পুনশ্চ কাব্যগ্রন্থের মৃত্যু কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পুনশ্চ’ কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম গভীর দার্শনিক, মনস্তাত্ত্বিক ও অস্তিত্ববাদী কবিতা হলো ‘মৃত্যু’। ১৯৩২ সালে প্রকাশিত এই কবিতাটি রবীন্দ্রনাথের গদ্যকবিতা ধারার এক অনন্য সৃষ্টি। এই কবিতায় কবি মৃত্যুর অনিবার্যতাকে কোনো শূন্যতা বা ধ্বংস হিসেবে না দেখে, তাকে অসীম মহাবিশ্বের ও চৈতন্যের এক স্বাভাবিক উত্তরণ এবং মহাসমগ্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামমৃত্যু
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থপুনশ্চ
প্রকাশের বছর১৯৩২ (১৩৩৯ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনদার্শনিক ও গদ্যকবিতা (Philosophical and Prose Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

১৯৩২ সালে প্রকাশিত ‘পুনশ্চ’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্যজীবনের এক নতুন যুগের সূচনা করে, যেখানে তিনি গতানুগতিক ছন্দের গণ্ডি পেরিয়ে গদ্যকবিতার ফর্মে জীবনের নানা সূক্ষ্ম ও গভীর সত্য প্রকাশ করতে শুরু করেন। ‘মৃত্যু’ কবিতায় কবি মানুষের মৃত্যুচিন্তা ও অস্তিত্বের সংকটকে এক বিশাল মহাজাগতিক ক্যানভাসে স্থাপন করেছেন। মৃত্যু মানেই চিরতরে হারিয়ে যাওয়া বা মহাশূন্যে বিলীন হয়ে যাওয়া নয়—বরং মহাকালসমুদ্রের বুকে সমস্ত বস্তু, জীব ও চেতনার প্রবাহের সাথে মৃত্যুর সম্পর্ক ও তার দার্শনিক তাৎপর্য এখানে অত্যন্ত সুগভীরভাবে মূর্ত হয়েছে।

মৃত্যু – সম্পূর্ণ কবিতা

মরণের ছবি মনে আনি।
ভেবে দেখি শেষ দিন ঠেকেছে শেষের শীর্ণক্ষণে।
আছে ব’له যত কিছু
রয়েছে দেশে কালে–
যত বস্তু, যত জীব, যত ইচ্ছা, যত চেষ্টা,
যত আশানৈরাশ্যের ঘাতপ্রতিঘাত
দেশে দেশে ঘরে ঘরে চিত্তে চিত্তে,
যত গ্রহনক্ষত্রের
দূর হতে দূরতর ঘূর্ণ্যমান স্তরে স্তরে
অগণিত অজ্ঞাত শক্তির
আলোড়ন আবর্তন
মহাকালসমুদ্রের কূলহীন বক্ষতলে,
সমস্তই আমার এ চৈতন্যের
শেষ সূক্ষ্ম আকম্পিত রেখার এ ধারে।
এক পা তখনো আছে সেই প্রান্তসীমায়,
অন্য পা আমার
বাড়িয়েছি রেখার ও ধারে,
সেখানে অপেক্ষা করে অলক্ষিত ভবিষ্যৎ
লয়ে দিনরজনীর অন্তহীন অক্ষমালা
আলো-অন্ধকারে-গাঁথা।
অসীমের অসংখ্য যা-কিছু
সত্তায় সত্তায় গাঁথা
প্রসারিত অতীতে ও অনাগতে।
নিবিড় সে সমস্তের মাঝে
অকস্মাৎ আমি নেই।
একি সত্য হতে পারে।
উদ্ধত এ নাস্তিত্ব যে পাবে স্থান
এমন কি অণুমাত্র ছিদ্র আছে কোনোখানে।
সে ছিদ্র কি এতদিনে
ডুবাতো না নিখিলতরণী
মৃত্যু যদি শূন্য হত,
যদি হত মহাসমগ্রের
রূঢ় প্রতিবাদ।

মৃত্যু Romanized Version

Moroner chhobi mone ani.
Bhebe dekhi shesh din thekeche shesher shirno-khone.
Ache bo’le joto kichu
Royeche deshe kale–
Joto bostu, joto jib, joto ichchha, joto cheshta,
Joto ashanoirashyer ghat-protighat
Deshe deshe ghore ghore chitte chitte,
Joto grohonokhotrer
Dur hote durotor ghurnoman store store
Ogonito oggato shoktir
Aloron aborton
Mohakal-somudrer kulhin bokshotole,
Shomostoi amar e chaitonyer
Shesh shukkho akompito rekhar e dhare.
Ek pa tokhono ache shei pranto-shimay,
Onnyo pa amar
Bariyechhi rekhar o dhare,
Sekhane opekkha kore olokkhito bhobishshot
Loye din-rojonir ontohin okshomala
Alo-andhakare-gatha.
Oshimer oshongkho ja-kichu
Sottay sottay gatha
Prosaritho otite o onagate.
Nibiro se shomoster majhe
Okoshmat ami nei.
Eki sotyo hote pare.
Uddhoto e nastitto je pabe sthan
Emon ki onumatro chhidro ache kono-khane.
Se chhidro ki etodine
Dubato na nikhil-toroni
Mrittu jodi shunyo hoto,
Jodi hoto moha-shomogrer
Ruro protibad.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • চেতনার পরিধি ও মহাজাগতিক বিস্তার: কবিতার শুরুতে কবি তাঁর নিজের জীবনের শেষ মুহূর্তের কথা কল্পনা করেন। মহাবিশ্বের সমস্ত বস্তু, জীব, আশা-নৈরাশ্য এবং গ্রহ-নক্ষত্রের ঘূর্ণন—সবকিছুই মানুষের চৈতন্য বা অনুভূতির সীমার মধ্যে রেখা টেনে চলে।
  • মৃত্যুর ওপারে পা বাড়ানো:
“এক পা তখনো আছে সেই প্রান্তসীমায়, / অন্য পা আমার / বাড়িয়েছি রেখার ও ধারে, / সেখানে অপেক্ষা করে অলক্ষিত ভবিষ্যৎ…”
— মৃত্যু হলো এমন এক প্রান্তসীমা, যার একদিকে বর্তমানের অস্তিত্ব আর অন্যদিকে অলক্ষিত ভবিষ্যতের অন্তহীন অক্ষমালা। মানুষ এক পা বর্তমানের সীমান্তে রেখে অন্য পা অসীমের দিকে বাড়িয়ে দেয়।
  • মৃত্যু কি কেবলই শূন্যতা?
“মৃত্যু যদি শূন্য হত, / যদি হত মহাসমগ্রের / রূঢ় প্রতিবাদ।”
— কবি প্রশ্ন তোলেন যে, মৃত্যু যদি সত্যিই একটি পরম শূন্যতা বা অস্তিত্বের অবসান হতো, তবে তা সমগ্র মহাবিশ্বের সৃষ্টি ও স্থায়িত্বকে অসম্ভব করে তুলত। মৃত্যু মানে ধ্বংস নয়, বরং তা মহাজাগতিক নিয়মে মহাবিশ্বের এক পরম সত্য ও উত্তরণ।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (পুনশ্চ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন