কণিকা কাব্যগ্রন্থের অল্প জানা ও বেশি জানা কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । কণিকা

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কণিকা’ কাব্যগ্রন্থের একটি শাণিত ও ব্যঙ্গাত্মক কবিতা হলো ‘অল্প জানা ও বেশি জানা’। মাত্র চার চরণের এই কবিতায় কবি অজ্ঞতা, অহংকার এবং মূর্খতার স্বরূপ অত্যন্ত তীব্র অথচ কৌতুকপূর্ণ ভাষায় উন্মোচন করেছেন। অল্পবিদ্যা ভয়ংকর কিংবা মূর্খ মানুষের বিচারবুদ্ধির সংকীর্ণতা এই কবিতায় অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামঅল্প জানা ও বেশি জানা
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থকণিকা
প্রকাশের বছর১৮৯৯
কবিতার ধরনব্যঙ্গাত্মক ও নীতিশিক্ষামূলক কবিতা (Satirical and Didactic Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

১৮৯৯ সালে প্রকাশিত ‘কণিকা’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো আকারে ক্ষুদ্র হলেও এর পরতে পরতে লুকিয়ে আছে গভীর জীবনদর্শন ও সমাজবাস্তবতা। ‘অল্প জানা ও বেশি জানা’ কবিতায় কবি একটি সাধারণ দৃষ্টান্তের মাধ্যমে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক অজ্ঞতাকে ব্যঙ্গের ছলে ফুটিয়ে তুলেছেন। যে ব্যক্তি প্রকৃত জ্ঞান বা প্রজ্ঞা অর্জন করে না, সে নিজের স্বল্প জ্ঞান বা ভুলের ওপর অন্ধবিশ্বাস রেখে শ্রেষ্ঠ সত্যকে অস্বীকার করে—এই শাশ্বত সত্যটিই এখানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

অল্প জানা ও বেশি জানা – সম্পূর্ণ কবিতা

তৃষিত গর্দভ গেল সরোবরতীরে,
“ছিছি কালো জল!’ বলি চলি এল ফিরে।
কহে জল, জল কালো জানে সব গাধা,
যে জন অধিক জানে বলে জল সাদা।

অল্প জানা ও বেশি জানা Romanized Version

Trishito gordhob gelo shorobortire,
“Chhi-chhi kalo jol!’ boli choli elo phire.
Kohe jol, jol kalo jane shob gadha,
Je jon odhik jane bole jol shada.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • রূপক ও ব্যঙ্গের ব্যবহার: কবিতায় ‘গর্দভ’ বা গাধা হলো অজ্ঞতা, মূর্খতা এবং অন্ধ অহংকারের প্রতীক। আর সরোবরের জল হলো সত্য বা জ্ঞানের প্রতীক।
  • অল্পবিদ্যার অহংকার: তৃষ্ণার্ত গাধা সরোবরের কাছে গিয়ে জলের প্রকৃত রূপ না বুঝে বা তলদেশের ছায়ার কারণে জলকে ‘কালো’ বলে ঘৃণাভরে ফিরে আসে। এটি সেইসব মানুষের প্রতীক, যারা সামান্য জ্ঞানের জোরেই যেকোনো গভীর বিষয়কে ভুল বা ত্রুটিপূর্ণ বলে রায় দেয়।
  • প্রকৃত জ্ঞানের গভীরতা: জলের বক্তব্যে উঠে এসেছে এক দার্শনিক সত্য—জল আসলে সাদা (স্বচ্ছ), কিন্তু তা অনুধাবন করার মতো গভীর দৃষ্টি বা প্রজ্ঞা সবার থাকে না। যারা মূর্খ বা স্বল্পজ্ঞানী, তারা সবকিছুতেই কেবল ত্রুটি ও অন্ধকার দেখে; কিন্তু যারা প্রকৃত জ্ঞানী, তারা সত্যের স্বচ্ছ রূপটি দেখতে পায়।
  • “যে জন অধিক জানে বলে জল সাদা।”
    — এই চরণের মাধ্যমে কবি বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, সত্যের প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করতে হলে জ্ঞানের গভীরতা প্রয়োজন। মূর্খ মানুষ নিজের অজ্ঞতাকেই চরম সত্য বলে মনে করে, পক্ষান্তরে জ্ঞানী ব্যক্তি সমস্ত অন্ধত্ব পেরিয়ে সত্যের স্বচ্ছ ও সুন্দর রূপটি আবিষ্কার করে।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (কণিকা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন