বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কড়ি ও কোমল’ কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম গভীর, ভাবগম্ভীর ও রোমান্টিক রচনা হলো ‘সমুদ্র’। কবির যুবক বয়সের সৃজনশীল উচ্ছ্বাস, সৌন্দর্যচেতনা এবং সংগীতময় অনুভূতির এক অপূর্ব প্রকাশ ঘটেছে এই কবিতায়। সমুদ্রের বিশালতা, গর্জন, অন্তহীনতা এবং রহস্যময় আকর্ষণকে কবি কেবল প্রকৃতির একটি বাস্তব চিত্র হিসেবে তুলে ধরেননি, বরং এর মাধ্যমে মানবমনের অন্তর্গত গূঢ় বেদনা, অতৃপ্তি ও অবরুদ্ধ বাসনাগুলোর এক নিখুঁত রূপক ফুটিয়ে তুলেছেন।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | সমুদ্র |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | কড়ি ও কোমল |
| কবিতার ধরন | প্রতীকী ও দার্শনিক লিরিক কবিতা (Symbolic and Philosophical Lyrical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
১৮৮৬ সালে (বাংলা ১৩০৩ বা ১৩০৭ সংস্করণ অনুযায়ী) প্রকাশিত ‘কড়ি ও কোমল’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্যযাত্রার এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। এই গ্রন্থের কবিতায় কবি জীবনের জয়গান গেয়েছেন এবং একই সাথে মানবজীবনের দুঃখ, সুখ, অতৃপ্তি ও অন্তর্জগতের গভীরতম অনুভূতিগুলোকে শব্দের জাদুতে রূপ দিয়েছেন। ‘সমুদ্র’ কবিতায় সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গমালার মধ্য দিয়ে মানুষের অন্তরের চিরন্তন ব্যাকুলতা এবং বিশ্বপ্রকৃতির সাথে মানবহৃদয়ের সুগভীর যোগসূত্র অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
সমুদ্র – সম্পূর্ণ কবিতা
কিসের অশান্তি এই মহাপারাবারে,
সতত ছিঁড়িতে চাহে কিসের বন্ধন!
অব্যক্ত অস্ফুট বাণী ব্যক্ত করিবারে
শিশুর মতন সিন্ধু করিছে ক্রন্দন।
যুগ-যুগান্তর ধরি যোজন যোজন
ফুলিয়া ফুলিয়া উঠে উত্তাল উচ্ছ্বাস–
অশান্ত বিপুল প্রাণ করিছে গর্জন,
নীরবে শুনিছে তাই প্রশান্ত আকাশ।
আছাড়ি চূর্ণিতে চাহে সমগ্র হৃদয়
কঠিন পাষাণময় ধরণীর তীরে,
জোয়ারে সাধিতে চায় আপন প্রলয়,
ভাঁটায় মিলাতে চায় আপনার নীরে।
অন্ধ প্রকৃতির হৃদে মৃত্তিকায় বাঁধা
সতত দুলিছে ওই অশ্রুর পাথার,
উন্মুখী বাসনা পায় পদে পদে বাধা,
কাঁদিয়া ভাসাতে চাহে জগৎ-সংসার।
সাগরের কণ্ঠ হতে কেড়ে নিয়ে কথা
সাধ যায় ব্যক্ত করি মানবভাষায়–
শান্ত করে দিই ওই চির ব্যাকুলতা,
সমুদ্রবায়ুর ওই চির হায় হায়।
সাধ যায় মোর গীতে দিবস রজনী
ধ্বনিতে পৃথিবী-ঘেরা সংগীতের ধ্বনি।
সমুদ্র Romanized Version
Kiser ashanti ei mohoparabare,
Sotot chhirite chahe kiser bondhon!
Obyakto osffut bani byokto koribare
Shishur moton sindhu koriche krondon.
Yug-yugantor dhori yojon yojon
Fuliya fuliya uthe uttolo uchchhwas–
Ashanti bipul pran koriche gorjon,
Nirobe shuniche tai proshanto akash.
Achhari churnite chahe somogro hridoy
Kothin pashanmoy dhoronir tire,
Joyare sadhite chay apon proloy,
Vhatay milate chay apnar neere.
Ondho prokritir hride murtikay bandha
Sotot duliye oi oshruer pathar,
Unmukhi bashona pay pode pode badha,
Kadiya bhashate chahe jogot-shongshar.
Sagorer kontho hote kere niye kotha
Sadh jay byokto kori manobvhasay–
Shanto kore dii oi chiro byakulota,
Somudrobayur oi chiro hay hay.
Sadh jay mor gite dibos rojoni
Dhonite prithibi-ghera shongiter dhoni.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- প্রকৃতির রূপকে মানবমনের প্রকাশ: সমুদ্র হলো প্রকৃতির এক বিশাল শক্তি, কিন্তু কবি তার তরঙ্গের গর্জন ও ক্রন্দনের মধ্যে মানুষের অবদমিত মনের সুগভীর অতৃপ্তি ও ছটফটানি দেখতে পেয়েছেন।
- শিশুর মতো ক্রন্দন ও আকুতি: অব্যক্ত ও অস্ফুট বাণী প্রকাশের জন্য সমুদ্রের শিশুর মতো ক্রন্দন মানুষের না বলা বেদনার প্রতীক।
- প্রকৃতির দ্বৈত রূপ ও দ্বন্দ্ব: একদিকে কঠিন পাষাণে আছড়ে পড়ে প্রলয় সাধনের তীব্র বাসনা, অন্যদিকে আবার ভাটায় নিজের নীরে শান্ত হয়ে যাওয়ার আকুতি—মানবমনের এই চিরন্তন দ্বন্দ্বই এখানে প্রকাশিত হয়েছে।
- “সাধ যায় মোর গীতে দিবস রজনী / ধ্বনিতে পৃথিবী-ঘেরা সংগীতের ধ্বনি।”— এই চরণের মাধ্যমে কবি তাঁর শিল্পীসত্তার গভীর আকাঙ্ক্ষাকে প্রকাশ করেছেন। প্রকৃতির এই চিরন্তন ব্যাকুলতা ও কান্নার সুরকে কবি নিজের কবিতার গানে অমর করে রাখতে চান, যাতে সারা পৃথিবীর সমস্ত সংগীত ও বেদনা তাঁর কাব্যে ধ্বনিত হতে পারে।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।
