শিশু ভোলানাথ কাব্যগ্রন্থের ঘুমের তত্ত্ব কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শিশু ভোলানাথ’ কাব্যগ্রন্থের একটি গভীর দার্শনিক অথচ অপূর্ব শিশুতোষ কল্পনাময় কবিতা হলো ‘ঘুমের তত্ত্ব’। অস্তিত্ব আর অনস্তিত্বের সীমানা, বাস্তব ও কল্পলোকের মেলবন্ধন এবং শিশুর দৃষ্টিতে ঘুম ও জাগরণের রহস্যময় আবর্তন এ কবিতায় অত্যন্ত সরল ও মনোমুগ্ধকর ভঙ্গিতে ফুটে উঠেছে।

ঘুমের তত্ত্ব কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামঘুমের তত্ত্ব
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থশিশু ভোলানাথ
প্রকাশের বছর১৯২২ (১৩২৯ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনশিশুতোষ ও দার্শনিক লিরিক কবিতা (Philosophical Children’s Poetry)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯২২ সালে প্রকাশিত ‘শিশু ভোলানাথ’ কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ শিশুর মনের অবচেতন জগৎ, তার সরল জিজ্ঞাসা ও অদ্ভুত কল্পনাশক্তির উন্মেষ ঘটিয়েছেন। শিশুরা যা চোখে দেখে না, তাকে একেবারে নেই বলে উড়িয়ে দেয় না; বরং বিশ্বাস করে তা কোথাও ঘুমিয়ে বা লুকিয়ে আছে। এই কবিতায় এক শিশু তার মায়ের কাছে যুক্তি দেয় যে—দিনের বেলা তারা বা রাতের বেলা সূর্য যেমন ঘুমের জগতে চলে যায়, রূপকথার চরিত্র ও শীতের কনকচাঁপাও তেমনি ঘুমের অতলে লুকিয়ে থাকে। গভীর দার্শনিক প্রশ্নকে শিশুর অতি সহজ উপলব্ধিতে নামিয়ে আনা এই কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য।

ঘুমের তত্ত্ব সম্পূর্ণ কবিতা:

জাগার থেকে ঘুমোই, আবার

          ঘুমের থেকে জাগি,–

অনেক সময় ভাবি মনে

          কেন, কিসের লাগি?

আমাকে, মা, যখন তুমি

          ঘুম পাড়িয়ে রাখ

তখন তুমি হারিয়ে গিয়ে

          তবু হারাও নাকো।

রাতে সূর্য, দিনে তারা

          পাই নে, হাজার খুঁজি।

তখন তা’রা ঘুমের সূর্য,

          ঘুমের তারা বুঝি?

শীতের দিনে কনকচাঁপা

যায় না দেখা গাছে,

ঘুমের মধ্যে নুকিয়ে থাকে

          নেই তবুও আছে।

রাজকন্যে থাকে, আমার

          সিঁড়ির নিচের ঘরে।

দাদা বলে, “দেখিয়ে দে তো।”

          বিশ্বাস না করে।

কিন্তু, মা, তুই জানিস নে কি

          আমার সে রাজকন্যে

ঘুমের তলায় তলিয়ে থাকে,

          দেখি নে সেইজন্যে।

নেই তবুও আছে এমন

          নেই কি কত জিনিস?

আমি তাদের অনেক জানি,

          তুই কি তাদের চিনিস?

যেদিন তাদের রাত পোয়াবে

          উঠবে চক্ষু মেলি

সেদিন তোমার ঘরে হবে

          বিষম ঠেলাঠেলি।

নাপিত ভায়া, শেয়াল ভায়া,

          ব্যাঙ্গমা বেঙ্গুমী

ভিড় ক’রে সব আসবে যখন

          কী যে করবে তুমি!

তখন তুমি ঘুমিয়ে প’ড়ো,

          আমিই জেগে থেকে

নানারকম খেলায় তাদের

          দেব ভুলিয়ে রেখে।

তার পরে যেই জাগবে তুমি

          লাগবে তাদের ঘুম,

তখন কোথাও কিচ্ছুই নেই

          সমস্ত নিজ্‌ঝুম।

ঘুমের তত্ত্ব সম্পূর্ণ কবিতা Romanized Version:

Jagar theke ghumoi, abar
Ghumer theke jagi,–
Onek shomoy bhabi mone
Keno, kisher lagi?
Amake, ma, jokhon tumi
Ghum pariye rakho
Tokhon tumi hariye giye
Tobu harao nako.
Rate shurjo, dine tara
Pai ne, hajar khunji.
Tokhon ta’ra ghumer shurjo,
Ghumer tara bujhi?
Shiter dine konokchampa
Jay na dekha gachhe,
Ghumer modhye nukiye thake
Nei tobuo achhe.
Rajkonnye thake, amar
Shindir nicher ghore.
Dada bole, “Dekhiye de to.”

Bisshash na kore.

Kintu, ma, tui janish ne ki
Amar she rajkonnye
Ghumer tolay toliye thake,
Dekhi ne sheijonnye.
Nei tobuo achhe emon
Nei ki koto jinish?
Ami tader onek jani,
Tui ki tader chinish?
Jedin tader rat poyabe
Uthbe chokkhu meli
Shedin tomar ghore hobe
Bishom thelatheli.
Napit bhaya, sheyal bhaya,
Bangoma bengumi
Bhir ko’re shob ashbe jokhon
Ki je korbe tumi!
Tokhon tumi ghumiye po’ro,
Ami-i jege theke
Nanarokom khelay tader
Debo bhuliye rekhe.
Tar pore jei jagbe tumi
Lagbe tader ghum,
Tokhon kothao kichhui nei
Shomosto nijjhum.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • ‘নেই তবুও আছে’-র দর্শন:
    “শীতের দিনে কনকচাঁপা / যায় না দেখা গাছে, / ঘুমের মধ্যে নুকিয়ে থাকে / নেই তবুও আছে।”
    — চোখের সামনে যা অনুপস্থিত, তা শূন্য বা অস্তিত্বহীন নয়; তা কেবল প্রচ্ছন্ন বা সুপ্ত অবস্থায় রয়েছে। গভীর দার্শনিক ভাবটিকে শিশুটি খুব সহজ নিসর্গ-অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে প্রকাশ করেছে।
  • বাস্তব বনাম কল্পলোকের রাজ্য:
    “কিন্তু, মা, তুই জানিস নে কি / আমার সে রাজকন্যে / ঘুমের তলায় তলিয়ে থাকে, / দেখি নে সেইজন্যে।”
    — দাদার সংশয় ও যুক্তিবাদী দৃষ্টির বিপরীতে শিশুটি তার নিজস্ব রূপকথার সত্যকে প্রতিষ্ঠা করে। সিঁড়ির নিচের রাজকন্যাকে খালি চোখে দেখা না যাওয়ার কারণ সে জেগে নেই, ঘুমের তলায় তলিয়ে আছে।
  • রূপকথার চরিত্র ও আত্মবিশ্বাস:
    “নাপিত ভায়া, শেয়াল ভায়া, / ব্যাঙ্গমা বেঙ্গুমী … তখন তুমি ঘুমিয়ে প’ড়ো, / আমিই জেগে থেকে / নানারকম খেলায় তাদের / দেব ভুলিয়ে রেখে।”
    — রূপকথার চরিত্রগুলো যখন একসময় জেগে উঠবে, তখন মাকে ভয় না পেতে বলে শিশুটি নিজেই তাদের সামলানোর দায়িত্ব নিতে চায়। মায়ের ঘুম এবং রূপকথার চরিত্রের জাগরণের এই যে বিপরীত আবর্তন, তা শিশুর মমত্ববোধ ও কল্পনার শীর্ষ রূপকে নির্দেশ করে।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি ও রচনাকাল-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (শিশু ভোলানাথ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন