বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কল্পনা’ (১৯০০) কাব্যগ্রন্থের একটি অসাধারণ রোমান্টিক ও চিত্রকল্পময় কবিতা হলো ‘স্বপ্ন’। মহাকবি কালিদাসের ধ্রুপদী সাহিত্যের অনুপ্রেরণায় রচিত এই কবিতায় কবি যেন স্বপ্নের ঘোরে প্রাচীন ভারতের উজ্জয়িনী নগরীতে তাঁর পূর্বজন্মের প্রিয়ার সন্ধানে যাত্রা করেছেন।
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | স্বপ্ন |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | কল্পনা |
| প্রকাশের বছর | ১৯০০ (১৩০৭ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | রোমান্টিক, ঐতিহাসিক ও কল্পনাবিলাসী কবিতা (Romantic, Historical and Imaginative Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
‘কল্পনা’ কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ প্রাচীন ভারতের ধ্রুপদী সৌন্দর্য, পুরাণ এবং রোমান্টিকতার এক অপূর্ব মিশ্রণ ঘটিয়েছেন। ‘স্বপ্ন’ কবিতায় মহাকবি কালিদাসের ‘মেঘদূত’ কাব্যের সুস্পষ্ট প্রভাব রয়েছে। কবি তাঁর কল্পনায় বা স্বপ্নে শিপ্রা নদীর তীরে অবস্থিত প্রাচীন উজ্জয়িনী নগরীতে পৌঁছে যান তাঁর পূর্বজন্মের প্রথম প্রেমিকাকে (মালবিকা) খোঁজার জন্য। প্রাচীন ভারতের ঐতিহ্যবাহী সাজসজ্জা, প্রকৃতি এবং সন্ধ্যারতির এক নিখুঁত চিত্রায়নের মধ্য দিয়ে কবি জন্মান্তরের শাশ্বত প্রেমের এক মায়াবী জগত তৈরি করেছেন, যা আবার স্বপ্নের মতোই একসময় অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।
স্বপ্ন – সম্পূর্ণ কবিতা
দূরে বহুদূরে
স্বপ্নলোকে উজ্জয়িনীপুরে
খুঁজিতে গেছিনু কবে শিপ্রানদীপারে
মোর পূর্বজনমের প্রথমা প্রিয়ারে।
মুখে তার লোধ্ররেণু লীলাপদ্ম হাতে,
কর্ণমূলে কুন্দকলি কুরুবক মাথে,
তনু দেহে রক্তাম্বর নীবিবন্ধে বাঁধা,
চরণে নূপুরখানি বাজে আধা আধা।
বসন্তের দিনে
ফিরেছিনু বহুদূরে পথ চিনে চিনে।
মহাকাল মন্দিরের মাঝে
তখন গম্ভীর মন্দ্রে সন্ধ্যারতি বাজে।
জনশূন্য পণ্যবীথি, ঊর্ধ্বে যায় দেখা
অন্ধকার হর্ম্য-‘পরে সন্ধ্যারশ্মিরেখা।
প্রিয়ার ভবন
বঙ্কিম সংকীর্ণ পথে দুর্গম নির্জন।
দ্বারে আঁকা শঙ্খ চক্র, তারি দুই ধারে
দুটি শিশু নীপতরু পুত্রস্নেহে বাড়ে।
তোরণের স্বেতস্তম্ভ-‘পরে
সিংহের গম্ভীর মূর্তি বসি দম্ভভরে।
প্রিয়ার কপোতগুলি ফিরে এল ঘরে,
ময়ূর নিদ্রায় মগ্ন স্বর্ণদণ্ড-‘পরে।
হেনকালে হাতে দীপশিখা
ধীরে ধীরে নামি এল মোর মালবিকা।
দেখা দিল দ্বারপ্রান্তে সোপানের-‘পরে
সন্ধ্যার লক্ষ্মীর মতো সন্ধ্যাতারা করে।
অঙ্গের কুঙ্কুমগন্ধ কেশধূপবাস
ফেলিল সর্বাঙ্গে মোর উতলা নিশ্বাস।
প্রকাশিল অর্ধচ্যুত বসন-অন্তরে
চন্দনের পত্রলেখা বাম পয়োধরে।
দাঁড়াইল প্রতিমার প্রায়
নগরগুঞ্জনক্ষান্ত নিস্তব্ধ সন্ধ্যায়।
মোরে হেরি প্রিয়া
ধীরে ধীরে দীপখানি দ্বারে নামাইয়া
আইল সম্মুখে–মোর হস্তে হস্ত রাখি
নীরবে শুধাল শুধু, সকরুণ আঁখি,
“হে বন্ধু আছ তো ভালো?’ মুখে তার চাহি
কথা বলিবারে গেনু, কথা আর নাহি।
সে ভাষা ভুলিয়া গেছি, নাম দোঁহাকার
দুজনে ভাবিনু কত–মনে নাহি আর।
দুজনে ভাবিনু কত চাহি দোঁহা-পানে,
অঝোরে ঝরিল অশ্রু নিস্পন্দ নয়ানে।
দুজনে ভাবিনু কত দ্বারতরুতলে!
নাহি জানি কখন কি ছলে
সুকোমল হাতখানি লুকাইল আসি
আমার দক্ষিণ করে কুলায়প্রত্যাশী
সন্ধ্যার পাখির মতো, মুখখানি তার
নতবৃন্তপদ্মসম এ বক্ষে আমার
নমিয়া পড়িল ধীরে, ব্যাকুল উদাস
নিঃশব্দে মিলিল আসি নিশ্বাসে নিশ্বাস।
রজনীর অন্ধকার
উজ্জয়িনী করি দিল লুপ্ত একাকার।
দীপ দ্বারপাশে
কখন নিবিয়া গেল দুরন্ত বাতাসে।
শিপ্রানদীতীরে
আরতি থামিয়া গেল শিবের মন্দিরে।
Nogorogunjonokkhanto nistobdho shondhyay.
More heri priya
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- ধ্রুপদী চিত্রকল্প ও প্রাচীন ভারতের রূপ:“মুখে তার লোধ্ররেণু লীলাপদ্ম হাতে, / কর্ণমূলে কুন্দকলি কুরুবক মাথে,”— কবি প্রাচীন উজ্জয়িনী নগরীর এক অপরূপ দৃশ্য এঁকেছেন। প্রিয়ার ঠোঁটে লোধ্র ফুলের রেণু, হাতে পদ্ম, কানে কুন্দকলি এবং মাথায় কুরুবক ফুল—এগুলো কালিদাসের কাব্যের চিরায়ত সৌন্দর্যের প্রতীক। মহাকাল মন্দিরের আরতি, প্রিয়ার নির্জন ভবন, তোরণের শ্বেতপাথরের সিংহ—সব মিলিয়ে এক মায়াবী ও ধ্রুপদী আবহ তৈরি হয়েছে।
- জন্মান্তরের প্রেম ও ভাষার অতীত মিলন:“সে ভাষা ভুলিয়া গেছি, নাম দোঁহাকার / দুজনে ভাবিনু কত–মনে নাহি আর।… অঝোরে ঝরিল অশ্রু নিস্পন্দ নয়ানে।”— পূর্বজন্মের প্রিয়ার সাথে দেখা হওয়ার পর তারা দুজনেই তাদের ভাষা এবং নাম ভুলে গেছেন। কারণ, সত্যিকারের শাশ্বত প্রেমের প্রকাশের জন্য কোনো জাগতিক ভাষার প্রয়োজন হয় না। তাদের নীরব দৃষ্টি, নিস্পন্দ চোখের জল এবং পরম আস্থার স্পর্শই তাদের দীর্ঘ বিরহের সমস্ত কথা বলে দেয়।
- স্বপ্নের ভঙ্গুরতা ও রূঢ় বাস্তব:“রজনীর অন্ধকার / উজ্জয়িনী করি দিল লুপ্ত একাকার। / দীপ দ্বারপাশে / কখন নিবিয়া গেল দুরন্ত বাতাসে।”— প্রিয়ার সাথে এই পরম মিলনের মুহূর্তেই হঠাৎ স্বপ্ন ভেঙে যায়। দুরন্ত বাতাসে প্রদীপের আলো নিভে যাওয়ার রূপকের মধ্য দিয়ে কবি দেখিয়েছেন কীভাবে এক লহমায় উজ্জয়িনী নগরী, অতীত স্মৃতি এবং পূর্বজন্মের প্রিয়া রাতের অন্ধকারে চিরতরে হারিয়ে যায়।



![কল্পনা কাব্যগ্রন্থের ‘স্বপ্ন’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 1 স্বপ্ন swopno [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/স্বপ্ন-swopno-কবিতা-1-1-1024x536.gif)

![ভ্রষ্ট লগ্ন bhroshto logno [ কবিতা ]- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 2 ভ্রষ্ট লগ্ন bhroshto logno [ কবিতা ]- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/ভ্রষ্ট-লগ্ন-bhroshto-logno-কবিতা--1024x536.gif)
![কল্পনা কাব্যগ্রন্থের চৌরপঞ্চাশিকা কবিতা [ Choroponchashika Kobita ] 3 চৌরপঞ্চাশিকা choroponchashika [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/চৌরপঞ্চাশিকা-choroponchashika-কবিতা--1024x536.gif)
![পরিত্যক্ত parityakta [ কবিতা ]- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পরিত্যক্ত parityakta [ কবিতা ]- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/পরিত্যক্ত-parityakta-কবিতা--1024x536.gif)
![গুরুগোবিন্দ guru gobindo [ কবিতা ]- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গুরুগোবিন্দ guru gobindo [ কবিতা ]- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/গুরুগোবিন্দ-guru-gobindo-কবিতা--1024x536.gif)