কণিকা কাব্যগ্রন্থের খেলেনা কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । কণিকা

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কণিকা’ কাব্যগ্রন্থের অন্যতম গভীর তাৎপর্যপূর্ণ কবিতা হলো ‘খেলেনা’। মাত্র ছয় চরণের এই কবিতায় কবি মানবজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে আকাঙ্ক্ষার পরিবর্তন এবং পরিশেষে জাগতিক মোহমুক্তির এক অসামান্য দার্শনিক তত্ত্ব তুলে ধরেছেন। শৈশবের খেলনার প্রতি মোহ থেকে শুরু করে পরিণত বয়সের ধনসম্পদের লোভ এবং চূড়ান্ত পরিণতিতে জাগতিক সবকিছু ত্যাগের বৈরাগ্য—এই ত্রিমাত্রিক জীবনের রূপক চিত্রায়িত হয়েছে এখানে।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামখেলেনা
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থকণিকা
প্রকাশের বছর১৮৯৯
কবিতার ধরননীতিশিক্ষা ও দার্শনিক কবিতা (Philosophical Poem)
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
১৮৯৯ সালে প্রকাশিত ‘কণিকা’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যজীবনের এক বিশেষ ও ব্যতিক্রমী সৃষ্টি। এই গ্রন্থের কবিতাগুলো আকারে ছোট হলেও এর অন্তর্নিহিত দর্শন অত্যন্ত গভীর। ‘খেলেনা’ কবিতায় কবি মানবজীবনের আকাঙ্ক্ষা ও প্রাপ্তির অসারতাকে খুব সহজ ভাষায় তুলে ধরেছেন। মানুষের বয়স বাড়ার সাথে সাথে তার চাওয়া-পাওয়ার যে রূপান্তর ঘটে এবং জীবনের অন্তিম পর্যায়ে এসে জাগতিক সবকিছুই যে নিতান্তই ‘খেলার বস্তু’ বা তুচ্ছ মনে হয়, সেই শাশ্বত সত্যটি এখানে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ফুটে উঠেছে।

খেলেনা – সম্পূর্ণ কবিতা

ভাবে শিশু, বড়ো হলে শুধু যাবে কেনা
বাজার উজাড় করি সমস্ত খেলে-না।
বড়ো হলে খেলা যত ঢেলা বলি মানে,
দুই হাত তুলে চায় ধনজন-পানে।
আরো বড়ো হবে না কি যবে অবহেলে
ধরার খেলার হাট হেসে যাবে ফেলে?

খেলেনা Romanized Version

Bhabe shishu, boro hole shudhu jabe kena
Bajar ujar kori shomosto khele-na.
Boro hole khæla joto dhæla boli mane,
Dui hat tule chay dhonjon-pane.
Aro boro hobe na ki jobe obohele
Dhorar khælar hat heshe jabe fele?

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • শৈশবের সরল আকাঙ্ক্ষা: কবিতার শুরুতে দেখা যায়, একজন শিশু ভাবছে সে বড় হলে বাজারের সমস্ত খেলনা কিনে নেবে। এটি মানুষের প্রাথমিক স্তরের অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষার প্রতীক, যেখানে বস্তুগত প্রাপ্তিই জীবনের চরম আনন্দ বলে মনে হয়।
  • পরিণত বয়সের মোহ ও বস্তুগত তৃষ্ণা: মানুষ যখন সত্যি সত্যি বড় হয়, তখন সে শৈশবের সেই প্রিয় খেলনাগুলোকে তুচ্ছ ‘ঢেলা’ বা মাটি/পাথরের টুকরোর মতো মূল্যহীন মনে করে। তার আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দু পরিবর্তিত হয়; তখন সে দুই হাত বাড়িয়ে চায় পার্থিব ধন-সম্পদ ও জনবল। এটি মানবজীবনের মধ্যবর্তী পর্যায়, যেখানে মোহ মানুষকে আচ্ছন্ন করে রাখে।
  • চূড়ান্ত পরিণতি ও মোহমুক্তি: কবিতার শেষ দুই চরণে কবি এক অমোঘ দার্শনিক প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মানুষ কি জ্ঞানে ও প্রজ্ঞায় ‘আরো বড়ো’ বা পরিণত হবে না? যেদিন সে বুঝতে পারবে এই গোটা পৃথিবীটাই একটা সাময়িক ‘খেলার হাট’, এবং জীবনের অন্তিম লগ্নে দাঁড়িয়ে এই জাগতিক ধন-সম্পদ অবহেলায় ও হাসিমুখে সে পেছনে ফেলে চলে যাবে।
  • “ধরার খেলার হাট হেসে যাবে ফেলে?”
    — কবির এই প্রশ্নটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জীবনের অন্তিম যাত্রায় পার্থিব সব মোহ ও আজীবন ধরে জমানো সঞ্চয় নিতান্তই মূল্যহীন খেলনার সমতুল্য।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (কণিকা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন