কণিকা কাব্যগ্রন্থের তন্নষ্টং যন্ন দীয়তে কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । কণিকা

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কণিকা’ কাব্যগ্রন্থের একটি গভীর নীতিশিক্ষা ও দার্শনিক ভাবনার কবিতা হলো ‘তন্নষ্টং যন্ন দীয়তে’। প্রাচীন প্রবাদধর্মী এই শিরোনামটির অর্থ হলো—”যা দেওয়া হয় না, তা নষ্ট হয়”। মাত্র চার চরণের এই ক্ষুদ্র কবিতায় কবি ত্যাগ, বিতরণ এবং অর্জিত গুণ বা সম্পদের সার্থকতা অত্যন্ত সুন্দর এক রূপকের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। ফুলের সুবাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়ার মধ্য দিয়ে কবি বুঝিয়েছেন যে, কোনো সৌন্দর্য বা সম্পদ নিজের কাছে কুক্ষিগত করে না রেখে তা বিলিয়ে দিলেই তা প্রকৃত স্থায়িত্ব লাভ করে।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামতন্নষ্টং যন্ন দীয়তে
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থকণিকা
প্রকাশের বছর১৮৯৯
কবিতার ধরননীতিশিক্ষা ও রূপক কবিতা (Didactic and Allegorical Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

১৮৯৯ সালে প্রকাশিত ‘কণিকা’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো আকারে ক্ষুদ্র হলেও এর পরতে পরতে লুকিয়ে আছে গভীর জীবনদর্শন। ‘তন্নষ্টং যন্ন দীয়তে’ কবিতাটিতে কবি প্রাচীন ভারতীয় নীতির একটি শাশ্বত সত্যকে নিসর্গ প্রকৃতির এক মিষ্টি চিত্রের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন। ফুল যখন তার সুবাস নিজের মধ্যে আটকে রাখতে পারে না এবং তা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে, তখন ফুল তা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করে। কিন্তু প্রকৃতির বাণীর মাধ্যমে কবি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, যা বিলিয়ে দেওয়া হয় সেটাই টিকে থাকে, আর যা আটকে রাখা হয় তা হারিয়ে যায়।

তন্নষ্টং যন্ন দীয়তে – সম্পূর্ণ কবিতা

গন্ধ চলে যায়, হায়, বন্ধ নাহি থাকে,
ফুল তারে মাথা নাড়ি ফিরে ফিরে ডাকে।
বায়ু বলে, যাহা গেল সেই গন্ধ তব,
যেটুকু না দিবে তারে গন্ধ নাহি কব।

তন্নষ্টং যন্ন দীয়তে Romanized Version

Gondho chole jay, hay, bondho nahi thake,
Phul tare matha nari phire phire dake.
Bayu bole, jaha gelo shei gondho tobo,
Jetuku na dibe tare gondho nahi kobo.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • রূপক ও তাৎপর্য: কবিতায় ‘ফুল’ হলো গুণ, সৌন্দর্য বা সম্পদের প্রতীক, আর ‘বায়ু’ হলো সেই মাধ্যম বা জগৎ যার কাছে তা প্রকাশিত হয়।
  • ফুলের অজ্ঞতা ও ব্যাকুলতা: ফুল তার সৌরভকে ধরে রাখতে পারে না, তা বাতাসে ভেসে দূরে চলে যায়। ফুল বারবার মাথা নেড়ে সেই চলে যাওয়া গন্ধকে ফিরে ডাকতে চায়, কারণ সে মনে করে তার সুবাস বুঝি নিঃশেষ হয়ে গেল।
  • বিতরণের অমরত্ব: বাতাস তখন ফুলকে সান্ত্বনা দিয়ে এক পরম সত্য জানায়। বাতাসে যা ছড়িয়ে পড়েছে বা যা অন্যের কল্যাণে বিলিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেটাই আসলে ফুলের আসল গন্ধ ও স্বীকৃতি।
  • “যেটুকু না দিবে তারে গন্ধ নাহি কব।”
    — এই চরণের মাধ্যমে কবি এক গভীর জীবনদর্শন প্রতিষ্ঠা করেছেন। কোনো মহৎ গুণ, জ্ঞান বা সম্পদ যদি কেউ নিজের কাছে চেপে বা লুকিয়ে রাখে, তবে তার কোনো মূল্য বা প্রকাশ থাকে না—তা একসময় বিলীন হয়ে যায়। একমাত্র অন্যের মাঝে ছড়িয়ে দিলেই তা সার্থকতা ও অমরত্ব লাভ করে।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (কণিকা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন