ন সাধনা, নিজের নির্মিত সৌন্দর্যের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে থাকা, আকস্মিক আঘাতে সেই আবদ্ধতার ভাঙন এবং শেষ পর্যন্ত বৃহত্তর বিশ্বজীবনের সঙ্গে মিলনের এক আধ্যাত্মিক যাত্রা ফুটে উঠেছে।

‘দেউল’ অর্থ মন্দির। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের কবিতায় এই দেউল কেবল পাথর দিয়ে নির্মিত কোনো উপাসনালয় নয়—এটি মানুষের নিজের হাতে নির্মিত এক অন্তর্জগৎ, যেখানে সে তার কল্পনা, সাধনা, শিল্প ও আরাধ্যকে কেন্দ্র করে একটি সম্পূর্ণ জগৎ তৈরি করে। পরে বজ্রাঘাতের মতো এক অভিঘাতে সেই বন্ধ জগৎ ভেঙে যায় এবং ভিতরে প্রবেশ করে বাইরের আলো, প্রকৃতি ও জীবন।

সোনার তরী কাব্যগ্রন্থটি ১৮৯৪ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম প্রকাশিত হয় এবং রবীন্দ্রনাথের ‘মানসী–সোনার তরী’ পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ কাব্যকর্ম হিসেবে বিবেচিত। তবে পুরোনো পাঠ-নথিতে সোনার তরী-র ১৮৯৩ সালের সংস্করণও সংরক্ষিত রয়েছে।

 

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়তথ্য
কাব্যগ্রন্থের নামসোনার তরী
কবিতার নামদেউল
কবিরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কাব্যগ্রন্থের প্রথম প্রকাশকাল১৮৯৪ খ্রিষ্টাব্দ (১৩০০ বঙ্গাব্দ)
প্রাচীন পাঠ-নথি১৮৯৩ সালের সংস্করণেও ‘দেউল’ সংরক্ষিত
ধরনপ্রতীকধর্মী ও দার্শনিক কবিতা
মূল প্রতীকদেউল, দেবতা, অন্ধকার, বজ্র, আলো, দ্বার
কেন্দ্রীয় ভাবআত্মনির্মিত আবদ্ধতা থেকে বিশ্বজীবনের মুক্ত ও আলোকিত পরিসরে উত্তরণ

‘দেউল’ কবিতার পাঠ সোনার তরী-র ১৮৯৩ সালের নথিভুক্ত সংস্করণে ১১২–১১৬ পৃষ্ঠার মধ্যে পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথের পাণ্ডুলিপিতেও কবিতাটির পাঠ সংরক্ষিত আছে।

 

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১–১৯৪১) বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি, সাহিত্যিক ও চিন্তক। তাঁর কবিতায় প্রকৃতি, প্রেম, মানবতা, আত্মসন্ধান, ঈশ্বরচেতনা, সৌন্দর্য এবং মানুষের সঙ্গে বিশ্বপ্রকৃতির সম্পর্ক বারবার ফিরে এসেছে।

সোনার তরী পর্যায়ের কবিতাগুলিতে আত্মজগতের সঙ্গে বৃহত্তর বিশ্বজগতের সম্পর্ক বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ‘দেউল’ কবিতাতেও প্রথমে কবির নির্মিত জগৎটি সম্পূর্ণভাবে বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন। সেখানে জানালা-দরজা নেই, চারদিকে অন্ধকার, এবং কবি নিজের দেবতার ধ্যানে নিমগ্ন।

কিন্তু এই আত্মনির্মিত জগতের পরিণতি স্থবিরতা। বজ্রাঘাতের মতো একটি আকস্মিক আঘাত সেই পাথরের প্রাচীর ভেঙে দেয়। তখন বাইরের আলো ভিতরে প্রবেশ করে, দেবতার মুখে নতুন মহিমা দেখা যায় এবং কবির নিজের সৃষ্টির সীমাবদ্ধতাও প্রকাশিত হয়।

 

সম্পূর্ণ কবিতা

দেউল

রচিয়াছিনু দেউল একখানি

অনেক দিনে অনেক দুখ মানি।

      রাখি নি তার জানালা দ্বার,

      সকল দিক অন্ধকার,

      ভূধর হতে পাষাণভার

       যতনে বহি আনি॥

রচিয়াছিনু দেউল একখানি।

দেবতাটিরে বসায়ে মাঝখানে

ছিলাম চেয়ে তাহারি মুখপানে।

বাহিরে ফেলি এ ত্রিভুবন

    ভুলিয়া গিয়া বিশ্বজন

    ধেয়ান তারি অনুক্ষণ

    করেছি একপ্রাণে,॥

দেবতাটিরে বসায়ে মাঝখানে।

যাপন করি অন্তহীন রাতি

জ্বালায়ে শত গন্ধময় বাতি।

    কনকমণি-পাত্রপুটে

    সুরভি ধূপধূম্র উঠে,

    গুরু অগুরু-গন্ধ ছুটে,

   পরান উঠে মাতি॥

যাপন করি অন্তহীন রাতি।

নিদ্রাহীন বসিয়া এক চিতে

চিত্র কত এঁকেছি চারি ভিতে।

    স্বপ্নসম চমৎকার,

    কোথাও নাহি উপমা তার–

    কত বরন, কত আকার

   কে পারে বরনিতে    ॥

চিত্র যত এঁকেছি চারি ভিতে।

স্তম্ভগুলি জড়ায়ে শত পাকে

নাগবালিকা ফণা তুলিয়া থাকে।

    উপরে ঘিরি চারিটি ধার

    দৈত্যগুলি বিকটাকার,

    পাষাণময় ছাদের ভার

              মাথায় ধরি রাখে॥

নাগবালিকা ফণা তুলিয়া থাকে।

সৃষ্টিছাড়া সৃজন কত মতো।

পক্ষীরাজ উড়িছে শত শত।

    ফুলের মতো লতার মাঝে

    নারীর মুখ বিকশি রাজে

    প্রণয়ভরা বিনয়ে লাজে

        নয়ন করি নত।

সৃষ্টিছাড়া সৃজন কত মতো।

ধ্বনিত এই ধারার মাঝখানে

শুধু এ গৃহ শব্দ নাহি জানে।

    ব্যাঘ্রাজিন-আসন পাতি

    বিবিধরূপ ছন্দ গাঁথি

    মন্ত্র পড়ি দিবস রাতি

        গুঞ্জরিত তানে,

শব্দহীন গৃহের মাঝখানে।

এমন করে গিয়েছে কত দিন,

জানি নে কিছু, আছি আপন-লীন।

    চিত্ত মোর নিমেষহত

    ঊর্ধ্বমুখী শিখার মতো,

    শরীরখানি মূর্ছাহত

         ভাবের তাপে ক্ষীণ।

এমন করে গিয়েছে কত দিন।

একদা এক বিষম ঘোর স্বরে

বজ্র আসি পড়িল মোর ঘরে।

    বেদনা এক তীক্ষ্ণতম

    পশিল গিয়ে হৃদয়ে মম,

    অগ্নিময় সর্পসম

        কাটিল অন্তরে।

বজ্র আসি পড়িল মোর ঘরে।

পাষাণরাশি সহসা গেল টুটি,

গৃহের মাঝে দিবস উঠে ফুটি।

    নীরব ধ্যান করিয়া চুর

    কঠিন বাঁধ করিয়া দূর

    সংসারের অশেষ সুর

          ভিতরে এল ছুটি।

পাষাণরাশি সহসা গেল টুটি।

দেবতা-পানে চাহিনু একবার,

আলোক আসি পড়েছে মুখে তাঁর।

    নূতন এক মহিমারাশি

    ললাটে তাঁর উঠেছে ভাসি,

    জাগিছে এক প্রসাদহাসি

        অধর-চারিধার।

দেবতা-পানে চাহিনু একবার।

শরমে দীপ মলিন একেবারে

লুকাতে চাহে চির-অন্ধকারে।

    শিকলে বাঁধা স্বপ্নমতো

    ভিত্তি-আঁকা চিত্র যত

    আলোক দেখি লজ্জাহত

        পালাতে নাহি পারে।

শরমে দীপ মলিন একেবারে।

যে গান আমি নারিনু রচিবারে

সে গান আজি উঠিল চারি ধারে।

    আমার দীপ জ্বালিল রবি,

    প্রকৃতি আসি আঁকিল ছবি,

    গাঁথিল গান শতেক কবি

        কতই ছন্দ-হারে।

কী গান আজি উঠিল চারি ধারে।

দেউলে মোর দুয়ার গেল খুলি–

ভিতরে আর বাহিরে কোলাকুলি,

    দেবের করপরশ লাগি

    দেবতা মোর উঠিল জাগি,

    বন্দী নিশি গেল সে ভাগি

        আঁধার পাখা তুলি।

দেউলে মোর দুয়ার গেল খুলি।

 

Romanized Version

Deul

Rachiyachhinu deul ekhāni
Anek dine anek dukh māni’.
Rakheni tāra jānālā dwār,
Sakal dik andhakār,
Bhūdhar h’te pāṣāṇ bhār
Jatane bahi’ āni’॥

Rachiyachhinu deul ekhāni.

Debatāṭire basāye majhkhāne
Chhilām cheye tāhāri mukhpāne.
Bāhire pheli e tribhuban
Bhuliya giyā bishwajan
Dheyān tāri anukṣaṇ
Karechhi ek prāṇe,

Debatāṭire basāye majhkhāne.

Jāpan kari anantahin rāti
Jwālāye śata gandhamaya bāti.
Kanakamaṇi-pātrapute
Surabhi dhūpadhūmra uṭhe,
Guru agarū-gandha chhuṭe,
Parān uṭhe māti॥

Jāpan kari anantahin rāti.

Nidrāhīn basiyā ek chite
Chitra kata enkechhi chāri bhite.
Swapnasama chamatkār,
Kothāo nāhi upamā tār—
Kata baran, kata ākār
Ke pāre baranite॥

Chitra jata enkechhi chāri bhite.

Chitra jata enkechhi chāri bhite.

Stambhaguli jaṛāye śata pāke
Nāgabālikā phaṇā tuliyā thāke.
Upare ghiri chāriṭi dhār
Daityaguli bikaṭākār,
Pāṣāṇamaya chhāder bhār
Māthāy dhari rākhe॥

Nāgabālikā phaṇā tuliyā thāke.

Sṛṣṭichhāṛā sṛjan kata mato.
Pakṣīrāj uṛichhe śata śata.
Phuler mato latār mājhe
Nārīr mukh bikaśi rājē
Praṇayabharā binaye lāje
Nayan kari nata.

Sṛṣṭichhāṛā sṛjan kata mato.

Dhwaniṭa ei dhārār mājhkhāne
Śudhu e gṛha śabda nāhi jāne.
Byāghrājina-āsan pāti
Bibidh rūp chhanda gāthi
Mantra paṛi dibas rāti
Guñjarita tāne,

Śabda-hīn gṛher mājhkhāne.

Emon kare giyechhe kata din,
Jāni ne kichhu, āchhi āpan-līn.
Chitta mor nimeṣahata
Ūrdhwamukhī śikhār mato,
Śarīrkhaṇi mūrchhāhata
Bhāber tāpe kṣīṇ.

Emon kare giyechhe kata din.

Ekadā ek biṣam ghor sware
Bajra āsi paṛil mor ghare.
Bedanā ek tīkṣṇatam
Paśil giyē hṛdaye mama,
Agnimaya sarpasama
Kāṭil antare.

Bajra āsi paṛil mor ghare.

Pāṣāṇarāśi sahasā gelo ṭuṭi,
Gṛher mājhe dibas uṭhe phuṭi.
Nīrab dhyān kariyā chur
Kaṭhin bā̃dh kariyā dūr
Saṁsārer aśeṣ sur
Bhitorē el chhuṭi.

Pāṣāṇarāśi sahasā gelo ṭuṭi.

Debatā-pāne chāhinū ekbār,
Ālok āsi paṛechhe mukhe tãr.
Nūtan ek mahimārāśi
Lalāṭe tãr uṭhechhe bhāsi,
Jāgichhe ek prasādahāsi
Adhar-chāridhār.

Debatā-pāne chāhinū ekbār.

Śarame dīp malin ekebāre
Lukāte chāhe chir-andhakāre.
Śikole bãdhā swapnamato
Bhitti-ãkā chitra jata
Ālok dekhi lajjāhata
Pālāte nāhi pāre.

Śarame dīp malin ekebāre.

Je gān āmi nārinu rachibāre
Se gān āji uṭhil chāri dhāre.
Āmār dīp jwālil Rabi,
Prakṛti āsi ãkil chhabi,
Gãthil gān śatek kabi
Kata-i chhanda-hāre.

Kī gān āji uṭhil chāri dhāre.

Deule mor duār gelo khuli—
Bhitorē ār bāhire kolākuli,
Deber karaparaś lāgi
Debatā mor uṭhil jāgi,
Bandī niśi gelo se bhāgi
ãdhār pākhā tuli.

Deule mor duār gelo khuli.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

‘দেউল’ মূলত আত্মনির্মিত জগতের সীমাবদ্ধতা ভেঙে বৃহত্তর জীবন ও বিশ্বসত্তার সঙ্গে মিলনের কবিতা। কবিতার ‘দেউল’কে একটি বহুমাত্রিক প্রতীক হিসেবে পড়া যায়।

১. নিজের হাতে নির্মিত অন্তর্জগৎ

কবিতার শুরুতেই কবি বলেন—

“রচিয়াছিনু দেউল একখানি
অনেক দিনে অনেক দুখ মানি’।”

এই দেউল সহজে তৈরি হয়নি। দীর্ঘ সাধনা, শ্রম, কষ্ট ও আত্মনিবেদনের মধ্য দিয়ে কবি এটি নির্মাণ করেছেন। এখানে শিল্পীর নিজের সৃষ্ট জগতের প্রতীক খুঁজে পাওয়া যায়।

২. আত্মনিমগ্নতার অন্ধকার

দেউলের কোনো জানালা-দরজা নেই। চারদিকে অন্ধকার। কবি ত্রিভুবন ও বিশ্বজনকে বাইরে রেখে কেবল নিজের দেবতার দিকে তাকিয়ে আছেন।

“বাহিরে ফেলি এ ত্রিভুবন
ভুলিয়া গিয়া বিশ্বজন”

এখানে সাধনা যেমন আছে, তেমনি আত্মনিমগ্নতার একটি সীমাবদ্ধতাও আছে। বাইরের জীবনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে কেবল নিজের নির্মিত সৌন্দর্যের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে থাকা শেষ পর্যন্ত পূর্ণতা দেয় না।

৩. শিল্পের অপরিসীম সৌন্দর্য

দেউলের ভিতরে কবি সৃষ্টি করেছেন অসংখ্য চিত্র, ভাস্কর্য ও অলংকরণ। নাগবালিকা, দৈত্য, পক্ষীরাজ, লতা, নারী-মুখ—সব মিলিয়ে এটি যেন এক কল্পলোক।

“সৃষ্টিছাড়া সৃজন কত মতো।
পক্ষীরাজ উড়িছে শত শত।”

এই অংশে রবীন্দ্রনাথ শিল্পীর কল্পনাশক্তির অসীম সম্ভাবনা দেখিয়েছেন। কিন্তু এই সৌন্দর্য তখনও বন্ধ ঘরের ভিতরে আবদ্ধ।

৪. নিঃশব্দ সাধনা ও আত্মবিস্মৃতি

দেউলের ভিতর মন্ত্রপাঠ, ধ্যান, সুগন্ধ, প্রদীপ ও চিত্রসৃষ্টির মধ্য দিয়ে কবি নিজের অস্তিত্বকে ক্রমে ক্ষীণ করে ফেলেছেন।

“চিত্ত মোর নিমেষহত
ঊর্ধ্বমুখী শিখার মতো,
শরীরখানি মূর্ছাহত
ভাবের তাপে ক্ষীণ।”

এখানে সাধনা একদিকে উচ্চতর চেতনার দিকে ওঠার প্রয়াস, অন্যদিকে বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ইঙ্গিত।

৫. বজ্রাঘাতের প্রতীক

কবিতার মোড় পরিবর্তন হয় বজ্রাঘাতে—

“একদা এক বিষম ঘোর স্বরে
বজ্র আসি পড়িল মোর ঘরে।”

এই বজ্র কেবল প্রাকৃতিক ঘটনা নয়; এটি একটি গভীর অন্তর্দৈহিক বা অস্তিত্বগত অভিঘাতের প্রতীক হিসেবে পাঠ করা যায়। যে আঘাত প্রথমে বেদনা সৃষ্টি করে, শেষ পর্যন্ত সেটিই বন্দিত্ব ভেঙে দেয়।

৬. পাথরের দেয়াল ভেঙে আলোর প্রবেশ

বজ্রাঘাতের পর—

“পাষাণরাশি সহসা গেল টুটি,
গৃহের মাঝে দিবস উঠে ফুটি।”

এখানে ‘দিবস’ হলো আলো, জীবন ও মুক্তির প্রতীক। এতদিন যে দেউল বাইরের পৃথিবীকে প্রত্যাখ্যান করেছিল, তার প্রাচীর ভেঙে এখন সংসারের “অশেষ সুর” ভিতরে প্রবেশ করে।

৭. দেবতার নতুন প্রকাশ

দেউলের দেবতাও যেন আলো আসার সঙ্গে সঙ্গে নতুনভাবে প্রকাশিত হন—

“নূতন এক মহিমারাশি
ললাটে তাঁর উঠেছে ভাসি,
জাগিছে এক প্রসাদহাসি
অধর-চারিধার।”

অর্থাৎ দেবতা বদলাননি; বদলে গেছে তাঁকে দেখার পরিবেশ ও দৃষ্টিভঙ্গি। অন্ধকারের মধ্যে যে দেবতা সীমাবদ্ধ ছিলেন, আলোর মধ্যে তাঁর মহিমা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশিত হয়।

৮. ব্যক্তিগত শিল্প বনাম বৃহত্তর সৃষ্টিজগৎ

কবিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ—

“আমার দীপ জ্বালিল রবি,
প্রকৃতি আসি আঁকিল ছবি,
গাঁথিল গান শতেক কবি
কতই ছন্দ-হারে।”

কবি উপলব্ধি করেন, যে গান তিনি নিজের দেউলের ভিতরে সৃষ্টি করতে পারেননি, বৃহত্তর প্রকৃতি ও মানবসমাজ সেই গান বহির্বিশ্বে সৃষ্টি করে চলেছে। ব্যক্তিগত সৃষ্টিশীলতা তখন বিশ্বসৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

৯. দেউলের দ্বার খুলে যাওয়া

শেষ স্তবকে কবিতার সমগ্র প্রতীকী যাত্রা সম্পূর্ণ হয়—

“দেউলে মোর দুয়ার গেল খুলি—
ভিতরে আর বাহিরে কোলাকুলি,”

এই ‘কোলাকুলি’ই কবিতার কেন্দ্রীয় মুক্তি। ভিতর ও বাহির, ব্যক্তি ও বিশ্ব, সাধনা ও জীবন, শিল্প ও প্রকৃতি—সবকিছুর মধ্যে বিচ্ছেদ আর থাকে না।

কবিতাটির দার্শনিক তাৎপর্য

‘দেউল’-কে একটি আত্মনির্মিত সত্তার প্রতীক হিসেবে দেখলে কবিতাটির দার্শনিক তাৎপর্য আরও স্পষ্ট হয়। মানুষ তার নিজের বিশ্বাস, সৌন্দর্য, আদর্শ, সাধনা ও সৃষ্টিকে কেন্দ্র করে একটি জগৎ নির্মাণ করতে পারে। কিন্তু সেই জগৎ যদি সম্পূর্ণভাবে বাইরের জীবন থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে, তবে তা ধীরে ধীরে কারাগারে পরিণত হতে পারে।

কবিতার ‘বজ্র’ সেই আত্মনির্মিত প্রাচীরের ভাঙনের প্রতীক। আঘাতের ফলে যে বেদনা আসে, তার মধ্য দিয়েই আলো প্রবেশ করে। ফলে ধ্বংস এখানে শেষ নয়; বরং নতুন উপলব্ধির সূচনা।

শেষ পর্যন্ত কবির দেউলের দরজা খুলে যায়। ভিতর ও বাহিরের মিলন ঘটে। এই জায়গাতেই ‘দেউল’ ব্যক্তিগত সাধনার কবিতা থেকে বৃহত্তর মানবিক ও দার্শনিক কবিতায় পরিণত হয়।

‘দেউল’ কবিতার কয়েকটি প্রধান প্রতীক

  • দেউল — মানুষের নির্মিত আত্মজগৎ, সাধনার স্থান এবং একই সঙ্গে সম্ভাব্য বন্দিত্ব।
  • দেবতা — আরাধ্য সত্য, সৌন্দর্য বা পরম সত্তা।
  • অন্ধকার — আত্মবদ্ধতা ও সীমাবদ্ধ উপলব্ধি।
  • জানালা-দরজাহীনতা — বাইরের জগত থেকে বিচ্ছিন্নতা।
  • বজ্র — আকস্মিক অভিঘাত, জাগরণ ও পরিবর্তনের শক্তি।
  • পাষাণরাশি — আত্মনির্মিত কঠিন প্রাচীর।
  • আলো/দিবস — জ্ঞান, জীবন, মুক্তি ও বৃহত্তর উপলব্ধি।
  • রবি — বহির্জগতের প্রাণশক্তি ও আলোর উৎস।
  • প্রকৃতি — ব্যক্তিগত সৃষ্টির ঊর্ধ্বে বৃহত্তর সৃষ্টিশক্তি।
  • দেউলের খোলা দরজা — ব্যক্তি ও বিশ্বজীবনের মিলন।

কবিতাটির সারকথা

‘দেউল’ আমাদের দেখায়—নিজের হাতে নির্মিত সৌন্দর্য যতই নিখুঁত হোক, জীবনকে সম্পূর্ণভাবে ধারণ করতে হলে তার দরজা খুলতে হয়। আত্মসাধনা প্রয়োজন, কিন্তু আত্মবন্দিত্ব নয়। শিল্প প্রয়োজন, কিন্তু শিল্পকে জীবনের বৃহত্তর প্রবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন করলে তার পূর্ণতা আসে না।

বজ্রাঘাতে দেউল ভেঙে যায়, কিন্তু সেই ভাঙনের মধ্য দিয়েই আলো প্রবেশ করে। তাই এই কবিতায় ধ্বংসই শেষ পর্যন্ত মুক্তির পথ খুলে দেয়। শেষের “ভিতরে আর বাহিরে কোলাকুলি” ব্যক্তিমানুষ ও বিশ্বজীবনের এক গভীর মিলনের প্রতীক।

উৎস

  • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সোনার তরী — প্রাচীন পাঠ ও পৃষ্ঠা-নথি।
  • সোনার তরী কাব্যগ্রন্থের বিভিন্ন সংস্করণের তথ্য, উইকিসংকলন।
  • রবীন্দ্রনাথের পাণ্ডুলিপি, Bichitra Tagore Electronic Hypertext Project, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়।
  • দেউল, Tagoreweb-এর সংরক্ষিত রবীন্দ্র-কবিতা পাঠ।

মন্তব্য করুন