শেষ সপ্তক কাব্যগ্রন্থের কালো অন্ধকারের তলায় কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিণত বয়সের আধুনিক গদ্যকবিতার সংকলন ‘শেষ সপ্তক’-এর ১৪ সংখ্যক কবিতা হলো ‘কালো অন্ধকারের তলায়’। নিস্তব্ধ রাতের ঘন আঁধারে প্রেমের এক অনন্য উচ্চারণ, অনুভূতির চরম তীব্রতায় এক নিমেষের মাঝেই অনন্তকালের অমৃত উপলব্ধি এবং পার্থিব জগতের নশ্বরতা ও বিস্মৃতির বিপরীতে সেই ক্ষণিক মুহূর্তটিকে চরম সত্য হিসেবে অনুভব করার দর্শন এ কবিতায় অপূর্ব গভীরতায় রূপায়িত হয়েছে।

শেষ সপ্তক কাব্যগ্রন্থের কালো অন্ধকারের তলায় কবিতা

কালো অন্ধকারের তলায় কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামকালো অন্ধকারের তলায় (১৪ সংখ্যক কবিতা)
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থশেষ সপ্তক
প্রকাশের বছর১৯৩৫ (১৩৪২ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনআধুনিক গদ্যকবিতা ও প্রেমের মহাজাগতিক লিরিক (Prose Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯৩৫ সালে প্রকাশিত ‘শেষ সপ্তক’ কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ মুক্ত গদ্যছন্দের সাহায্যে মানবজীবনের গভীর সত্য ও রূপাতীত উপলব্ধির প্রকাশ ঘটিয়েছেন। এই কবিতায় এক নিঃশব্দ, থমথমে অন্ধকারের পটভূমিতে প্রেমিকার অকস্মাৎ উচ্চারণ—”তোমাকে ভুলব না কোনোদিনই”—কবির সত্তাকে মহাজাগতিক বিস্তার দান করে। কবি জানেন, দৃশ্যমান এই মরণশীল জগতে কালের নিয়মে একদিন তাঁর দেহাবয়ব হারিয়ে যাবে, এমনকি প্রিয়তমার উঠোনের কৃষ্ণচূড়া গাছটিও একদিন তাঁকে আড়াল করে প্রধান হয়ে উঠবে। তবু সেই ক্ষণিকের বাণীর মাঝে যে অনন্ত সত্য ও অমৃত নিহিত ছিল, তার তুলনায় জাগতিক এই বিস্মৃতি ও মরণ নিতান্তই ‘গৌণ’।

কালো অন্ধকারের তলায় সম্পূর্ণ কবিতা:

কালো অন্ধকারের তলায়

পাখির শেষ গান গিয়েছে ডুবে।

বাতাস থমথমে,

গাছের পাতা নড়ে না,

স্বচ্ছরাত্রের তারাগুলি

যেন নেমে আসছে

পুরাতন মহানিম গাছের

ঝিল্লি-ঝংকৃত স্তব্ধ রহস্যের কাছাকাছি।

এমন সময়ে হঠাৎ আবেগে

আমার হাত ধরলে চেপে;

বললে, “তোমাকে ভুলব না কোনোদিনই।”

দীপহীন বাতায়নে

আমার মূর্তি ছিল অস্পষ্ট,

সেই ছায়ার আবরণে

তোমার অন্তরতম আবেদনের

সংকোচ গিয়েছিল কেটে।

সেই মুহূর্তে তোমার প্রেমের অমরাবতী

ব্যাপ্ত হল অনন্ত স্মৃতির ভূমিকায়।

সেই মুহূর্তের আনন্দবেদনা

বেজে উঠল কালের বীণায়,

প্রসারিত হল আগামী জন্মজন্মান্তরে।

সেই মুহূর্তে আমার আমি

তোমার নিবিড় অনুভবের মধ্যে

পেল নিঃসীমতা।

তোমার কম্পিত কণ্ঠের বাণীটুকুতে

সার্থক হয়েছে আমার প্রাণের সাধনা,

সে পেয়েছে অমৃত।

তোমার সংসারে অসংখ্য যা-কিছু আছে

তার সবচেয়ে অত্যন্ত ক’রে আছি আমি,

অত্যন্ত বেঁচে।

এই নিমেষটুকুর বাইরে আর যা-কিছু

সে গৌণ।

এর বাইরে আছে মরণ,

একদিন রূপের আলো-জ্বালা রঙ্গমঞ্চ থেকে

সরে যাব নেপথ্যে।

প্রত্যক্ষ সুখদুঃখের জগতে

মূর্তিমান অসংখ্যতার কাছে

আমার স্মরণচ্ছায়া মানবে পরাভব।

তোমার দ্বারের কাছে আছে যে কৃষ্ণচূড়া

যার তলায় দুবেলা জল দাও আপন হাতে,

সেও প্রধান হয়ে উঠে’

তার ডালপালার বাইরে

সরিয়ে রাখবে আমাকে

বিশ্বের বিরাট অগোচরে।

তা হোক,

এও গৌণ।

কালো অন্ধকারের তলায় সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

Kalo ondhokarer tolay
Pakhir shesh gan giyechhe dube.
Batash thomthome,
Gacher pata nore na,
Swocchoratrer taraguli
Jeno neme ashchhe
Puraton mohanim gacher
Jhilli-jhongkrito stobdho rohosser kachakachi.
Emon shomoye hothat abege
Amar hat dhorle chepe;
Bolle, “Tomake bhulbo na konodini.”
Diphin batayone
Amar murti chhilo oshposhto,
Shei chhayar aborone
Tomar ontorotomo abedoner
Shongkoch giyechhilo kete.
Shei muhurte tomar premer omoraboti
Byapto holo ononto smritir bhumikay.
Shei muhurter anondobedona
Beje uthlo kaler binay,
Prosharito holo agami jonmojonmantore.
Shei muhurte amar ami
Tomar nibir onubhob-er moddhye
Pelo nihshimota.
Tomar kompito konther banitukute
Sarthoko hoyechhe amar praner shadhona,
She peyechhe omrito.
Tomar shongshare oshongkho ja-kichhu achhe
Tar shobcheye ottonto ko’re achhi ami,
Ottonto benche.
Ei nimeshtukur baire ar ja-kichhu
She gouno.
Er baire achhe moron,
Ekdin ruper alo-jwala rongomoncho theke
Shore jabo nepotthye.
Prottokkho shukhdukker jogote
Murtiman oshongkhotar kachhe
Amar smoronchhaya manbe porabhob.
Tomar dwarer kachhe achhe je krishnochura
Jar tolay dubela jol dao apon hate,
Sheo prodhan hoye uthe’
Tar dalpalar baire
Shoriye rakhbe amake
Bissher birat ogochore.
Ta hok,
E-o gouno.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • নিস্তব্ধ রাতের পটভূমি ও অকস্মাৎ অঙ্গীকার:
    “এমন সময়ে হঠাৎ আবেগে / আমার হাত ধরলে চেপে; / বললে, ‘তোমাকে ভুলব না কোনোদিনই।’ / দীপহীন বাতায়নে / আমার মূর্তি ছিল অস্পষ্ট, / সেই ছায়ার আবরণে / তোমার অন্তরতম আবেদনের / সংকোচ গিয়েছিল কেটে।”
    — পাখিহীন, বাতাসহীন স্তব্ধ রাতের আলো-আঁধারিতে আলোহীন জানলার পাশে প্রিয়তমা সমস্ত সংকোচ কাটিয়ে কবির হাত চেপে ধরে চিরন্তন প্রেমের অঙ্গীকার করে। আলোহীনতার সেই ছায়াই অন্তরের গভীর সত্য প্রকাশের পরম সহায়ক হয়ে ওঠে।
  • মুহূর্তের মাঝে অমরত্ব ও অসীম প্রাপ্তি:
    “সেই মুহূর্তে আমার আমি / তোমার নিবিড় অনুভবের মধ্যে / পেল নিঃসীমতা। / তোমার কম্পিত কণ্ঠের বাণীটুকুতে / সার্থক হয়েছে আমার প্রাণের সাধনা, / সে পেয়েছে অমৃত।”
    — প্রিয়তমার অনুভবের গভীরে কবি নিজের সীমাবদ্ধ আত্মাকে অসীমের মাঝে ব্যাপ্ত হতে দেখেন। পার্থিব জীবনের সমস্ত চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে এই ক্ষণিক অনুভূতিটি কবির কাছে অনন্তকালের অমৃতলাভের মতো সার্থক হয়ে ওঠে।
  • মৃত্যুর অনিবার্যতা বনাম প্রেমের চরমত্ব:
    “একদিন রূপের আলো-জ্বালা রঙ্গমঞ্চ থেকে / সরে যাব নেপথ্যে। … তোমার দ্বারের কাছে আছে যে কৃষ্ণচূড়া / … সরিয়ে রাখবে আমাকে / বিশ্বের বিরাট অগোচরে। / তা হোক, / এও গৌণ।”
    — জীবনের রঙ্গমঞ্চ থেকে মৃত্যু একদিন কবিকে সরিয়ে দেবে, প্রিয়তমার নিত্যদিনের কৃষ্ণচূড়া গাছটিও হয়তো কবির স্মৃতিকে কালের অতলে আড়াল করে ফেলবে। কিন্তু সেই এক নিমেষের তীব্র আত্মিক উপলব্ধির সামনে মৃত্যু, বিস্মৃতি কিংবা লৌকিক সংসার—সবকিছুই তুচ্ছ ও নিছক ‘গৌণ’ বলে প্রতীয়মান হয়।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি ও রচনাকাল-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (শেষ সপ্তক কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন