কল্পনা কাব্যগ্রন্থের চৌরপঞ্চাশিকা কবিতা [ Choroponchashika Kobita ]

চৌরপঞ্চাশিকা’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এক অনন্য প্রেম-চেতনার কবিতা, যা মধ্যযুগীয় সংস্কৃত কাব্য চৌরপঞ্চাশিকা (বিলহণের রচনা) থেকে অনুপ্রাণিত হলেও সম্পূর্ণভাবে রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব কাব্যভাষা ও অনুভবের আলোয় রূপান্তরিত। এই কবিতায় কবি প্রেমকে কেবল ব্যক্তিগত আবেগ হিসেবে দেখেননি; বরং তাকে স্মৃতি, অনুতাপ, শোক, শিল্প ও কালের দীর্ঘ যাত্রার প্রতীক হিসেবে নির্মাণ করেছেন। ‘ওগো সুন্দর চোর’—এই সম্বোধনের মধ্য দিয়ে কবি প্রেমিক-প্রেমিকার সম্পর্ককে এক রহস্যময়, চিরচুরি-প্রবণ অনুভূতির রূপ দেন, যেখানে প্রেম চুরি করে নেয় সময়, যৌবন, স্মৃতি ও প্রাণ। পঞ্চাশটি শ্লোক বা গাথার ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে কবি দেখিয়েছেন—যুগে যুগে প্রেম কিভাবে একই ব্যথা, একই গান, একই অন্ধ আবেগে মানুষের হৃদয়ে ফিরে আসে। এই কবিতা প্রেমের চিরকালীন বেদনা ও সৌন্দর্যের এক গভীর কাব্যিক স্মারক।

কাব্যগ্রন্থ : কল্পনা [ ১৯৫২ ]

কবিতার শিরনামঃ চৌরপঞ্চাশিকা

চৌরপঞ্চাশিকা কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ওগো সুন্দর চোর,

বিদ্যা তোমার কোন্‌ সন্ধ্যার

       কনকচাঁপার ডোর!

কত বসন্ত চলি গেছে হায়,

কত কবি আজি কত গান গায়,

কোথা রাজবালা চিরশয্যায়–

       ওগো সুন্দর চোর,

কোনো গানে আর ভাঙে না যে তার

       অনন্ত ঘুমঘোর।

       ওগো সুন্দর চোর,

কত কাল হল কবে সে প্রভাতে

       তব প্রেমনিশি ভোর!

কবে নিবে গেছে নাহি তাহা লিখা

তোমার বাসরে দীপানলশিখা,

খসিয়া পড়েছে সোহাগলতিকা–

       ওগো সুন্দর চোর,

শিথিল হয়েছে নবীন প্রেমের

       বাহুপাশ সুকঠোর।

       তবু সুন্দর চোর,

মৃত্যু হারায়ে কেঁদে কেঁদে ঘুরে

       পঞ্চাশ শ্লোক তোর।

পঞ্চাশ বার ফিরিয়া ফিরিয়া

বিদ্যার নাম ঘিরিয়া ঘিরিয়া

তীব্র ব্যথায় মর্ম চিরিয়া

       ওগো সুন্দর চোর,

যুগে যুগে তারা কাঁদিয়া মরিছে

       মূঢ় আবেগে ভোর।

       ওগো সুন্দর চোর,

অবোধ তাহারা, বধির তাহারা,

       অন্ধ তাহারা ঘোর।

দেখে না শোনে না কে আসে কে যায়,

জানে না কিছুই কারে তারা চায়,

শুধু এক নাম এক সুরে গায়–

       ওগো সুন্দর চোর,

না জেনে না বুঝে ব্যর্থ ব্যথায়

       ফেলিছে নয়নলোর।

 

       ওগো সুন্দর চোর,

এক সুরে বাঁধা পঞ্চাশ গাথা

       শুনে মনে হয় মোর–

রাজভবনের গোপনে পালিত,

রাজবালিকার সোহাগে লালিত,

তব বুকে বসি শিখেছিল গীত

       ওগো সুন্দর চোর,

পোষা শুক সারী মধুরকণ্ঠ

       যেন পঞ্চাশ-জোড়।

       ওগো সুন্দর চোর,

তোমারি রচিত সোনার ছন্দ-

       পিঞ্জরে তারা ভোর।

দেখিতে পায় না কিছু চারি ধারে,

শুধু চিরনিশি গাহে বারে বারে

তোমাদের চির শয়নদুয়ারে–

       ওগো সুন্দর চোর,

আজি তোমাদের দুজনের চোখে

       অনন্ত ঘুমঘোর।

মন্তব্য করুন