শেষ সপ্তক কাব্যগ্রন্থের পথিক আমি কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিণত বয়সের আধুনিক গদ্যকবিতার সংকলন ‘শেষ সপ্তক’-এর ২৯ সংখ্যক কবিতা হলো ‘পথিক আমি’। মহাকালের দীর্ঘ রাজপথে এক চিরন্তন পথিকের দৃষ্টিতে সাম্রাজ্য ও মানব-অহংকারের অবশ্যম্ভাবী বিনাশ, ইতিহাসের ধ্বংসাবশেষ এবং এই ক্ষণভঙ্গুর নশ্বরতার মাঝেই অন্তরে শাশ্বত অসীমের স্তব্ধতা অনুভব করার গভীর দার্শনিক সত্য এ কবিতায় উন্মোচিত হয়েছে।

পথিক আমি কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামপথিক আমি (২৯ সংখ্যক কবিতা)
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থশেষ সপ্তক
প্রকাশের বছর১৯৩৫ (১৩৪২ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনআধুনিক গদ্যকবিতা ও মহাজাগতিক দার্শনিক লিরিক (Philosophical Prose Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯৩৫ সালে প্রকাশিত ‘শেষ সপ্তক’ কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ মুক্ত গদ্যরীতির আশ্রয়ে ব্যক্তিজীবনের সীমানা ছাড়িয়ে মহাকালের প্রবাহকে অবলোকন করেছেন। নিজেকে এক চিরযাত্রী ‘পথিক’ হিসেবে কল্পনা করে কবি দেখেছেন ইতিহাসের উত্থান ও পতন। কত প্রতাপশালী সাম্রাজ্য ও বিজয়-নিশান কালের গর্ভে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে; যে ধুলোয় একদা রাজার দম্ভ ছিল, আজ সেখানে নিঃস্ব ভিক্ষুক আশ্রয় নেয়। এই নশ্বরতার দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে হতাশায় নিমজ্জিত না হয়ে কবি নিজের স্পন্দিত হৃদয়ে খুঁজে পান মহাকালের সেই নির্বাক, চিরন্তন ও অসীম স্তব্ধতাকে।

পথিক আমি সম্পূর্ণ কবিতা:

পথিক-আমি।

পথ চলতে চলতে দেখেছি

পুরাণে কীর্তিত কত দেশ আজ কীর্তি-নিঃস্ব।

দেখেছি দর্পোদ্ধত প্রতাপের

অবমানিত ভগ্নশেষ,

তার বিজয় নিশান

বজ্রাঘাতে হঠাৎ স্তব্ধ অট্টহাসির মতো

গেছে উড়ে;

বিরাট অহংকার

হয়েছে সাষ্টাঙ্গে ধুলায় প্রণত,

সেই ধুলার ‘পরে সন্ধ্যাবেলায়

ভিক্ষুক তার জীর্ণ কাঁথা মেলে বসে,

পথিকের শ্রান্ত পদ

সেই ধুলায় ফেলে চিহ্ন,–

অসংখ্যের নিত্য পদপাতে

সে চিহ্ন যায় লুপ্ত হয়ে।

দেখেছি সুদূর যুগান্তর

বালুর স্তরে প্রচ্ছন্ন,

যেন হঠাৎ ঝঞ্ঝার ঝাপটা লেগে

কোন্‌ মহাতরী

হঠাৎ ডুবল ধূসর সমুদ্রতলে,

সকল আশা নিয়ে, গান নিয়ে, স্মৃতি নিয়ে।

এই অনিত্যের মাঝখান দিয়ে চলতে চলতে

অনুভব করি আমার হৃৎস্পন্দনে

অসীমের স্তব্ধতা।

 

পথিক আমি  সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

Pothik-ami.
Poth cholte cholte dekhechhi
Purane kirtito koto desh aj kirti-nihshwo.
Dekhechhi dorpoddhoto protaper
Obomanito bhognoshesh,
Tar bijoy nishan
Bojroghate hothat stobdho ottohashir moto
Gechhe ure;
Birat ohongkar
Hoyechhe shashtangge dhulay pronoto,
Shei dhular ‘pore shondhyebelay
Bhikkhuk tar jirno kantha mele boshe,
Pothiker shranto podo
Shei dhulay phele chinho,–
Oshongkhyer nitto podopate
She chinho jay lupto hoye.
Dekhechhi shudur jugantor
Balur store prochhonno,
Jeno hothat jhonjhar jhapta lege
Kon mohatoni
Hothat dublo dhushor shomudrotle,
Shokol asha niye, gan niye, smriti niye.
Ei onitter majhkhan diye cholte cholte
Onubhob kori amar hritspondone
Oshimer stobdhota.

পথিক আমি কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • ঐতিহাসিক অহংকারের পতন ও ধূলির সমতা:
    “বিরাট অহংকার / হয়েছে সাষ্টাঙ্গে ধুলায় প্রণত, / সেই ধুলার ‘পরে সন্ধ্যাবেলায় / ভিক্ষুক তার জীর্ণ কাঁথা মেলে বসে,”
    — প্রতাপশালী রাজা ও সভ্যতার দম্ভ শেষ পর্যন্ত মাটিতেই মিশে যায়। যেখানে একসময় অহংকারের নিশান উড়ত, কালক্রমে সেখানেই নিঃস্ব ভিক্ষুক কাঁথা বিছিয়ে বসে—মহাকালের এই নির্মম সমতা পার্থিব শক্তির ক্ষণভঙ্গুরতা প্রমাণ করে।
  • যুগান্তরের বিলীনতা ও মহাতরীর রূপক:
    “সুদূর যুগান্তর / বালুর স্তরে প্রচ্ছন্ন, / যেন হঠাৎ ঝঞ্ঝার ঝাপটা লেগে / কোন্‌ মহাতরী / হঠাৎ ডুবল ধূসর সমুদ্রতলে, / সকল আশা নিয়ে, গান নিয়ে, স্মৃতি নিয়ে।”
    — মরুভূমির বালুকারাশির নিচে চাপা পড়া অতীত সভ্যতাকে কবি এক নিমজ্জিত মহাতরীর সাথে তুলনা করেছেন। মানুষের সকল অর্জন, সঙ্গীত ও স্মৃতি যেন ধূসর সময়ের অতলে এক নিমেষে তলিয়ে যায়।
  • অনিত্যের মাঝে অসীমের উপলব্ধি:
    “এই অনিত্যের মাঝখান দিয়ে চলতে চলতে / অনুভব করি আমার হৃৎস্পন্দনে / অসীমের স্তব্ধতা।”
    — চারপাশের সবকিছু ক্ষণস্থায়ী, ভঙ্গুর এবং পরিবর্তনশীল। কিন্তু এই অনিত্যতার মাঝে পথ চলতে চলতেই কবির নিজের ক্ষণিক হৃদস্পন্দন এক গভীর সত্যে উত্তীর্ণ হয়—তিনি নিজের ভেতরেই স্পর্শ করেন মহাকালের চিরস্থায়ী, স্থির ও অসীম প্রশান্তি।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি ও রচনাকাল-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (শেষ সপ্তক কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন