রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্যগ্রন্থ চৈতালি (১৮৯৬) তাঁর কাব্যসৃষ্টির এক সংবেদনশীল ও রূপান্তরকালীন পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। একই বছরে প্রকাশিত চিত্রা কাব্যগ্রন্থের সঙ্গে এর কালিক সাযুজ্য থাকলেও ভাব, সুর ও আবহে চৈতালি স্বতন্ত্র। এখানে কবি প্রকৃতি, প্রেম ও বিরহের অনুভবকে এক মৃদু, স্নিগ্ধ ও অন্তর্মুখী কণ্ঠে প্রকাশ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর কাব্যভাষার এই পর্বে আবেগের প্রাবল্য অপেক্ষা অনুভূতির সূক্ষ্মতা বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
‘চৈতালি’ নামটি নিজেই ইঙ্গিতবাহী। চৈত্র মাসের শেষ লগ্ন—যেখানে বসন্তের উচ্ছ্বাস ম্লান হয়ে আসন্ন গ্রীষ্মের ক্লান্তি ও বিষণ্ণতার আভাস মেলে—এই গ্রন্থের আবহও তেমনই। প্রকৃতি এখানে শুধু বাহ্যিক দৃশ্য নয়, মানবমনের প্রতিচ্ছবি। ঝরাপাতা, ধূসর আকাশ, বিদায়ের সুর ও অনিশ্চিত প্রত্যাশা—এই সবকিছু মিলিয়ে চৈতালি এক অন্তিম বসন্তের অনুভূতি সৃষ্টি করে।
এই কাব্যগ্রন্থে প্রেমের প্রকাশ সংযত ও মর্মভেদী। এখানে প্রেম উচ্ছ্বাসে ভরপুর নয়, বরং স্মৃতি, অপেক্ষা, বিচ্ছেদ ও নীরব বেদনায় আবিষ্ট। প্রেমিক-প্রেমিকার সম্পর্কের মধ্য দিয়ে কবি জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব ও অনুভূতির অনিত্যতার কথাই বেশি করে বলেন। অনেক কবিতায় আনন্দ ও বিষাদের সহাবস্থান লক্ষ করা যায়—যেন সুখের মধ্যেই তার বিদায়ের আভাস লুকিয়ে আছে।
ভাষা ও শৈলীর দিক থেকে চৈতালি রবীন্দ্রনাথের কাব্যভাষার পরিমিতিবোধের উৎকৃষ্ট উদাহরণ। অলংকার এখানে বাহুল্য নয়; শব্দচয়ন সহজ, স্বচ্ছ ও সংগীতধর্মী। ছোট ছোট চিত্রকল্প ও সূক্ষ্ম প্রতীকের মাধ্যমে গভীর অনুভূতি প্রকাশিত হয়েছে। এই গ্রন্থে কবির গীতিময়তা বিশেষভাবে লক্ষণীয়, যা পরবর্তীকালের গীতিকবিতা ও গানের জগতে তাঁর অগ্রযাত্রার পূর্বাভাস দেয়।
চৈতালি কাব্যগ্রন্থের আরেকটি তাৎপর্য হলো এর অন্তর্মুখী দার্শনিক সুর। জীবনকে এখানে কবি একটি চলমান প্রবাহ হিসেবে দেখেছেন—যেখানে আগমন ও প্রস্থান, প্রাপ্তি ও হারানো অনিবার্য। এই বোধ পাঠককে আবেগের অতল গহ্বরের দিকে টেনে নিয়ে যায় না, বরং এক শান্ত, বিষণ্ণ উপলব্ধির সামনে দাঁড় করায়।
সব মিলিয়ে, চৈতালি (১৮৯৬) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্যসাধনায় এক নীরব অথচ গভীর স্বর। এটি বসন্তের শেষ প্রহরের মতো—উজ্জ্বল নয়, কিন্তু স্মৃতিময় ও হৃদয়স্পর্শী। বাংলা কবিতায় সংযত বেদনা ও প্রকৃতির সঙ্গে মানবমনের নিবিড় সংযোগের যে ধারা, চৈতালি তার এক অনন্য ও মূল্যবান সংযোজন।
চৈতালি কাব্যগ্রন্থ (১৮৯৬)
চৈতালী
গীতহীন
স্বপ্ন
আশার সীমা
দেবতার বিদায়
পুণ্যের হিসাব
বৈরাগ্য
মধ্যাহ্ন
পল্লীগ্রামে
সামান্য লোক
প্রভাত
দুর্লভ জন্ম
খেয়া
কর্ম
বনে ও রাজ্যে
সভ্যতার প্রতি
বন
তপোবন
প্রাচীন ভারত
ঋতুসংহার
মেঘদূত
দিদি
পরিচয়
অনন্ত পথে
ক্ষণমিলন
প্রেম
পুঁটু
হৃদয়ধর্ম
মিলনদৃশ্য
দুই বন্ধু
সঙ্গী
সতী
গান
স্নেহদৃশ্য
করুণা
পদ্মা
স্নেহগ্রাস
বঙ্গমাতা
দুই উপমা
অভিমান
পরবেশ
সমাপ্তি
ধরাতল
তত্ত্ব ও সৌন্দর্য
তত্ত্বজ্ঞানহীন
মানসী
নারী
প্রিয়া
ধ্যান
মৌন
অসময়
শেষকথা
বর্ষশেষ
অভয়
অনাবৃষ্টি
অজ্ঞাত বিশ্ব
ভয়ের দুরাশা
ভক্তের প্রতি
নদীযাত্রা
মৃত্যমাধুরী
স্মৃতি
বিলয়
প্রথম চুম্বন
শেষ চুম্বন
যাত্রী
তৃণ
ঐশ্বর্য
স্বার্থ
প্রেয়সী
শান্তিমন্ত্র
কালিদাসের প্রতি
কুমারসম্ভবগান
মানসলোক
কাব্য
প্রার্থনা
ইচ্ছামতী
শুশ্রূষা
আশিস-গ্রহণ
বিদায়

![চৈতালি কাব্যগ্রন্থ (১৮৯৬) Chaitali Kabbogrontho 1 চৈতালী chaitali [ কাব্যগ্রন্থ ]- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/চৈতালী-chaitali-কাব্যগ্রন্থ-.gif)