ক্ষণিকা কাব্যগ্রন্থের যাত্রী কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ক্ষণিকা’ কাব্যগ্রন্থের একটি অত্যন্ত মিষ্টি, লঘু ছন্দের ও রোমান্টিক কথোপকথনমূলক কবিতা হলো ‘যাত্রী’। ১৯০০ সালে প্রকাশিত ‘ক্ষণিকা’ কাব্যগ্রন্থের এই কবিতায় কবি খেয়াঘাটের এক অপরিচিত পথিকের সাথে নৌকায় ক্ষণিক যাত্রার মধ্য দিয়ে মানবজীবনের আকস্মিক সাক্ষাৎ, কৌতূহল এবং ক্ষণস্থায়ী সম্পর্কের এক অপূর্ব ও অনবদ্য চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামযাত্রী
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থক্ষণিকা
প্রকাশের বছর১৯০০ (১৩১৭ বঙ্গাব্দ বা সংকলন অনুযায়ী)
কবিতার ধরনলিরিক ও রূপক কবিতা (Lyrical and Allegorical Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

বিশ শতকের প্রারম্ভে প্রকাশিত ‘ক্ষণিকা’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিজীবনের এক মুক্ত, স্বচ্ছন্দ ও সহজিয়া মনের পরিচায়ক। এই গ্রন্থের কবিতায় জীবনের ছোটোখাটো আনন্দ, সাধারণ মানুষের পথচলা এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা চিত্র পরম রসে রূপ পেয়েছে। ‘যাত্রী’ কবিতায় কবি এক খেয়াঘাট ও নৌকার পটভূমি ব্যবহার করেছেন। নৌকার মাঝির সাথে সামান্য একটি আঁটি ধান হাতে এক নারীর ক্ষণিক আলাপ ও ভ্রমণের মধ্য দিয়ে জীবনের আকস্মিক ও সুন্দর মুহূর্তগুলোকে এখানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

যাত্রী – সম্পূর্ণ কবিতা

আছে, আছে স্থান!
একা তুমি, তোমার শুধু
একটি আঁটি ধান।
নাহয় হবে, ঘেঁষাঘেঁষি,
এমন কিছু নয় সে বেশি,
নাহয় কিছু ভারী হবে
আমার তরীখান–
তাই বলে কি ফিরবে তুমি
আছে, আছে স্থান!
এসো, এসো নায়ে!
ধুলা যদি থাকে কিছু
থাক্‌-না ধূলা পায়ে।
তনু তোমার তনুলতা,
চোখের কোণে চঞ্চলতা,
সজলনীল-জলদ-বরন
বসনখানি গায়ে–
তোমার তরে হবে গো ঠাঁই–
এসো এসো নায়ে।
যাত্রী আছে নানা,
নানা ঘাটে যাবে তারা
কেউ কারো নয় জানা।
তুমিও গো ক্ষণেক-তরে
বসবে আমার তরী-‘পরে,
যাত্রা যখন ফুরিয়ে যাবে,
মান্‌বে না মোর মানা–
এলে যদি তুমিও এসো,
যাত্রী আছে নানা।
কোথা তোমার স্থান?
কোন্‌ গোলাতে রাখতে যাবে
একটি আঁটি ধান?
বলতে যদি না চাও তবে
শুনে আমার কী ফল হবে,
ভাবব ব’সে খেয়া যখন
করব অবসান–
কোন্‌ পাড়াতে যাবে তুমি,
কোথা তোমার স্থান?

যাত্রী Romanized Version

Achhe, achhe sthan!
Eka tumi, tomar shudhu
Ekti anti dhan.
Nahoy hobe, ghesaghesi,
Emon kichhu noy se beshi,
Nahoy kichhu bhari hobe
Amar torikhan–
Tai bole ki firibe tumi
Achhe, achhe sthan!
Eso, eso naye!
Dhula jodi thake kichhu
Thak-na dhula paye.
Tonu তোমার tonulota,
Chokher kone choncholota,
Sojolnil-jolod-boron
Boshonkhani gaye–
Tomar tore hobe go thai–
Eso eso naye!
Jatri achhe nana,
Nana ghate jabe tara
Keu karor noy jana.
Tumio go khonek-tore
Boshbe amar tori-‘pore,
Jatra jokhon furiye jabe,
Man-be mor mana–
Ele jodi tumio eso,
Jatri achhe nana.
Kotha tomar sthan?
Kon golate rakhte jabe
Ekti anti dhan?
Bolte jodi na chao tobe
Shune amar ki fol hobe,
Bhabbo bose kheya jokhon
Korbo obosan–
Kon parate jabe তুমি,
Kotha tomar sthan?

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • খেয়াঘাটের আকস্মিক পরিচয়: খেয়া নৌকায় জীবনের নানা প্রান্তের মানুষেরা সাময়িকভাবে মিলিত হয়। এখানে মাঝির উদার আমন্ত্রণ এবং এক অপরিচিত নারীর সাথে ক্ষণিক সান্নিধ্যের এক দারুণ ঘরোয়া পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
  • ক্ষণিক সম্পর্ক ও জীবনের যাত্রা:
“যাত্রী আছে নানা, / নানা ঘাটে যাবে তারা / কেউ কারো নয় জানা।”
— মানুষের জীবনও এক খেয়াযাত্রার মতো। সবাই ভিন্ন ভিন্ন পথ থেকে আসে এবং নিজ নিজ ঘাটে নেমে যায়। এই ক্ষণিকের যাত্রায় পরিচয় বা গন্তব্য না জানলেও পথের আনন্দটুকুই আসল।
  • কৌতূহল ও সরল সমাপ্তি: নারীর হাতে সামান্য একটি আঁটি ধান আর তার গন্তব্য কোথায়—তা নিয়ে মাঝির মনে এক মৃদু কৌতূহল জাগে। কিন্তু সে উত্তর না পেলেও খেয়া শেষে একাকী বসে তা ভাবার যে আনন্দ, তাই কবিতার শেষাংশে চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (ক্ষণিকা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন