পূরবী কাব্যগ্রন্থের মৃত্যুর আহ্বান কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পূরবী’ কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম গভীর দার্শনিক, প্রতীকী ও জীবনমৃত্যুর রূপকধর্মী কবিতা হলো ‘মৃত্যুর আহ্বান’। ১৯২৫ সালে প্রকাশিত এই কবিতায় কবি জন্ম এবং মৃত্যুর সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি রূপ ও পটভূমিকে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে তুলে ধরেছেন। জন্ম হলো ঘরের মাঝে কোলাহল ও প্রিয়জনদের স্নেহের মাঝে আত্মপ্রকাশ, আর মৃত্যু হলো গৃহের গণ্ডি পেরিয়ে অসীমের পথে একাকী এক চিরন্তন পথিকের যাত্রা।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামমৃত্যুর আহ্বান
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থপূরবী
প্রকাশের বছর১৯২৫ (১৩৩২ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনদার্শনিক ও প্রতীকী লিরিক কবিতা (Philosophical and Symbolic Lyrical Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

১৯২৫ সালে প্রকাশিত ‘পূরবী’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিজীবনের এক পরিণত ও মননশীল পর্বের পরিচায়ক। এই গ্রন্থের কবিতায় জীবনের নানা সূক্ষ্ম উপলব্ধি, কালপ্রবাহ এবং অস্তিত্বের গভীর রহস্য অত্যন্ত নিপুণভাবে প্রকাশ পেয়েছে। ‘মৃত্যুর আহ্বান’ কবিতায় কবি জন্ম ও মৃত্যুর এক অপূর্ব তুলনামূলক দর্শন উপস্থাপন করেছেন। জন্ম যেমন আমাদের পরিচিত ঘরের আলো, মা ও প্রকৃতির স্নেহের কোলে টেনে নেয়, তেমনি মৃত্যু কোনো ভয়ের বিষয় নয়—তা হলো অচেনা পথের এক স্বাধীন ও মুক্ত আহ্বান, যা মানুষকে গৃহের চার দেয়াল থেকে অনন্তের পথে মুক্তি দেয়।

মৃত্যুর আহ্বান – সম্পূর্ণ কবিতা

জন্ম হয়েছিল তোর সকলের কোলে
আনন্দকল্লোলে।
নীলাকাশ, আলো, ফুল, পাখি,
জননীর আঁখি,
শ্রাবণের বৃষ্টিধারা, শরতের শিশিরের কণা,
প্রাণের প্রথম অভ্যর্থনা।
জন্ম সেই
এক নিমিষেই
অন্তহীন দান,
জন্ম সে যে গৃহমাঝে গৃহীরে আহ্বান।
মৃত্যু তোর হোক দূরে নিশীথে নির্জনে,
হোক সেই পথে যেথা সমুদ্রের তরঙ্গগর্জনে
গৃহহীন পথিকেরই
নৃত্যছন্দে নিত্যকাল বাজিতেছে ভেরী;
অজানা অরণ্যে যেথা উঠিতেছে উদাস মর্মর,
বিদেশের বিবাগী নির্ঝর
বিদায়-গানের তালে হাসিয়া বাজায় করতালি;
যেথায় অপরিচিত নক্ষত্রের আরতির থালি
চলিয়াছে অনন্তের মন্দির-সন্ধানে,
পিছু ফিরে চাহিবার কিছু যেথা নাই কোনোখানে।
দুয়ার রহিবে খোলা; ধরিত্রীর সমুদ্র-পর্বত
কেহ ডাকিবে না কাছে, সকলেই দেখাইবে পথ।
শিয়রে নিশীথরাত্রি রহিবে নির্বাক্‌,
মৃত্যু সে যে পথিকের ডাক।

মৃত্যুর আহ্বান Romanized Version

Jonmo hoyechhilo tor sokoler kole
Anondokollole.
Nilakash, alo, ful, pakhi,
Jononir ankhi,
Sraboner brishtidhara, shoroter shishirer kona,
Praner prothom obhortona.
Jonmo shei
Ek nimishei
Ontohin dan,
Jonmo se je grihomajhe grihire obhahan.
Mrittu tor hok dure nishithe nirjone,
Hok sei pothe jetha somudrer torongogorjone
Grihohin pothiker-i
Nrittychhonde nittokal bajiteche veri;
Ojana oronnye jetha uthiteche udash mormor,
Bidesher bibagi nirjhor
Biday-ganer tale hasiya bajay kortali;
Jethay aporichito nokhotror aratir thali
Cholechhe ononter mondir-sondhane,
Pichhu fire chahibar kichhu jetha nai konokhane.
Duar rohibe khola; dhoritrir somudro-porbot
Kehu dakiibe na kachhe, sokolei dekhayibe poth.
Shiyore nishithratri rohibe nirbak,

Mrittu se je pothiker dak.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • জন্মের ঘরোয়া রূপ ও কোলাহল: জন্ম মানেই হলো এই ধরণীর আলো, ফুল, পাখি, জননীর আঁখি এবং আনন্দকল্লোলের মাঝে পরিবারের কোলেই আশ্রয় পাওয়া। জন্ম হলো গৃহের মাঝে গৃহীকে ডেকে নেওয়ার প্রথম উপহার।

  • মৃত্যুর মুক্ত ও অসীমের আহ্বান:
“মৃত্যু তোর হোক দূরে নিশীথে নির্জনে, / হোক সেই পথে যেথা সমুদ্রের তরঙ্গগর্জনে / গৃহহীন পথিকেরই / নৃত্যছন্দে নিত্যকাল বাজিতেছে ভেরী…”
— জন্ম যদি হয় ঘরের ভেতরে আবদ্ধ ও সুপরিচিত, তবে মৃত্যু হোক ঘরের বাইরে স্বাধীন এক মুক্ত পথের যাত্রী হওয়া। যেখানে সমুদ্রের গর্জন, অজানা অরণ্যের মর্মরধ্বনি এবং বিদেশের বিবাগী নির্ঝরের বিদায়-গান বাজে।
  • পথিকের চিরন্তন যাত্রা:
“দুয়ার রহিবে খোলা; ধরিত্রীর সমুদ্র-পর্বত / কেহ ডাকিবে না কাছে, সকলেই দেখাইবে পথ। / শিয়রে নিশীথরাত্রি রহিবে নির্বাক্‌, / মৃত্যু সে যে পথিকের ডাক।”
— মৃত্যুর সময় চারপাশের সবকিছু উন্মুক্ত থাকবে, পিছু ফিরে তাকানোর আর কোনো আকুতি থাকবে না। নিশীথরাত্রি শিয়রে নির্বাক পাহারা দেবে, কারণ মৃত্যু কোনো ভয়ংকর সমাপ্তি নয়—এটি হলো এক অনন্ত পথের ডাক।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (পূরবী কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন