Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয়বিবরণ | তথ্য |
| কবিতার নাম | রাস্তায় চলতে চলতে (৪ সংখ্যক কবিতা) |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | শেষ সপ্তক |
| প্রকাশের বছর | ১৯৩৫ (১৩৪২ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | আধুনিক গদ্যকবিতা ও বাউলভাবাশ্রিত দার্শনিক লিরিক (Prose Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
সম্পূর্ণ কবিতা:
রাস্তায় চলতে চলতে
বাউল এসে থামল
তোমার সদর দরজায়।
গাইল, “অচিন পাখি উড়ে আসে খাঁচায়;”
দেখে অবুঝ মন বলে–
অধরাকে ধরেছি।
তুমি তখন স্নানের পরে এলোচুলে
দাঁড়িয়েছিলে জানলায়।
অধরা ছিল তোমার দূরে-চাওয়া চোখের
পল্লবে,
অধরা ছিল তোমার কাঁকন-পরা নিটোল হাতের
মধুরিমায়।
ওকে ভিক্ষে দিলে পাঠিয়ে,
ও গেল চলে;
জানলে না এইগানে তোমারই কথা।
তুমি রাগিণীর মতো আস যাও
একতারার তারে তারে।
সেই যন্ত্র তোমার রূপের খাঁচা,
দোলে বসন্তের বাতাসে।
তাকে বেড়াই বুকে ক’রে;
ওতে রঙ লাগাই, ফুল কাটি
আপন মনের সঙ্গে মিলিয়ে।
যখন বেজে ওঠে, ওর রূপ যাই ভুলে,
কাঁপতে কাঁপতে ওর তার হয় অদৃশ্য।
অচিন তখন বেরিয়ে আসে বিশ্বভুবনে,
খেলিয়ে যায় বনের সবুজে
মিলিয়ে যায় দোলনচাঁপার গন্ধে।
অচিন পাখি তুমি,
মিলনের খাঁচায় থাক,
নানা সাজের খাঁচা।
সেখানে বিরহ নিত্য থাকে পাখির পাখায়,
স্থকিত ওড়ার মধ্যে।
তার ঠিকানা নেই,
তার অভিসার দিগন্তের পারে
সকল দৃশ্যের বিলীনতায়।
সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- বাউল গানের সুর ও মূর্তের মাঝে অধরা:“গাইল, ‘অচিন পাখি উড়ে আসে খাঁচায়;’ / দেখে অবুঝ মন বলে– / অধরাকে ধরেছি। / … অধরা ছিল তোমার দূরে-চাওয়া চোখের / পল্লবে,”— বাউলের গানের বাণী এবং জানলায় দাঁড়ানো নারীর রূপ এখানে সমার্থক হয়ে ওঠে। রক্তমাংসের নিটোল হাত কিংবা চোখের পল্লবে যে অপরূপ লাবণ্য, তা আসলে স্থূল কোনো বস্তু নয়; তা সেই চির-অধরারই এক ঝলক প্রকাশ, যা মানুষ ধরে রাখতে চেয়েও পুরোপুরি পায় না।
- রূপের খাঁচা ও অদৃশ্য সুর:“যখন বেজে ওঠে, ওর রূপ যাই ভুলে, / কাঁপতে কাঁপতে ওর তার হয় অদৃশ্য। / অচিন তখন বেরিয়ে আসে বিশ্বভুবনে,”— একতারার যন্ত্রটি যেমন বাহ্যিক রূপের প্রতীক, তেমনি প্রিয়তমার দেহাবয়বও কেবল একটি খাঁচা। সুর যখন বেজে ওঠে তখন কম্পনের মুখে তারটি যেমন অদৃশ্য হয়ে যায়, তেমনি গভীর উপলব্ধিতে বাহ্যিক রূপ মিলিয়ে গিয়ে অচিন সুরটি বিশ্বপ্রকৃতির সবুজ পাতা ও দোলনচাঁপার সুবাসে ব্যাপ্ত হয়ে পড়ে।
- মিলন ও বিরহের শাশ্বত সহাবস্থান:“অচিন পাখি তুমি, / মিলনের খাঁচায় থাক, / নানা সাজের খাঁচা। / সেখানে বিরহ নিত্য থাকে পাখির পাখায়, / স্থকিত ওড়ার মধ্যে।”— মিলনের পরম মুহূর্তেও বিরহ উপস্থিত থাকে, ঠিক যেমন খাঁচায় বন্দি পাখির ডানায় ওড়ার আকুলতা সুপ্ত থাকে। দৃশ্যমান রূপের সীমানা পেরিয়ে সেই অচিন সত্তার আসল অভিসার অনন্তের পানে, যেখানে সমস্ত পার্থিব দৃশ্য বিলীন হয়ে যায়।