বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পূরবী’ কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম সুন্দর প্রকৃতি ও সংলাপধর্মী কবিতা হলো ‘বাতাস’। ১৯২৫ সালে প্রকাশিত এই কবিতায় কবি বাতাসকে এক জীবন্ত ও চলমান চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, যে প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদান—গোলাপ, পাখি, নদী ও অরণ্যের সঙ্গে আলাপচারিতার মাধ্যমে অসীম ও অজানার বার্তা বয়ে আনে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | বাতাস |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | পূরবী |
| প্রকাশের বছর | ১৯২৫ (১৩৩২ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | প্রকৃতি ও সংলাপভিত্তিক লিরিক কবিতা (Nature and Dialogue-based Lyrical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
১৯২৫ সালে প্রকাশিত ‘পূরবী’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিজীবনের এক পরিণত, সুরসমৃদ্ধ ও মননশীল পর্বের পরিচায়ক। এই গ্রন্থের কবিতায় প্রকৃতির নানা রূপান্তর এবং মানবজীবনের সাথে প্রকৃতির নিবিড় সংযোগ অত্যন্ত সুনিপুণভাবে প্রকাশ পেয়েছে। ‘বাতাস’ কবিতায় বাতাস কোনো সাধারণ প্রাকৃতিক শক্তি নয়; সে এক চিরন্তন পথিক, যে গোলাপের ঘুম ভাঙায়, পাখির ডানায় অসীমের বাণী পৌঁছে দেয়, নদীর সাথে সাগরের ছন্দ মেলায় এবং অরণ্যে বসন্তের পূর্ণতা জাগিয়ে তোলে। কার ভাষা কে বোঝে—এই সংশয়ের ঊর্ধ্বে বাতাস কেবল অজানার আভাস ছড়িয়ে দেয়।
বাতাস – সম্পূর্ণ কবিতা
গোলাপ বলে, ওগো বা’তাস, প্রলাপ তোমার বুঝতে কে বা পারে,
কেন এসে ঘা দিলে মোর দ্বারে?
বা’তাস বলে, ওগো গোলাপ, আমার ভাষা বোঝ বা নাই বোঝ,
আমি জানি কাহার পরশ খোঁজ;
সেই প্রভাতের আলো এল, আমি কেবল ভাঙিয়ে দিলাম ঘুম,
হে মোর কুসুম।
পাখি বলে, ওগো বাতা’স, কী তুমি চাও বুঝিয়ে বলো মোরে,
কুলায় আমার দুলাও কেন ভোরে?
বাাতা’স বলে, ওগো পাখি, আমার ভাষা বোঝ বা নাই বোঝ,
আমি জানি তুমি কারে খোঁজ;
সেই আকাশে জাগল আলো, আমি কেবল দিনু তোমায় আনি
সীমাহীনের বাণী।
নদী বলে, ওগো বা’তাস, বুঝতে নারি কী যে তোমার কথা,
কিসের লাগি এতই চঞ্চলতা।
বা’তাস বলে, ওগো নদী, আমার ভাষা বোঝ বা নাই বোঝ,
জানি তোমার বিলয় যেথা খোঁজ;
সেই সাগরের ছন্দ আমি এনে দিলাম তোমার বুকের কাছে,
তোমার ঢেউয়ের নাচে।
অরণ্য কয়, ওগো বাতা’স, নাহি জানি বুঝি কি নাই বুঝি
তোমার ভাষায় কাহার চরণ পূজি।
বা’তাস বলে, হে অরণ্য, আমার ভাষা বোঝ বা নাই বোঝ,
আমি জানি কাহার মিলন খোঁজ;
সেই বসন্ত এল পথে, আমি কেবল সুর জাগাতে পারি
তাহার পূর্ণতারই।
শুধায় সবে, ওগো বা’তাস, তবে তোমার আপন কথা কী যে–
বলো মোদের কী চাও তুমি নিজে।
বা’তাস বলে, আমি পথিক, আমার ভাষা বোঝ বা নাই বোঝ,
আমি বুঝি তোমরা কারে খোঁজ;
আমি শুধু যাই চলে আর সেই অজানার আভাস করি দান,
আমার শুধু গান।
বাতাস Romanized Version
Golap bole, ogo ba’tas, prolap tomar bujhite ke ba pare,
Keno ese gha dile mor dware?
Ba’tas bole, ogo golap, amar bhasha bojh ba nai bojh,
Ami jani kahar porosh khoj;
Shei probhater alo elo, ami kebol bhangiye dilam ghum,
He mor kusum.
Pakhi bole, ogo bata’s, ki tumi chao bujhiye bolo more,
Kulay amar dulao keno bhore?
Bata’s bole, ogo pakhi, amar bhasha bojh ba nai bojh,
Ami jani tumi kare khoj;
Shei akashe jaglo alo, ami kebol dinu tomay ani
Simahiner bani.
Nodi bole, ogo ba’tas, bujhite nari ki je tomar kotha,
Kisher lagi etoi choncholota.
Ba’tas bole, ogo nodi, amar bhasha bojh ba nai bojh,
Jani tomar biloy jetha khoj;
Shei sagorer chhondo ami ene dilam tomar buker kache,
Tomar ঢেউয়ের nache. (Tomar dheuer nache)
Aronyo koy, ogo bata’s, nahi jani bujhi ki nai bujhi
Tomar bhashay kahar choron puji.
Ba’tas bole, he aronyo, amar bhasha bojh ba nai bojh,
Ami jani kahar milon khoj;
Shei boshonto elo pothe, ami kebol shur jagate pari
Tahar purnotar-i.
Shudhay shabe, ogo ba’tas, tobe tomar apon kotha ki je–
Bolo moder ki chao tumi nije.
Ba’tas bole, ami pothik, amar bhasha bojh ba nai bojh,
Ami bujhi tomra kare khoj;
Ami shudhu jai chole ar shei ojanar abhash kori dan,
Amar shudhu gan.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- প্রকৃতির উপাদানের সাথে বাতাসের সংলাপ: গোলাপ, পাখি, নদী ও অরণ্যের প্রত্যেকেই বাতাসের চলাফেরা ও চঞ্চলতা নিয়ে প্রশ্ন করে এবং জানতে চায় সে কী চায়।
- বাতাসের প্রকৃত পরিচয়:
“বা’তাস বলে, আমি পথিক, আমার ভাষা বোঝ বা নাই বোঝ, / আমি বুঝি তোমরা কারে খোঁজ; / আমি শুধু যাই চলে আর সেই অজানার আভাস করি দান, / আমার শুধু গান।”— বাতাস কোনো সাধারণ বা তুচ্ছ শক্তি নয়; সে হলো এক চিরন্তন পথিক। সে নিজে না বুঝলেও প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানের আকাঙ্ক্ষাকে (যেমন গোলাপের আলো, পাখির সীমাহীনের বাণী, নদীর সাগরের পানে ছুটে চলা বা অরণ্যের বসন্ত) সে পরিপূর্ণতা দান করে এবং অজানার আভাস ছড়িয়ে দেয়।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (পূরবী কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।
![পূরবী কাব্যগ্রন্থের বাতাস কবিতা - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 1 বাতাস batas [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/বাতাস-batas-কবিতা-.gif)