শেষ সপ্তক কাব্যগ্রন্থের রাস্তায় চলতে চলতে কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিণত বয়সের আধুনিক গদ্যকবিতার সংকলন ‘শেষ সপ্তক’-এর ৪ সংখ্যক কবিতা হলো ‘রাস্তায় চলতে চলতে’। লালন সাঁইয়ের বিখ্যাত বাউল গানের রূপককে আশ্রয় করে মূর্ত রূপের খাঁচায় অমূর্ত অধরাকে উপলব্ধি করার যে চিরন্তন দ্বন্দ্ব ও সৌন্দর্য, তা এক তরুণীর সান্ধ্য রূপ ও সৃষ্টির অতল অনুভূতির সমন্বয়ে এ কবিতায় গভীর দার্শনিক গাম্ভীর্যে ধরা পড়েছে।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামরাস্তায় চলতে চলতে (৪ সংখ্যক কবিতা)
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থশেষ সপ্তক
প্রকাশের বছর১৯৩৫ (১৩৪২ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনআধুনিক গদ্যকবিতা ও বাউলভাবাশ্রিত দার্শনিক লিরিক (Prose Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯৩৫ সালে প্রকাশিত ‘শেষ সপ্তক’ কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ মুক্ত গদ্যরীতির আশ্রয়ে মানবমন ও আধ্যাত্মিক উপলব্ধির গভীর স্তরগুলো উন্মোচন করেছেন। বাংলার লোকায়ত বাউল দর্শন—বিশেষ করে লালন শাহের “খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়”—রবীন্দ্রনাথের ভাবজগতের অন্যতম প্রধান প্রেরণা ছিল। এই কবিতায় রাস্তায় গান গেয়ে চলা এক বাউলের আগমন এবং জানলায় দাঁড়ানো স্নানসিক্ত নারীর রূপসৌন্দর্যকে এক সুতোয় গেঁথেছেন কবি। দৃশ্যমান শরীর ও রূপ কেবল সুরের একটি ‘খাঁচা’, আর তার ভেতরে বাস করা সেই ‘অধরা অচিন পাখি’ আসলে বিশ্বপ্রকৃতির অনন্ত সৌন্দর্য ও বিরহেরই রূপ।

সম্পূর্ণ কবিতা:

রাস্তায় চলতে চলতে

বাউল এসে থামল

তোমার সদর দরজায়।

গাইল, “অচিন পাখি উড়ে আসে খাঁচায়;”

দেখে অবুঝ মন বলে–

অধরাকে ধরেছি।

তুমি তখন স্নানের পরে এলোচুলে

দাঁড়িয়েছিলে জানলায়।

অধরা ছিল তোমার দূরে-চাওয়া চোখের

পল্লবে,

অধরা ছিল তোমার কাঁকন-পরা নিটোল হাতের

মধুরিমায়।

ওকে ভিক্ষে দিলে পাঠিয়ে,

ও গেল চলে;

জানলে না এইগানে তোমারই কথা।

তুমি রাগিণীর মতো আস যাও

একতারার তারে তারে।

সেই যন্ত্র তোমার রূপের খাঁচা,

দোলে বসন্তের বাতাসে।

তাকে বেড়াই বুকে ক’রে;

ওতে রঙ লাগাই, ফুল কাটি

আপন মনের সঙ্গে মিলিয়ে।

যখন বেজে ওঠে, ওর রূপ যাই ভুলে,

কাঁপতে কাঁপতে ওর তার হয় অদৃশ্য।

অচিন তখন বেরিয়ে আসে বিশ্বভুবনে,

খেলিয়ে যায় বনের সবুজে

মিলিয়ে যায় দোলনচাঁপার গন্ধে।

অচিন পাখি তুমি,

মিলনের খাঁচায় থাক,

নানা সাজের খাঁচা।

সেখানে বিরহ নিত্য থাকে পাখির পাখায়,

স্থকিত ওড়ার মধ্যে।

তার ঠিকানা নেই,

তার অভিসার দিগন্তের পারে

সকল দৃশ্যের বিলীনতায়।

সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

Rastay cholte cholte
Baul eshe thamlo
Tomar shodor dorjay.
Gailo, “Ochin pakhi ure ashe khanchay;”
Dekhe obujh mon bole–
Odhorake dhorechhi.
Tumi tokhon shnaner pore elochule
Dariyechhile janlay.
Odhora chhilo tomar dure-chawa chokher
Pollobe,
Odhora chhilo tomar kankon-pora nitol hater
Modhurimay.
Oke bhikkhe dile pathiye,
O gelo chole;
Janle na eigane tomari kotha.
Tumi raginir moto asho jao
Ektarar tare tare.
Shei jontro tomar ruper khancha,
Dole boshonter batashe.
Take berai buke ko’re;
Ote rong lagai, phul kati
Apon moner shonge miliye.
Jokhon beje othe, or rup jai bhule,
Kampte kampte or tar hoy odrishsho.
Ochin tokhon beriye ashe bisshobhubone,
Kheliye jay boner shobuje
Miliye jay dolonchanpar gondhe.
Ochin pakhi tumi,
Miloner khanchay thako,
Nana shajer khancha.
Shekhane biroho nitto thake pakhir pakhay,
Sthokito orar moddhye.
Tar thikana nei,
Tar obhishar digonter pare
Shokol drissher bilinotay.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • বাউল গানের সুর ও মূর্তের মাঝে অধরা:
    “গাইল, ‘অচিন পাখি উড়ে আসে খাঁচায়;’ / দেখে অবুঝ মন বলে– / অধরাকে ধরেছি। / … অধরা ছিল তোমার দূরে-চাওয়া চোখের / পল্লবে,”
    — বাউলের গানের বাণী এবং জানলায় দাঁড়ানো নারীর রূপ এখানে সমার্থক হয়ে ওঠে। রক্তমাংসের নিটোল হাত কিংবা চোখের পল্লবে যে অপরূপ লাবণ্য, তা আসলে স্থূল কোনো বস্তু নয়; তা সেই চির-অধরারই এক ঝলক প্রকাশ, যা মানুষ ধরে রাখতে চেয়েও পুরোপুরি পায় না।
  • রূপের খাঁচা ও অদৃশ্য সুর:
    “যখন বেজে ওঠে, ওর রূপ যাই ভুলে, / কাঁপতে কাঁপতে ওর তার হয় অদৃশ্য। / অচিন তখন বেরিয়ে আসে বিশ্বভুবনে,”
    — একতারার যন্ত্রটি যেমন বাহ্যিক রূপের প্রতীক, তেমনি প্রিয়তমার দেহাবয়বও কেবল একটি খাঁচা। সুর যখন বেজে ওঠে তখন কম্পনের মুখে তারটি যেমন অদৃশ্য হয়ে যায়, তেমনি গভীর উপলব্ধিতে বাহ্যিক রূপ মিলিয়ে গিয়ে অচিন সুরটি বিশ্বপ্রকৃতির সবুজ পাতা ও দোলনচাঁপার সুবাসে ব্যাপ্ত হয়ে পড়ে।
  • মিলন ও বিরহের শাশ্বত সহাবস্থান:
    “অচিন পাখি তুমি, / মিলনের খাঁচায় থাক, / নানা সাজের খাঁচা। / সেখানে বিরহ নিত্য থাকে পাখির পাখায়, / স্থকিত ওড়ার মধ্যে।”
    — মিলনের পরম মুহূর্তেও বিরহ উপস্থিত থাকে, ঠিক যেমন খাঁচায় বন্দি পাখির ডানায় ওড়ার আকুলতা সুপ্ত থাকে। দৃশ্যমান রূপের সীমানা পেরিয়ে সেই অচিন সত্তার আসল অভিসার অনন্তের পানে, যেখানে সমস্ত পার্থিব দৃশ্য বিলীন হয়ে যায়।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি ও রচনাকাল-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (শেষ সপ্তক কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন