বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শিশু ভোলানাথ’ কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম লঘু, ছন্দময় ও শিশুমনস্তত্ত্বভিত্তিক কবিতা হলো ‘রবিবার’। ১৯২২ সালে প্রকাশিত এই কবিতায় সপ্তাহের বারগুলোর গতিপ্রকৃতি নিয়ে এক শিশুসুলভ কৌতূহল এবং সবার প্রিয় ছুটির দিন রবিবারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক মায়াবী কল্পনা অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | রবিবার |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | শিশু ভোলানাথ |
| প্রকাশের বছর | ১৯২২ (১৩২৯ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | শিশুকেন্দ্রিক ও লঘু লিরিক কবিতা (Child-centric and Witty Lyrical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
১৯২২ সালে প্রকাশিত ‘শিশু ভোলানাথ’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিশুতোষ ও কল্পনাশ্রয়ী কবিতার এক অনন্য নিদর্শন। শিশুরা চারপাশের দুনিয়াকে তাদের নিজস্ব সরল দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিচার করে। ‘রবিবার’ কবিতায় একটি শিশু সপ্তাহের কাজের দিনগুলোর (সোম, মঙ্গল, বুধ ইত্যাদি) সাথে ছুটির দিন রবিবারের এক অপূর্ব তুলনামূলক চিত্র এঁকেছে। কাজের দিনগুলো যেন দ্রুত চলে আসে, আর ছোটদের সবচেয়ে প্রিয় দিন রবিবার আসতে যেমন দেরি করে, তেমনি ফুরিয়ে যাওয়ার বেলায় সে মায়ের মতো মায়া কান্না কেঁদে বিদায় নেয়।
রবিবার – সম্পূর্ণ কবিতা
সোম মঙ্গল বুধ এরা সব
আসে তাড়াতাড়ি,
এদের ঘরে আছে বুঝি
মস্ত হাওয়াগাড়ি?
রবি’বার সে কেন, মা গো,
এমন দেরি করে?
ধীরে ধীরে পৌঁছয় সে
সকল বারের পরে।
আকাশপারে তার বাড়িটি
দূর কি সবার চেয়ে?
সে বুঝি, মা, তোমার মতো
গরিব-ঘরের মেয়ে?
সোম মঙ্গল বুধের খেয়াল
থাকবারই জন্যেই,
বাড়ি-ফেরার দিকে ওদের
একটুও মন নেই।
রবি’বারকে কে যে এমন
বিষম তাড়া করে,
ঘণ্টাগুলো বাজায় যেন
আধ ঘণ্টার পরে।
আকাশ-পারে বাড়িতে তার
কাজ আছে সব-চেয়ে
সে বুঝি, মা, তোমার মতো
গরিব-ঘরের মেয়ে?
সোম মঙ্গল বুধের যেন
মুখগুলো সব হাঁড়ি,
ছোটো ছেলের সঙ্গে তাদের
বিষম আড়াআড়ি।
কিন্তু শনির রাতের শেষে
যেমনি উঠি জেগে,
রবি’বারের মুখে দেখি
হাসিই আছে লেগে।
যাবার বেলায় যায় সে কেঁদে
মোদের মুখে চেয়ে।
সে বুঝি, মা, তোমার মতো
গরিব ঘরের মেয়ে?
রবিবার Romanized Version
Som mongol budh era shob
Ashe taratari,
Oder ghore ache bujhi
Mosto hawagari?
Robi’bar se keno, ma go,
Emon deri kore?
Dhire dhire pouchhoy se
Shokol barer pore.
Akashpare tar bariti
Dur ki shobar cheye?
Se bujhi, ma, tomar moto
Gorib-ghorer meye?
Som mongol budher kheyal
Thakbar-i jonnye,
Bari-ferar dike oder
Ek-tuko-o mon nei.
Robi’barke ke je emon
Bishom tara kore,
Ghontaguli bajay jeno
Adhh ghontar pore.
Akash-pare barite tar
Kaj ache shob-cheye
Se bujhi, ma, tomar moto
Gorib-ghorer meye?
Som mongol budher jeno
Mukhguli shob hari,
Chhoto chheler shonge tader
Bishom ararari.
Kintu shonir rater sheshe
Jemni uthi jege,
Robi’barer mukhe dekhi
Hashi-i ache lege.
Jabar belay jay se kende
Moder mukhe cheye.
Se bujhi, ma, tomar moto
Gorib ghorer meye?
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- কাজের দিন বনাম ছুটির দিন:
“সোম মঙ্গল বুধ এরা সব / আসে তাড়াতাড়ি, / এদের ঘরে আছে বুঝি / মস্ত হাওয়াগাড়ি?”— সপ্তাহের সাধারণ দিনগুলো বা কাজের দিনগুলো যেন খুব দ্রুত চলে আসে, তাদের যেন কোনো হাওয়াগাড়ি আছে। কিন্তু রবিবার আসতে চায় সবার শেষে।
- মায়ের সাথে রবিবারের তুলনা:
“সে বুঝি, মা, তোমার মতো / গরিব-ঘরের মেয়ে?”— শিশুদের কাছে মা যেমন সবসময় কাজের মধ্যে থাকেন এবং গরিব ঘরের মানুষের মতো অক্লান্ত পরিশ্রম করেন, রবিবারও তেমনি আকাশ-পারে অনেক কাজ সেরে সবার শেষে আসে।
- রবিবারের হাসি ও বিদায়ের কান্না:
“কিন্তু শনির রাতের শেষে / তেমনি উঠি জেগে, / রবি’বারের মুখে দেখি / হাসিই আছে লেগে। / যাবার বেলায় যায় সে কেঁদে / মোদের মুখে চেয়ে।”— সপ্তাহের বাকি দিনগুলোর মুখ হাঁড়ির মতো গম্ভীর থাকে, কিন্তু রবিবার ঘুম ভাঙলেই তার মুখে থাকে আনন্দের হাসি। আবার ছুটির দিন ফুরিয়ে যাওয়ার বেলায় সে ছোট বাচ্চাদের মুখের দিকে চেয়ে কেঁদে কেঁদে বিদায় নেয়। শিশুর এই সরল কল্পনা কবিতাকে এক অন্য মাত্রা দিয়েছে।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (শিশু ভোলানাথ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।
