শেষ সপ্তক কাব্যগ্রন্থের কেউ চেনা নয় কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিণত বয়সের আধুনিক গদ্যকবিতার সংকলন ‘শেষ সপ্তক’-এর ১২ সংখ্যক কবিতা হলো ‘কেউ চেনা নয়’। সামাজিক পরিচিতি ও সম্পর্কের গতানুগতিক ছকের আড়ালে মানুষের যে এক চির-অজানা, রহস্যময় ও স্বয়ং-স্বতন্ত্র সত্তা বিদ্যমান থাকে, প্রেমের পরশে সেই অচেনা সত্তার বিস্ময়কর উন্মোচন ও আত্মোপলব্ধির দর্শন এ কবিতায় অসাধারণ ভাবগাম্ভীর্যে ধরা পড়েছে।

সপ্তক কাব্যগ্রন্থের কেউ চেনা নয় কবিতা

কেউ চেনা নয় কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামকেউ চেনা নয় (১২ সংখ্যক কবিতা)
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থশেষ সপ্তক
প্রকাশের বছর১৯৩৫ (১৩৪২ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনআধুনিক গদ্যকবিতা ও আত্মউপলব্ধিমূলক দার্শনিক লিরিক (Philosophical Prose Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯৩৫ সালে প্রকাশিত ‘শেষ সপ্তক’ কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ মুক্ত গদ্যছন্দে মানবজীবনের গূঢ় সত্য ও মনস্তাত্ত্বিক রূপ তুলে ধরেছেন। সংসারের প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ডে মানুষকে আমরা নির্দিষ্ট নাম, পেশা ও সম্পর্কের ছকে বেঁধে ‘চেনা’ বলে মনে করি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন, প্রতিটি মানুষ তার অন্তর্জগতের রহস্যে আসলে একাকী ও অজানা। যখনই সেখানে নিঃস্বার্থ ভালোবাসার ছোঁয়া লাগে, তখনই সামাজিক সংজ্ঞার খোলস ভেঙে মানুষটি অনন্য ও অপূর্ব রূপে উদ্ভাসিত হয়। এমনকি অপরকে জানার সেই বিস্ময় শেষ পর্যন্ত নিজের ভেতরেও এক চিরনতুন ও অতল অচেনাকে আবিষ্কার করিয়ে দেয়।

কেউ চেনা নয় সম্পূর্ণ কবিতা:

কেউ চেনা নয়

সব মানুষই অজানা।

চলেছে আপনার রহস্যে

আপনি একাকী।

সেখানে তার দোসর নেই।

সংসারের ছাপমারা কাঠামোয়

মানুষের সীমা দিই বানিয়ে।

সংজ্ঞার বেড়া-দেওয়া বসতির মধ্যে

বাঁধা মাইনের কাজ করে সে।

থাকে সাধারণের চিহ্ন নিয়ে ললাটে।

এমন সময় কোথা থেকে

ভালোবাসার বসন্ত-হাওয়া লাগে,

সীমার আড়ালটা যায় উড়ে,

বেরিয়ে পড়ে চির-অচেনা।

সামনে তাকে দেখি স্বয়ংস্বতন্ত্র, অপূর্ব, অসাধারণ,

তার জুড়ি কেউ নেই।

তার সঙ্গে যোগ দেবার বেলায়

বাঁধতে হয় গানের সেতু,

ফুলের ভাষায় করি তার অভ্যর্থনা।

চোখ বলে,

যা দেখলুম, তুমি আছ তাকে পেরিয়ে।

মন বলে

চোখে-দেখা কানে-শোনার ওপারে যে রহস্য

তুমি এসেছ সেই অগমের দূত,–

রাত্রি যেমন আসে

পৃথিবীর সামনে নক্ষত্রলোক অবারিত ক’রে।

তখন হঠাৎ দেখি আমার মধ্যেকার অচেনাকে,

তখন আপন অনুভবের

তল খুঁজে পাইনে,

সেই অনুভব

“তিলে তিলে নূতন হোয়।”

কেউ চেনা নয় সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

Keu chena noy
Shob manushi ojana.
Cholechhe aponar rohosshye
Aponi ekaki.
Shekhane tar doshor nei.
Shongsharer chhapmara kathamoy
Manusher shima dii baniye.
Shonggar bera-dewa boshotir moddhye
Bandha mainer kaj kore she.
Thake shadaroner chinho niye lolayte.
Emon shomoy kotha theke
Bhalobashar boshonto-hawa lage,
Shimar aralta jay ure,
Beriye pore chiro-ochena.
Shamne take dekhi swoyongswotontro, opurbo, oshadharon,
Tar juri keu nei.
Tar shonge jog debar belay
Bandhte hoy ganer shetu,
Phuler bhashay kori tar obbhorthona.
Chokh bole,
Ja dekhlum, tumi achho take periye.
Mon bole
Chokhe-dekha kane-shonar opare je rohossho
Tumi eshechho shei ogomer dut,–
Ratri jemon ashe
Prithibir shamne nokkhotrolok obarito ko’re.
Tokhon hothat dekhi amar moddhekar ochenake,
Tokhon apon onubhob-er
Tol khunje paine,
Shei onubhob
“Tile tile nuton hoy.”

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • সামাজিক সীমানা ও মানুষের আদিম একাকীত্ব:
    “সংসারের ছাপমারা কাঠামোয় / মানুষের সীমা দিই বানিয়ে। / সংজ্ঞার বেড়া-দেওয়া বসতির মধ্যে / বাঁধা মাইনের কাজ করে সে।”
    — সমাজ মানুষকে পরিচয়, উপাধি ও কাজের গণ্ডিতে আবদ্ধ করে রাখে। কিন্তু এই স্থূল পরিচয়ের পেছনে প্রতিটি মানুষ তার নিজস্ব গোপন রহস্যে একেবারেই একা ও অচেনা।
  • প্রেমের পরশে অচেনার উন্মোচন:
    “ভালোবাসার বসন্ত-হাওয়া লাগে, / সীমার আড়ালটা যায় উড়ে, / বেরিয়ে পড়ে চির-অচেনা। / সামনে তাকে দেখি স্বয়ংস্বতন্ত্র, অপূর্ব, অসাধারণ, / তার জুড়ি কেউ নেই।”
    — প্রেমের স্পর্শ লাগামাত্রই সামাজিক সংস্কার ও সীমার দেয়াল ভেঙে পড়ে। তখন মানুষটি আর পাঁচজনের মতো সাধারণ থাকে না; সে অনন্য, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও অতুলনীয় এক রহস্যময় রূপ নিয়ে চোখের সামনে দাঁড়ায়।
  • নক্ষত্রলোকের ব্যাপ্তি ও আত্ম-আবিষ্কার:
    “রাত্রি যেমন আসে / পৃথিবীর সামনে নক্ষত্রলোক অবারিত ক’রে। / তখন হঠাৎ দেখি আমার মধ্যেকার অচেনাকে, / তখন আপন অনুভবের / তল খুঁজে পাইনে, / সেই অনুভব / ‘তিলে তিলে নূতন হোয়।'”
    — রাত যেমন পৃথিবীর ক্ষুদ্রতাকে ঢেকে দিয়ে অনন্ত নক্ষত্রলোককে মেলে ধরে, তেমনি ভালোবাসার মাধ্যমে প্রেমাস্পদের অসীম রূপটি প্রকাশিত হয়। আর সেই অপরকে চিনতে গিয়েই মানুষ নিজের ভেতরের অতল অচেনা সত্তাকে আবিষ্কার করে। কবি বিদ্যাপতির বিখ্যাত চরণ “তিলে তিলে নূতন হোয়”-এর উল্লেখ করে দেখিয়েছেন—এই অনুভূতির কোনো শেষ নেই, তা প্রতি মুহূর্তে নতুন হয়ে ওঠে।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি ও রচনাকাল-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (শেষ সপ্তক কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন