কথা কাব্যগ্রন্থের শেষ শিক্ষা কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ইতিহাস-আশ্রিত আখ্যানকাব্যগ্রন্থ ‘কথা’-র একটি অত্যন্ত নাটকীয়, মনস্তাত্ত্বিক ও আত্মবলিদানের গৌরবগাথা হলো ‘শেষ শিক্ষা’। শিখ জাতির দশম গুরু গোবিন্দ সিংহের জীবনের এক কাল্পনিক বা পৌরাণিক আখ্যানকে ভিত্তি করে রচিত এই কবিতায় দেখা যায়—অন্যায় ক্রোধে সংঘটিত একটি অতীতের পাপস্খলনের জন্য কীভাবে তিনি নিজের স্নেহধন্য পালিত শিষ্যের হাতেই আত্মবলিদানের পথ প্রস্তুত করেছিলেন এবং শিষ্যের পৌরুষকে জাগ্রত করে নিজের জীবনের শেষ শিক্ষাটি দিয়ে গিয়েছিলেন।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামশেষ শিক্ষা
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থকথা (পরবর্তীতে ‘কথা ও কাহিনী’ সংকলনভুক্ত)
রচনাকাল/প্রকাশের বছর১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দ (১৩০৬ বঙ্গাব্দ)
কবিতার আঙ্গিক ও ধরনঐতিহাসিক আখ্যান-কবিতা ও ট্র্যাজিক বীরত্বগাথা (Narrative Ballad / Dramatic Monologue)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৩০৬ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত ‘কথা’ কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ বৌদ্ধ, শিখ ও মারাঠা ইতিহাসের বীরত্ব ও আত্মত্যাগের আখ্যানগুলোকে নতুন নৈতিক ব্যঞ্জনায় রূপায়িত করেন। গুরু গোবিন্দ সিংহ একদা ক্ষণিক ক্রোধের বশে ঘোড়ার দাম চাওয়া এক পাঠানকে হত্যা করেছিলেন। নিজের লক্ষ্যচ্যুত এই অন্যায়ের প্রায়শ্চিত্ত করতে তিনি সেই নিহত পাঠানের শিশুপুত্র মামুদকে পরম স্নেহে শাস্ত্র ও শস্ত্রবিদ্যায় শিক্ষিত করে তোলেন। কিন্তু কেবল স্নেহের বন্ধনই শেষ কথা নয়—পিতৃঘাতকের ওপর প্রতিশোধ নেওয়া যে ক্ষাত্রধর্ম ও পৌরুষের দাবি, গুরু মামুদের অন্তরে সেই সুপ্ত পৌরুষকে জাগিয়ে তুলতে চাইলেন। প্রথমবার ব্যর্থ হলেও দ্বিতীয়বার দাবা খেলার আসরে তাকে ‘কাপুরুষ’ বলে আঘাত করে তিনি শিষ্যের রক্তকে প্রজ্বলিত করেন। অবশেষে শিষ্যের ছুরিকাঘাতে প্রাণ বিসর্জন দিয়ে গুরু হাসিমুখে তাঁর জীবনের ‘শেষ শিক্ষা’ সমাপ্ত করেন।

একদিন শিখগুরু গোবিন্দ নির্জনে সম্পূর্ণ কবিতা:

একদিন শিখগুরু গোবিন্দ নির্জনে

একাকী ভাবিতেছিলা আপনার মনে

আপন জীবনকথা; সে সংকল্পলেখা

অখণ্ড সম্পূর্ণরূপে দিয়েছিল দেখা

যৌবনের স্বর্ণপটে, যে আশা একদা

ভারত গ্রাসিয়াছিল, সে আজি শতধা,

সে আজি সংকীর্ণ শীর্ণ সংশয়সংকুল,

সে আজি সংকটমগ্ন। তবে একি ভুল!

তবে কি জীবন ব্যর্থ! দারুণ দ্বিধায়

শ্রান্তদেহে ক্ষুব্ধচিত্তে আঁধার সন্ধ্যায়

গোবিন্দ ভাবিতেছিল ; হেনকালে এসে

পাঠান কহিল তাঁরে, “যাব চলি দেশে,

ঘোড়া-যে কিনেছ তুমি দাও তার দাম।’

কহিল গোবিন্দ গুরু, “শেখজি, সেলাম,

মূল্য কালি পাবে, আজি ফিরে যাও ভাই।’

পাঠান কহিল রোষে, “মূল্য আজই চাই।’

এত বলি জোর করি ধরি তাঁর হাত–

চোর বলি দিল গালি। শুনি অকস্মাৎ

গোবিন্দ বিজুলি-বেগে খুলি নিল অসি,

পলকে সে পাঠানের মুণ্ড গেল খসি;

রক্তে ভেসে গেল ভূমি। হেরি নিজকাজ

মাথা নাড়ি কহে গুরু, “বুঝিলাম আজ

আমার সময় গেছে। পাপ তরবার

লঙ্ঘন করিল আজি লক্ষ্য আপনার

নিরর্থক রক্তপাতে। এ বাহুর ‘পরে

বিশ্বাস ঘুচিয়া গেল চিরকালতরে।

ধুয়ে মুছে যেতে হবে এ পাপ, এ লাজ–

আজ হতে জীবনের এই শেষ কাজ।’

পুত্র ছিল পাঠানের বয়স নবীন,

গোবিন্দ লইল তারে ডাকি। রাত্রিদিন

পালিতে লাগিল তারে সন্তানের মতো

চোখে চোখে। শাস্ত্র আর শস্ত্রবিদ্যা যত

আপনি শিখালো তারে। ছেলেটির সাথে

বৃদ্ধ সেই বীরগুরু সন্ধ্যায় প্রভাতে

খেলিত ছেলের মতো। ভক্তগণ দেখি

গুরুরে কহিল আসি, “একি প্রভু, একি!

আমাদের শঙ্কা লাগে। ব্যাঘ্রশাবকেরে

যত যত্ন কর, তার স্বভাব কি ফেরে?

যখন সে বড়ো হবে তখন নখর,

গুরুদেব, মনে রেখো হবে সে প্রখর।’

গুরু কহে, “তাই চাই, বাঘের বাচ্ছারে

বাঘ না করিনু যদি কী শিখানু তারে?’

বালক যুবক হল গোবিন্দের হাতে

দেখিতে দেখিতে। ছায়া-হেন ফিরে সাথে,

পুত্র-হেন করে তাঁর সেবা। ভালোবাসে

প্রাণের মতন–সদা জেগে থাকে পাশে

ডান হস্ত যেন। যুদ্ধে হয়ে গেছে গত

শিখগুরু গোবিন্দের পুত্র ছিল যত–

আজি তাঁর প্রৌঢ়কালে পাঠানতনয়

জুড়িয়া বসিল আসি শূন্য সে হৃদয়

গুরুজির। বাজে-পোড়া বটের কোটরে

বাহির হইতে বীজ পড়ি বায়ুভরে

বৃক্ষ হয়ে বেড়ে বেড়ে কবে ওঠে ঠেলি,

বৃদ্ধ বটে ঢেকে ফেলে ডালপালা মেলি।

একদা পাঠান কহে নমি গুরু-পায়,

“শিক্ষা মোর সারা হল চরণকৃপায়,

এখন আদেশ পেলে নিজভুজবলে

উপার্জন করি গিয়া রাজসৈন্যদলে।’

গোবিন্দ কহিলা তার পিঠে হাত রাখি,

“আছে তব পৌরুষের এক শিক্ষা বাকি।’

পরদিন বেলা গেলে গোবিন্দ একাকী

বাহিরিলা; পাঠানেরে কহিলেন ডাকি,

“অস্ত্র হাতে এসো মোর সাথে।’ ভক্তদল

“সঙ্গ যাব’ “সঙ্গ যাব’ করে কোলাহল–

গুরু কন, “যাও সবে ফিরে।’

                             দুই জনে

কথা নাই ধীরগতি চলিলেন বনে

নদীতীরে। পাথর-ছড়ানো উপকূলে

বরষার জলধারা সহস্র আঙুলে

কেটে গেছে রক্তবর্ণ মাটি। সারি সারি

উঠেছে বিশাল শাল, তলায় তাহারি

ঠেলাঠেলি ভিড় করে শিশু তরুদল

আকাশের অংশ পেতে। নদী হাঁটুজল

ফটিকের মতো স্বচ্ছ, চলে এক ধারে

গেরুয়া বালির কিনারায়। নদীপারে

ইশারা করিল গুরু; পাঠান দাঁড়ালো।

নিবে-আসা দিবসের দগ্ধ রাঙা আলো

বাদুড়ের পাখা-সম দীর্ঘ ছায়া জুড়ি

পশ্চিমপ্রান্তর-পারে চলেছিল উড়ি

নিঃশব্দ আকাশে। গুরু কহিলা পাঠানে,

“মামুদ, হেথায় এসো, খোঁড়ো এইখানে।’

উঠিল সে বালু খুঁড়ি একখণ্ড শিলা

অঙ্কিত লোহিত রাগে। গোবিন্দ কহিলা,

“পাষাণে এই যে রাঙা দাগ, এ তোমার

আপন বাপের রক্ত। এইখানে তার

মুণ্ড ফেলেছিনু কেটে, না শুধিয়া ঋণ,

না দিয়া সময়। আজি আসিয়াছে দিন,

রে পাঠান, পিতার সুপুত্র হও যদি

খোলো তরবার–পিতৃঘাতকেরে বধি

উষ্ণ রক্ত-উপহারে করিবে তর্পণ

তৃষাতুর প্রেতাত্মার।’ বাঘের মতন

হুংকারিয়া লম্ফ দিয়া রক্তনেত্রে বীর

পড়িল গুরুর ‘পরে; গুরু রহে স্থির

কাঠের মূর্তির মতো। ফেলি অস্ত্রখান

তখনি চরণে তাঁর পড়িল পাঠান।

কহিল, “হে গুরুদেব, লয়ে শয়তানে

কোরো না এমনতরো খেলা। ধর্ম জানে

ভুলেছিনু পিতৃরক্তপাত; একাধারে

পিতা গুরু বন্ধু বলে জেনেছি তোমারে

এতদিন। ছেয়ে থাক্‌ মনে সেই স্নেহ,

ঢাকা পড়ে হিংসা যাক মরে। প্রভু, দেহো

পদধূলি।’ এত বলি বনের বাহিরে

ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে গেল, না চাহিল ফিরে,

না থামিল একবার। দুটি বিন্দু জল

ভিজাইল গোবিন্দের নয়নযুগল।

পাঠান সেদিন হতে থাকে দূরে দূরে।

নিরালা শয়নঘরে জাগাতে গুরুরে

দেখা নাহি দেয় ভোরবেলা। গৃহদ্বারে

অস্ত্র হাতে নাহি থাকে রাতে। নদীপারে

গুরু-সাথে মৃগয়ায় নাহি যায় একা।

নির্জনে ডাকিলে গুরু দেয় না সে দেখা।

একদিন আরম্ভিল শতরঞ্চ খেলা

গোবিন্দ পাঠান-সাথে। শেষ হল বেলা

না জানিতে কেহ। হার মানি বারে বারে

মাতিছে মামুদ। সন্ধ্যা হয়, রাত্রি বাড়ে।

সঙ্গীরা যে যার ঘরে চলে গেল ফিরে।

ঝাঁ ঝাঁ করে রাতি। একমনে হেঁটশিরে

পাঠান ভাবিছে খেলা। কখন হঠাৎ

চতুরঙ্গ বল ছুঁড়ি করিল আঘাত

মামুদের শিরে গুরু; কহে অট্টহাসি,

“পিতৃঘাতকের সাথে খেলা করে আসি

এমন যে কাপুরুষ, জয় হবে তার!’

তখনি বিদ্যুৎ-হেন ছুরি খরধার

খাপ হতে খুলি লয়ে গোবিন্দের বুকে

পাঠান বিঁধিয়া দিল। গুরু হাসিমুখে

কহিলেন, “এতদিনে হল তোর বোধ

কী করিয়া অন্যায়ের লয় প্রতিশোধ।

শেষ শিক্ষা দিয়ে গেনু–আজি শেষবার

আশীর্বাদ করি তোরে হে পুত্র আমার।’

Ekdin shikhguru Gobindo nirjone kobitar Romanized Version:

Ekdin shikhguru Gobindo nirjone

Ekaki bhabitechhila aponar mone

Apon jibonkotha; she shongkolpolekha

Okhondo shompurnorupe diyechhilo dekha

Jouboner shwornopote, je asha ekoda

Bharot grasiyechhilo, she aji shotodha,

She aji shongkirno shirno shongshoy-shongkul,

She aji shongkotmogno. Tobe eki bhul!

Tobe ki jibon byarttho! Darun dwidhay

Shrantodehe khubdhochitte andhar shondhyay

Gobindo bhabitechhilo; henokale eshe

Pathan kohilo tanre, “Jabo choli deshe,

Ghora-je kinechho tumi dao tar dam.’

Kohilo Gobindo guru, “Shekhji, selam,

Mullo kali pabe, aji phire jao bhai.’

Pathan kohilo roshe, “Mullo aji chai.’

Eto boli jor kori dhori tanr hat–

Chor boli dilo gali. Shuni okossmat

Gobindo bijuli-bege khuli nilo osi,

Poloke she pathaner mundo gelo khoshi;

Rôkte bheshe gelo bhumi. Heri nijokaj

Matha nari kohe guru, “Bujhilam aj

Amar shomoy gechhe. Pap torobar

Longghon korilo aji lokkho aponar

Nirortthok roktopate. E bahur ‘pore

Bisshash ghuchiya gelo chirokalotore.

Dhuye muchhe jete hobe e pap, e laj–

Aj hote jiboner ei shesh kaj.’

Putro chhilo pathaner boyosh nobin,

Gobindo loilo tare daki. Ratridin

Palite lagilo tare shontaner moto

Chokhe chokhe. Shastro ar shostrobidya joto

Aponi shikhalo tare. Chheletir shathe

Briddho shei birguru shondhyay probhate

Khelito chheler moto. Bhoktogon dekhi

Gurure kohilo ashi, “Eki probhu, eki!

Amader shongka lage. Baghrôshabokere

Joto jotno koro, tar shobhab ki phere?

Jokhon she boro hobe tokhon nokhor,

Gurudeb, mone rekho hobe she prokhor.’

Guru kohe, “Tai chai, bagher bachchhare

Bagh na korinu jodi ki shikhanu tare?’

Balok jubok holo Gobinder hate

Dekhite dekhite. Chhaya-heno phire shathe,

Putro-heno kore tanr sheba. Bhalobashe

Praner moton–shoda jege thake pashe

Dan hosto jeno. Juddhe hoye gechhe goto

Shikhguru Gobinder putro chhilo joto–

Aji tanr proudhokale pathantonoy

Juriya boshilo ashi shunno she hridoy

Gurujir. Baje-pora boter kotore

Bahir hoite bij pori bayubhore

Brikkho hoye bere bere kobe othe theli,

Briddho bote dheke phele dalpala meli.

Ekoda pathan kohe nomi guru-pay,

“Shikkha mor shara holo choronkripay,

Ekhon adesh pele nijbhujobole

Uparjon kori giya rajsoinyodole.’

Gobindo kohila tar pithe hat rakhi,

“Achhe tobo pourusher ek shikkha baki.’

Porodin bela gele Gobindo ekaki

Bahirila; pathanere kohilen daki,

“Ostro hate esho mor shathe.’ Bhoktodol

“Shonggo jabo’ “Shonggo jabo’ kore kolahol–

Guru kon, “Jao shobe phire.’

Dui jone

Kotha nai dhiragoti cholilen bone

Noditire. Pathor-chhorano upokule

Borshar joldhara shohosro angule

Kete gechhe roktoborno mati. Shari shari

Uthechhe bishal shal, tolay tahari

Thelatheli bhir kore shishu torudol

Akasher ongsho pete. Nodi hatujol

Photiker moto shwocchho, chole ek dhare

Gerua balir kinaray. Nodipare

Ishara korilo guru; pathan danralo.

Nibe-asha dibosher dogdho ranga alo

Badurer pakha-shomo dirgho chhaya juri

Poshchimprantor-pare cholechhilo uri

Nisshobdo akashe. Guru kohila pathane,

“Mamud, hethay esho, khonro eikhane.’

Uthhilo she balu khunri ekkhondo shila

Ongkito lohito rage. Gobindo kohila,

“Pashane ei je ranga dag, e tomar

Apon baper rôkto. Eikhane tar

Mundo phelechhinu kete, na shodhiya rin,

Na diya shomoy. Aji ashiyachhe din,

Re pathan, pitar shuputro hou jodi

Kholo torobar–pitrighatokere bodhi

Ushno rôkto-upohare koribe torpon

Trishatur pretatmar.’ Bagher moton

Hunkariya lompho diya roktonetre bir

Porilo gurur ‘pore; guru rohe sthir

Kather murtir moto. Pheli ostrokhan

Tokhoni chorone tanr porilo pathan.

Kohilo, “He gurudeb, loye shoytane

Koro na emonotoro khela. Dhormo jane

Bhulechhinu pitrorôktopat; ekadhare

Pita guru bondhu bole jenechhi tomare

Etodin. Chheye thak mone shei sneho,

Dhaka pore hingsha jak more. Probhu, deho

Pododhuli.’ Eto boli boner bahire

Urdhdhoshwashe chhute gelo, na chahilo phire,

Na thamilo ekbar. Duti bindu jol

Bhijailo Gobinder noyonojugol.

Pathan sedin hote thake dure dure.

Nirala shoyonghore jagate gurure

Dekha nahi dey bhorbela. Grihodware

Ostro hate nahi thake rate. Nodipare

Guru-shathe mrigoyay nahi jay eka.

Nirjone dakile guru dey na she dekha.

Ekdin arombhilo shotoroncho khela

Gobindo pathan-shathe. Shesh holo bela

Na janite keho. Har mani bare bare

Maticheh Mamud. Shondhya hoy, ratri bare.

Shonggira je jar ghore chole gelo phire.

Jhan jhan kore rati. Ekomone hentshire

Pathan bhabichhe khela. Kokhon hothat

Choturongo bol chhunri korilo aghat

Mamuder shire guru; kohe ottohashi,

“Pitrighatoker shathe khela kore ashi

Emon je kapurush, joy hobe tar!’

Tokhoni biddyut-heno chhuri khorodhar

Khap hote khuli loye Gobinder buke

Pathan bindhiya dilo. Guru hashimukhe

Kohilen, “Etodine holo tor bodh

Ki koriya onnayer loy protishodh.

Shesh shikkha diye genu–aji sheshbar

Ashirbad kori tore he putro amar.’

 

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • অনুতাপ ও প্রায়শ্চিত্তের সংকল্প:
    “পাপ তরবার / লঙ্ঘন করিল আজি লক্ষ্য আপনার / নিরর্থক রক্তপাতে। এ বাহুর ‘পরে / বিশ্বাস ঘুচিয়া গেল চিরকালতরে। / ধুয়ে মুছে যেতে হবে এ পাপ, এ লাজ– / আজ হতে জীবনের এই শেষ কাজ।”
    — গুরু গোবিন্দ সিংহের মতো মহান ধর্মবীর ও নেতার কাছে একটি নিরপরাধ বা ক্ষুব্ধ পাওনাদারকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা ছিল চরম নৈতিক পতন। তিনি বুঝলেন তাঁর বীরত্ব লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে। তাই এই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতেই তিনি নিহত ব্যক্তির সন্তানকে নিজের সন্তানের মতো প্রতিপালন শুরু করেন।
  • স্নেহ বনাম ক্ষাত্রধর্মের দ্বন্দ্ব:
    “হে গুরুদেব, লয়ে শয়তানে / কোরো না এমনতরো খেলা। ধর্ম জানে / ভুলেছিনু পিতৃরক্তপাত; একাধারে / পিতা গুরু বন্ধু বলে জেনেছি তোমারে / এতদিন। ছেয়ে থাক্‌ মনে সেই স্নেহ, / ঢাকা পড়ে হিংসা যাক মরে।”
    — গুরুর পিতৃস্নেহ ও শিক্ষার কারণে মামুদ পিতার হত্যার প্রতিশোধ ভুলে গুরুকে পিতার মর্যাদায় বসিয়েছিল। কিন্তু গুরুর দৃষ্টিতে অন্যায়ের বিচার ও প্রতিশোধ গ্রহণ না করা পৌরুষহীনতার লক্ষণ। তাই মামুদের অন্তরে ক্ষমা ও স্নেহের যে জয় হয়েছিল, গুরু তাকে সম্পূর্ণ অনুমোদন করতে পারেননি; তিনি চেয়েছিলেন মামুদ প্রকৃত বীর হয়ে অন্যায়ের শাস্তি দিক।
  • চূড়ান্ত আত্মদান ও শেষ শিক্ষা:
    “চতুরঙ্গ বল ছুঁড়ি করিল আঘাত / মামুদের শিরে গুরু; কহে অট্টহাসি, / ‘পিতৃঘাতকের সাথে খেলা করে আসি / এমন যে কাপুরুষ, জয় হবে তার!’ … গুরু হাসিমুখে / কহিলেন, ‘এতদিনে হল তোর বোধ / কী করিয়া অন্যায়ের লয় প্রতিশোধ।'”
    — মামুদকে কাপুরুষ বলে তীব্র অপমানে আঘাত করার পরই তার সুপ্ত তেজ জেগে ওঠে এবং সে গুরুর বুকে ছুরি বসিয়ে দেয়। গুরু এই মৃত্যুকে স্বেচ্ছায় বরণ করেন, কারণ এর মধ্য দিয়ে দুটি কাজ সম্পন্ন হলো—প্রথমত, গুরুর অতীতের পাপের প্রায়শ্চিত্ত হলো; দ্বিতীয়ত, শিষ্যকে তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে আঘাত হানার অন্তিম বীরত্ব শিক্ষা দিয়ে যেতে পারলেন।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, চরণবিন্যাস ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (কথা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন